রাষ্ট্র, সাম্রাজ্য ও কবির ইস্তিখারা
Printed Edition
মুহাম্মদ কামাল বিল ওয়াদুদ
শহীদ শরিফ ওসমান হাদি কেবল এক নশ্বর দেহধারী কবি ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন আধুনিক জাহেলিয়াতের ঘনঘটায় এক আধ্যাত্মিক তর্জনী। যখন রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মানবতা মূর্ছা যাচ্ছিল, তখন হাদি তার কথা ও কলমকে জুলফিকারের ন্যায় শাণিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি আরো ছিলেন পঙ্কিল বর্তমানের ঘোর অমানিশায় তাওহিদি চেতনার এক প্রদীপ্ত মশাল এবং জালিমের খড়গহস্ত থেকে মজলুমের অধিকার ছিনিয়ে আনার এক জীবন্ত ও অবিনাশী ইশতেহার। তার জীবনকাল, কালজয়ী কাব্যসম্ভার এবং আপসহীন বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডগুলো একীভূত হয়ে সমকালীন সমাজে পুঞ্জীভূত অন্যায় ও শোষণের বলয়কে চূর্ণবিচূর্ণ করার এক শক্তিশালী রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল। হাদি দক্ষিণ এশিয়ার আধিপত্যবাদী সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে এক হিমালয়সম দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলেন এবং শোষিত বনি আদমের ন্যায্য অধিকার পুনরুদ্ধারে নিজের নশ্বর জীবনকে পরম মাবুদের রাহে উৎসর্গ করেছিলেন, যার প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিফলিত হতো শরিয়তের নৈতিক মানদণ্ড ও ঈমানি গায়রাত। তার মৌন ইস্তিখারা নিছক কোনো ব্যক্তিগত প্রার্থনা ছিল না; বরং তা ছিল উম্মাহর ক্রান্তিলগ্নে রাব্বুল আলামিনের দরবারে এক চূড়ান্ত ফয়সালার আরজি। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদ যখন রুহানিয়াতের মূলে কুঠারাঘাত করে, তখন নীরবতা শিরকের সমতুল্য। তার প্রতিটি পঙ্ক্তি যেন একেকটি তাকবির, যা বাতেলের তখত-তাউসকে প্রকম্পিত করার স্পর্ধা রাখে। আলোচ্য প্রবন্ধে মূলত শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কালজয়ী কবিতা ‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন’-এর চরণগুলো থেকে এক গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক দর্শনের ব্যবচ্ছেদ করা হবে, যা উন্মোচিত করবে রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের মধ্যকার সেই পৈশাচিক আঁতাতকে। যেমন তিনি বলেন-
‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন/হে সীমান্তের শকুন/হে আটলান্টিকের ঈগল/হে বৈকাল হ্রদের বাজ’
শহীদ হাদি কোনো বদ্ধ ঘরের কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন উত্তাল রাজপথের এক নির্ভীক মুজাহিদ, যিনি স্বীয় রক্ত ও কালিকে একীভূত করেছিলেন ন্যায়ের মিছিলে। হাদির কাব্যের এই প্রারম্ভিক আহ্বান কোনো পরাজিতের আত্মসমর্পণ নয়; বরং এটি এক চরম বিদ্রƒপাত্মক আস্ফালন। এখানে ‘শকুন’, ‘ঈগল’ এবং ‘বাজ’ শব্দত্রয়ী নিছক পক্ষীকুল নয়; বরং এরা হলো ভূ-রাজনৈতিক শোষণের একেকটি পৈশাচিক রূপক। ‘আটলান্টিকের ঈগল’ বলতে তিনি সরাসরি পশ্চিমা নীলচক্ষু সাম্রাজ্যবাদকে এবং ‘বৈকাল হ্রদের বাজ’ বলতে ইউরেশীয় আধিপত্যবাদকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, মজলুমের রক্ত আজ এই বৈশ্বিক হায়নাদের কাছে সুপেয় পানীয়তে পরিণত হয়েছে।
