সংসদে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সমঝোতার সুরে সমাপ্ত
সরকার ও বিরোধী দল আলোচনা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবো : প্রধানমন্ত্রী
সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা ও ভুল সিদ্ধান্তের বিরোধিতা অব্যাহত থাকবে : বিরোধীদলীয় নেতা
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেছেন, সরকার ও বিরোধী দল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। দেশকে যদি সবাই মিলে স্থিতিশীল রাখতে না পারি, তাহলে দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। আমাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হবে, মতপার্থক্য থাকবে; তবে দেশের জাতীয় স্বার্থে আমরা এক থাকব।
অন্য দিকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকারের ভালো কাজে পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে এবং ভুল বা জনবিরোধী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিরোধিতা অব্যাহত থাকবে। তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিস্ট আমলে সংঘটিত সব অপরাধের বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী দিনের বক্তব্যে শহীদদের আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক। তাই জনগণের প্রতিটি সমস্যার সমাধান এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নই এই সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের সূত্র ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই সংসদের দিকে সমগ্র বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে। বিশ্বের যেখানেই একজন বাংলাদেশী আছেন, তারা এই সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় প্রত্যাশা ও আশা পোষণ করেন। আমরা বিভিন্ন সময়ে শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়েছি, কিন্তু শুধু শ্রদ্ধা নিবেদন করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যে প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, যেখানে মানুষ মুক্তভাবে কথা বলতে পারবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে- সেই আকাক্সক্ষা পূরণ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টো অনুযায়ী ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ শুরু হয়েছে। শুধু ধানচাষি নয়, মৎস্য ও গবাদিপশু পালনকারীসহ সব পর্যায়ের কৃষকের কাছেই আমরা পর্যায়ক্রমে পৌঁছাব।
শিক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, বিদেশে থাকার সময় দেখেছি স্কুল ও শিক্ষার্থীদের পরিবেশ কতটা উন্নত। আমার দেশের শিশুরা কেন সেই সুযোগ পাবে না? ইনশাআল্লাহ, আগামী জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাগ, ড্রেস ও জুতার ব্যবস্থা করা হবে। শিক্ষার্থীরা একটি সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশে লেখাপড়া করবে- এটিই আমাদের কাম্য।
নারী শিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারীকে পেছনে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, স্নাতক বা ডিগ্রি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা হবে। পাশাপাশি মেধাবীদের উপবৃত্তি দেয়া হবে।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি ব্যয় নয়, বরং বিনিয়োগ; যার রিটার্ন গ্রামীণ অর্থনীতির মাধ্যমে ফিরে আসবে।
বিরোধী দলের গঠনমূলক প্রস্তাবের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সঙ্কটসহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে বিরোধী দলের দেয়া প্রস্তাব আমরা গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। এ বিষয়ে যৌথ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, একসাথে বসে আলোচনা করলে যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব। তিনি বিরোধী দলের নেতা ও উপনেতাকে তাদের এলাকার সমস্যার তালিকা পাঠানোর অনুরোধ জানান এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন।
সমাপনী অধিবেশনে আবেগঘন বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রধানের চেয়ারটি বাইরে থেকে যতটা আরামদায়ক মনে হয়, বাস্তবে এটি ততটা নয়। এই চেয়ার দায়িত্বের ভারে সবসময় কঠিন অবস্থায় থাকে।
তিনি বলেন, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে জনপ্রিয় বা ‘পপুলার’ কথা বলে হাততালি পাওয়া সহজ, কিন্তু এই দায়িত্বের চেয়ার সেই সুযোগ দেয় না। এটি সবসময় মনে করিয়ে দেয়; জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নয়, বরং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ এবং সমস্যা সমাধানের গুরুভার এই দায়িত্বকে আরো কঠিন করে তোলে। জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত অনুসরণ করলে বাহবা মিলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলের প্রতি তিনি সঠিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আলোচনার আহ্বান জানান।