ইসলামী দর্শনে ‘গণিমতের মাল’ কেবল যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে বোঝায় না; বরং হাদি এখানে বিদ্রƒপ করে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিকের অস্তিত্ব আজ সাম্রাজ্যবাদী দানবদের কাছে লুণ্ঠনযোগ্য সম্পদে পরিণত হয়েছে। সীমান্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসা শকুনিদৃষ্টি যখন একটি জনপদের ঈমান ও আমলকে গ্রাস করতে চায়, তখন হাদির কলম সেই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক রুহানি ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হয়। কবিতার আরেক জায়গায় তিনি বলেন-
‘আমার রক্তরসে শুধু অসহায়ত্ব আর অভাব;/কাগজের কামলারা তারে আদর করে মুদ্রাস্ফীতি ডাকে।’
এখানে ‘কাগজের কামলা’ শব্দটি দ্বারা হাদি সেই সব দরবারি অর্থনীতিবিদ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মোসাহেবদের বিদ্ধ করেছেন, যারা রাষ্ট্রের জবরদখল ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠনকে তাত্ত্বিক মোড়কে জায়েজ করে। সাধারণ মানুষের হাহাকার, নাভিশ্বাস এবং অনাহারকে যখন ‘মুদ্রাস্ফীতি’ বা ‘উন্নয়ন সূচক’ নামক ঠাণ্ডা গাণিতিক শব্দ দিয়ে আড়াল করা হয়, হাদি তাকে রক্তরস বলে অভিহিত করেন। এটি মূলত আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত।
হাদির কাব্যিক ইশতেহারে ‘মুদ্রাস্ফীতি’ কেবল অর্থনীতির পরিভাষা নয়; বরং তা হলো শোষিত আত্মার রক্তক্ষরণের এক দাফতরিক তকমা। তিনি যখন বলেন- ‘ঋণের চাপে নীল হয়ে যাচ্ছে আমার অণুচক্রিকা’, তখন তিনি মূলত সেই বৈশ্বিক সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার (রিবা) ভয়াবহতাকে চিত্রায়িত করেন, যা একটি স্বাধীন জাতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে দাসে পরিণত করে।
ইসলামী অর্থনীতিতে সুদ বা রিবা ও শোষণ যেমন হারাম, হাদি দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নাগরিকের ধমনী থেকে রক্ত চুষে নিয়ে তাকে উন্নয়নের মমি বানিয়ে রাখছে। ‘ঋণের চাপে নীল হয়ে যাওয়া অণুচক্রিকা’ উপমাটি কেবল শারীরিক অসুস্থতা নয়; বরং একটি ঋণে জর্জরিত জাতির আদর্শিক দেউলিয়াত্বের প্রতীকও বটে। হাদি আরো বলেন-
‘ওদিকে দোজখের ভয়ে/আত্মহত্যা করবারও সাহস পাই না আমি!’
এই চরণটি হাদির ঈমানি দৃঢ়তা ও ইসলামী আকিদার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। একজন সেক্যুলার কবি হয়তো এখানে নিহিলিজম বা শূন্যতাবাদের জয়গান গাইতেন; কিন্তু হাদি এখানে ‘আখিরাত’ ও ‘দোজখ’-এর ভয়কে ঢাল হিসেবে এনেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, এই দুঃসহ যাতনার মধ্যেও মুমিন কেন আত্মহনন করে না। কারণ তার কাছে জীবন এক আমানত। মাবুদের দেয়া এই রুহকে নিজ হাতে বিনাশ করা কবিরা গুনাহ। এই যাতনা আর ইন্টারনাল ব্লিডিং সহ্য করেও বেঁচে থাকাটা তখন আর কেবল টিকে থাকা থাকে না; বরং তা এক প্রকার সবর বা ধৈর্য এবং নীরব জিহাদে পরিণত হয়। কবিতার আরেকটি জায়গায় তিনি উচ্চারণ করেন-
‘সহস্রাব্দ উন্নয়নের সাক্ষী হিসেবে/রাজা তোমাকে মমি করে রেখেছেন!’
হাদির রাজনৈতিক দর্শন এখানে তুঙ্গে পৌঁছেছে। ‘মমি’ শব্দটি স্থবিরতা ও প্রাণহীনতার প্রতীক। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের বাকস্বাধীনতা হরণ করে তাকে কেবল উন্নয়নের শোপিস হিসেবে সাজিয়ে রাখে, তখন সেই নাগরিক আর জীবিত থাকে না। ‘রাজার মন খারাপ হওয়া’ কিংবা ‘বাজারের দীর্ঘশ্বাস’-এই রূপকগুলো দিয়ে হাদি একনায়কতন্ত্রের সেই বীভৎস রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন যেখানে মানুষের দুঃখ প্রকাশকেও রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য করা হয়।
কোতোয়ালদের জারি করা সারাক্ষণ হাসতে হবে এমন ফরমান মূলত সেই সব স্বৈরাচারী শাসনের দিকে ইঙ্গিত করে, যারা জবরদস্তি করে নাগরিকদের ওপর মিথ্যে সুখের মুখোশ পরিয়ে রাখে। এটি ফেরাউনি শাসনের এক আধুনিক সংস্করণ, যেখানে বনি ইসরাইলের ন্যায় সাধারণ মানুষকে তিলে তিলে নিঃশেষ করা হয়। তিনি আরো বলেন-
‘নইলে দেশী কুকুর ও বিদেশী মাগুরকে/এক বেলা ভালোমন্দ খাওয়ানো হবে আমার মাংস দিয়ে।’
এখানে ‘দেশী কুকুর’ বলতে অভ্যন্তরীণ দালালগোষ্ঠী এবং ‘বিদেশী মাগুর’ বলতে আধিপত্যবাদী প্রভুদের উচ্ছিষ্টভোগী শক্তিকে বোঝানো হয়েছে। হাদি এখানে পৈশাচিক এক বাস্তবতার কথা বলেছেন, যদি তুমি রাজার ফরমান না মানো, তবে তোমার অস্তিত্ব হবে এই হায়নাদের ভোজ্যবস্তু। ‘ব্রয়লারের ভুঁড়ি’ শব্দটি দিয়ে তিনি বর্তমানের অন্তঃসারশূন্য সংস্কৃতি ও ভোগবাদকে নির্দেশ করেছেন। হাদি স্পষ্ট করেছেন, যারা বাতিলের দালালি করে, তাদের ক্ষুধা মেটানোর জন্য দেশপ্রেমিকদের রক্তই সবসময় শ্রেষ্ঠ উপাদেয় হিসেবে গণ্য হয়। হাদি দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন-
‘দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মাংসাশী বিহগদের/হে ঈগল, চিল ও ভয়ঙ্কর বাজেরা/তোমরা এফ-থার্টি ফাইভের মতো/মিগ টুয়েন্টি নাইনের মতো।’
এই অংশে হাদি সমকালীন মারণাস্ত্র ও যুদ্ধের প্রযুক্তিকে (ঋ-৩৫, গরম-২৯) কবিতার ছন্দে গেঁথে দিয়েছেন। এটি এক গভীর রাজনৈতিক সচেতনতা। তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিক যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো দেশকে ‘গণিমতের মাল’ হিসেবে বণ্টন করা হয়, তখন সেখানে মানবতার কোনো স্থান থাকে না।
হাদি এখানে ‘উদাম’ হয়ে ডাকার মাধ্যমে এক প্রকার বৈরাগ্য ও চরম বিতৃষ্ণা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, যদি এই পরাধীনতা ও লাঞ্ছনাই নিয়তি হয়, তবে দেশী শুয়োর তথা ঘরের শত্রুদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার চেয়ে
বিদেশী শকুনিদের হাতে ছিন্নভিন্ন হওয়াও যেন কবির কাছে এক প্রকারের জেদ। তবে এটি কোনোভাবেই পরাজয়বাদ নয়; বরং এটি হলো উম্মাহর অনৈক্য ও মেরুদণ্ডহীনতার প্রতি এক তীব্র ধিক্কার। কবি শহীদ ওসমান হাদির কলম থেকে বের হয়-
‘দোহাই, শুধু মস্তিষ্কটা খেয়ো না আমার/তা হলে শীঘ্রই দাস হয়ে যাবে তোমরাও।’