দেশের জলাবদ্ধতা ও পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার সমস্যা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি অত্যন্ত ভয়াবহ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি আবার শুরু করার লক্ষ্য হলো ভূগর্ভের পানির স্তর পুনর্ভরণ করা। এর সুফল পেতে প্রায় ২০ বছর সময় লাগবে, তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনায় এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে মোট বাজেটের প্রায় ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ চলছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ব্যাগ, বই ও জুতা দেয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু হাসপাতাল তৈরি করলেই হবে না, সেখানে চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ওষুধের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও গন্তব্য এক- বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা।
সংসদীয় গণতন্ত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হলে অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি ১৭৩ দিনের হরতালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, সেই সময়ের ক্ষতির প্রভাব আজও বহন করতে হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। স্থিতিশীল সরকার ও সংসদ ছাড়া এই সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। বেকার যুবক ও কৃষকদের সমস্যার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক দিয়ে কারো ক্ষুধা মেটে না বা অসুস্থ শিশুর চিকিৎসা নিশ্চিত হয় না। মানুষ এখন সমাধান চায়।
প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের প্রতি উদার মনোভাব দেখিয়ে বলেন, ডেপুটি স্পিকার পদ তাদের জন্য দেয়ার প্রস্তাব এখনো উন্মুক্ত। তিনি বিরোধীদলীয় নেতার বাসায় গিয়ে সহযোগিতাও চেয়েছেন। তিনি বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের ব্যর্থতা মানেই আমার ব্যর্থতা; আর আমাদের একজনের ব্যর্থতা মানেই বাংলাদেশের ব্যর্থতা। তাই একে অপরকে ব্যর্থ করার প্রতিযোগিতা নয়, বরং একসাথে কাজ করে সংসদকে সফল করতে হবে। একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনে আইটি শিল্পসহ সব খাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৭১-এর পরবর্তী বাংলাদেশ যে রকম শহীদের রক্তের উপরে দাঁড়িয়েছিল, বর্তমান বাংলাদেশ এবং বর্তমান সংসদ একইভাবে হাজারো শহীদের রক্তের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। অধিবেশন শেষ দিনে আমি এইটুকু আমার অবস্থান থেকে আবার পরিষ্কার করে দিতে চাই যে, আমরা সবসময় প্রস্তুত আছি, বিরোধী দলের সদস্যের সাথে, দেশ ও মানুষের স্বার্থে যেকোনো আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করার জন্য এবং আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই আমরা সবাই একসাথে এই দেশকে ইনশা আল্লাহ সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবো। এই দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করার আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করব।
বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রিসভার সদস্য, চিফ হুইপ, হুইপ এবং সব সংসদ সদস্যকে এবং বিশেষভাবে বিরোধীদলীয় নেতা এবং বিরোধীদলীয় সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আমরা ছাড়া বিরোধী দল পরিপূর্ণ নয়, উনাদের ছাড়া আমরা পরিপূর্ণ নই। সে কারণেই আমি মাননীয় বিরোধী দলের নেতা এবং বিরোধী দলের সব সদস্যকে বিশেষভাবে শুভেচ্ছা জানাতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী বা সেনাবাহিনী তাদেরকে আমরা যদি আমাদের ধন্যবাদের তালিকায় না আনি সেটি অন্যায় করা হবে। ফ্যাসিবাদের পলায়নের পরে এই সশস্ত্রবাহিনী এবং সেনাবাহিনী তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেছে দেশে যাতে কোনো অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হতে না পারে। আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সশস্ত্রবাহিনীর সব সদস্যকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই তাদের দায়িত্ব সঠিক সুন্দরভাবে পালন করার জন্য।