এটি পুরো কবিতার এবং হাদির দর্শনের ‘ম্যাগনাম ওপাস’ বা শ্রেষ্ঠ অংশ। কেন তিনি মস্তিষ্কটা খেতে নিষেধ করেছেন? কারণ মস্তিষ্ক হলো চিন্তার আধার, আদর্শের লালনভূমি এবং ইলম বা জ্ঞানের কেন্দ্র। হাদি বিশ্বাস করতেন, শরীরকে বিনাশ করা যায়, রক্ত চুষে নেয়া যায়, কিন্তু একজন মুমিনের ফিকর বা আদর্শিক চেতনা যদি অন্যের ভেতর সংক্রমিত হয়, তবে সেই শোষকও আর শোষক থাকতে পারে না।
হাদি এখানে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক রসায়ন তুলে ধরেছেন, মজুমের মস্তিষ্ক যদি জালিম ভক্ষণ করে, তবে সেই চিন্তার তাপে জালিম নিজেও দগ্ধ হবে। অথবা এর ভিন্ন অর্থ হতে পারে, মুমিনের চিন্তা এতটাই প্রখর ও অবিনাশী যে, তা দাসেদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করলে তারা বিদ্রোহ করে বসবে। এটি হলো সেই সিরাতে মুস্তাকিমের পথ যা মানুষকে কোনো দিন দাস হতে দেয় না।
শহীদ শরিফ ওসমান হাদি তার শাহাদাতের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, রক্ত দিয়ে লেখা পঙ্ক্তিমালা কখনো মুছে যায় না। রাষ্ট্র যখন দালালিতে ব্যস্ত, সাম্রাজ্য যখন গ্রাস করতে উদ্যত, তখন হাদির এই ‘নীরব ইস্তিখারা’ আমাদের শেখায় কীভাবে শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে মহান রবের ওপর ভরসা রাখতে হয়। শহীদ হাদির বিপ্লবী সত্তা কেবল রাজপথের মিছিলে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল নফস ও বাতিলের বিরুদ্ধে এক নিরবচ্ছিন্ন জিহাদে আকবর। তার পঙ্ক্তিমালায় যে ‘আটলান্টিকের ঈগল’ কিংবা ‘বৈকাল হ্রদের বাজে’র আস্ফালন আমরা দেখি, তা মূলত একবিংশ শতাব্দীর সেই নব্য-জাহেলিয়াতকে নির্দেশ করে, যা মানচিত্রের সীমানা ছাড়িয়ে আজ মুমিনের কলিজা ও মগজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। হাদি অনুধাবন করেছিলেন, যখন কোনো জনপদ তৌহিদি চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়, তখন সেখানে শকুনিদের ভোজসভা অনিবার্য হয়ে ওঠে। তার ‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন’ আখ্যানটি পরাজিতের আর্তনাদ নয়; বরং এক মহিমান্বিত বিদ্রƒপ, যা জালেমকে তার নিজের কদর্য আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
শহীদ শরিফ ওসমান হাদির জীবন ও সাহিত্য এক অবিভাজ্য তৌহিদি রয়দাদ। তিনি কোনো নিছক কবি ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন এক ‘মুরাবিত’-যিনি সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় উম্মাহর ঈমানি সীমান্ত পাহারা দিয়েছেন। তার শাহাদাত আমাদের এই বার্তাই দেয়, রাষ্ট্র যখন সাম্রাজ্যবাদের মোসাহেবিতে লিপ্ত হয় এবং সমাজ যখন ‘দেশী কুকুর ও বিদেশী মাগুর’দের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তখন একজন হাদির মতো টগবগে তারুণ্যকে মশাল হাতে এগিয়ে আসতে হয়। তার কবিতা কোনো নিছক শব্দমালা নয়; বরং তা হলো কিয়ামত অবধি শোষিত মানুষের জন্য এক বিপ্লবী নির্দেশিকা। হাদি শিখিয়ে গেছেন, সত্যের পথে দাঁড়ানো মানে কেবল উচ্চৈঃস্বরে স্লোগান দেয়া নয়; বরং তা হলো নিজের রুহকে তাগুতি গোলামি থেকে মুক্ত করে মালিকুল মুলকের কুদরতি কদমে সঁপে দেয়া। তার কাব্য, তার লড়াই এবং তার চূড়ান্ত আত্মত্যাগ, সবই এক সুতোয় গাঁথা এক মহা-আখ্যান।
হাদির দর্শনের শ্রেষ্ঠ শিখরটি উন্মোচিত হয় তার সেই অন্তিম অসিয়তে ‘দোহাই, শুধু মস্তিষ্কটা খেয়ো না আমার, তা হলে শীঘ্রই দাস হয়ে যাবে তোমরাও’। এটি এক অলৌকিক ও বৈপ্লবিক সতর্কবার্তা। মস্তিষ্ক হলো চিন্তার আধার, আকিদার লালনভূমি এবং ঐশ্বরিক জ্ঞানের কেন্দ্র। হাদি বিশ্বাস করতেন, জালিম তার দেহকে বিনাশ করতে পারে, তার রক্ত চুষে নিতে পারে, কিন্তু একজন মুমিনের ‘ফিকর’ বা আদর্শিক চেতনা যদি শত্রুর মগজে কোনোভাবে সংক্রমিত হয়, তবে সেই শোষকও আর শান্তিতে শাসন করতে পারবে না। মুমিনের চিন্তা এতটাই প্রখর ও তেজষ্ক্রিয় যে, তা দাসেদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করলে তারা বিদ্রোহ করে বসবে, আর যদি জালিম তা ভক্ষণ করে তবে সেই জালেমের নিজস্ব কুফরি সত্তাও সত্যের সুশীতল ছায়ায় দাসত্ব বরণ করতে বাধ্য হবে। এটিই হলো সেই বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য যার সামনে আধুনিক কোনো সমরাস্ত্রই কার্যকর নয়। হাদি এখানে তার শাহাদাতের চেয়েও তার ‘চিন্তা’র অমরতাকে উচ্চতর স্থানে আসীন করেছেন।
শহীদ হাদির শাহাদাত কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা বা সাধারণ মৃত্যু নয়; বরং তা ছিল মাবুদের দরবারে কবুল হওয়া এক অনন্য ও মহিমান্বিত নজরানা। তিনি মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ জ্ঞান করে এক মহান রব্বানি উদ্দেশ্য সাধনে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তার শাহাদাত জাতির হৃদয়ে প্রতিরোধের এক অবিনাশী জজবা তৈরি করেছে। ইসলামী জীবনবোধে তিনি সেই আদর্শ শাহসওয়ার, যিনি জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও হকের ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রেখেছেন এবং শিখিয়েছেন, দেশপ্রেমের প্রকৃত স্বরূপ হলো ঈমানি গায়রাত রক্ষা করা এবং আল্লøাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন ও ইনসাফ কায়েমের সংগ্রামে অটল থাকা। তার প্রতিটি হুরুফ যেন একেকটি স্ফুলিঙ্গ যা অন্যায়ের অরণ্যে দাবানল সৃষ্টি করতে সক্ষম। তিনি প্রমাণ করেছেন, যখন সাহিত্য, বিপ্লব এবং ঈমানি জজবা এক মোহনায় মিলিত হয়, তখন সেখানে এমন এক অজেয় শক্তির উদ্ভব ঘটে যা পৃথিবীর কোনো তাগুতি শক্তিই দমন করতে সক্ষম নয়।
শহীদ হাদি আজ আর কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নন; বরং তিনি নিজেই এক জীবন্ত ইতিহাস, যা কিয়ামত অবধি হকের সওদাগরদের পথ দেখিয়ে যাবে। তার মস্তিষ্ক আজ অপরাজিত, তার আদর্শ আজ অজেয়, আর তার শাহাদাত হলো এক চিরন্তন বিজয়ের ইশতেহার। তার রেখে যাওয়া সাহিত্যিক মিরাস আজ আর কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, তা আজ এক বৈশ্বিক প্রতিরোধের মহাকাব্য হয়ে দিকে দিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। হাদি অমর কারণ তিনি জানতেন কীভাবে রক্ত দিয়ে ইনসাফের পাণ্ডুলিপি লিখতে হয়। তার চিন্তা ও মস্তিষ্ক আজ কোটি তরুণের হৃদয়ে প্রোথিত, যা কোনো শকুনি বা ঈগলের সাধ্য নেই যে ভক্ষণ করতে পারে; বরং এই অবিনাশী ফিকিরই একদিন সাম্রাজ্যবাদী শকুনিদের তখত-তাউস চূর্ণ করে তাওহিদি ইনসাফের নতুন সূর্যোদয় ঘটাবে ইনশাআল্লাহ।