বক্তব্য শেষ করার আগে আবারো আমি বলছি, সব সংসদ সদস্যের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান থাকবে, আসুন আমরা এই সবুজ চেয়ারের পবিত্রতা রক্ষা করি। যে দায়িত্ব, যে প্রত্যাশা, যে আশা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ আমাদেরকে পাঠিয়েছে এখানে, আসুন সেই দায়িত্বের, সেই কর্তব্যের সর্বোচ্চ সম্মান আমরা প্রদান করি, যার মাধ্যমে আমরা দেশের মানুষকে সম্মান প্রদর্শন করব। কারণ দেশ এবং জনগণ থাকলেই আমরা আছি। সেজন্যই আমাদের সবচেয়ে প্রথম হচ্ছে এই দেশের জনগণ এবং এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
ভালো কাজে সহযোগিতা, মন্দ কাজে
বিরোধিতা : ডা: শফিক
বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকারের ভালো কাজে পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে এবং ভুল বা জনবিরোধী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিরোধিতা অব্যাহত থাকবে।কেউ চোখ রাঙালে আমরা ভয় পাই না।’ তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিস্ট আমলে সংঘটিত সব অপরাধের বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। গতকাল দীর্ঘ প্রায় ৪৩ মিনিটের বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। তার বক্তব্যের সময় সরকারি ও বিরোধী দলের অনেক সদস্য টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান।
ডা: শফিক তিস্তা নদী পাড়ের মানুষের দুর্ভোগ তুলে ধরে বলেন, ওই অঞ্চলের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে চরম কষ্টে রয়েছে। বর্ষায় বন্যা ও শুষ্ক মৌসুমে পানির সঙ্কট তাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার গল্প শুনতে শুনতে মানুষ ক্লান্ত—; এখন তারা বাস্তবায়ন দেখতে চায়। সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, দেশের কৃষক আজ ‘হাঁসফাঁস অবস্থায়’ আছেন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষকরা। তিনি অভিযোগ করেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাস কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। ‘চাঁদাবাজ কোনো দলের হতে পারে না; এরা দুর্বৃত্ত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা বন্ধ করে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
আসন্ন বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। হাসপাতালে শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় সেবা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ছে।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, অতীতের রাজনৈতিক বিভাজন ও ছাত্র সংগঠনগুলোর দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা হওয়া উচিত। রাজনৈতিক অঙ্গনে সহনশীলতা ও সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, আমাদের অনেক বন্ধু ’৭১-এর সংবিধান সম্পর্কে তাদের হোল হার্টেড রেসপেক্ট তারা পে করেন। আমি পারি না। এই যে বা যারা করেন তারা এখন সরকারি ট্রেজারি বেঞ্চে অনেকে বসে আছে। আপনিও পারেন না, কারণ ’৭২ এ সংবিধানটাকে পরিবর্তন করে দিয়ে গেছেন মরহুম প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান। ডা: শফিকুর বলেন, আমাদেরকে এমনভাবে বলা হয় যেন আমরা সংবিধানই মানি না। তো সংবিধান না মানলে এখানে আসলাম কেমনে? যত সময় পর্যন্ত দেশে বিদ্যমান সংবিধান আছে আমরা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করব কোনো পরিবর্তনের জন্য, কিন্তু বিদ্রোহ করব না।
সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের সব জায়গায় পরিস্থিতি এক রকম নয়; যে এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও ভঙ্গুর, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। ‘আমরা আর দেখতে চাই না, যে দলেরই হোক দায়ের কোপে কিংবা আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে প্রাণহানি ঘটুক; বলেন তিনি।
তিনি বলেন, একটি শিশুকে এমন পরিবেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে হবে, যাতে সে দক্ষ, নৈতিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হয়ে বের হতে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল সনদনির্ভর না করে মানবিক ও মূল্যবোধভিত্তিক করার ওপর জোর দেন তিনি।
দেশ এগিয়ে নিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার প্রাণ হচ্ছে গবেষণা, কিন্তু বাস্তবে গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন নেই। ‘গবেষণায় ভিক্ষার মতো বরাদ্দ দেয়া হয়, আবার সেই অর্থেরও অপচয় হয়’ মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত মেরিটোক্রেটিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে মেধা ও কমিটমেন্টের ভিত্তিতে মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি।
পররাষ্ট্রনীতিতে স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই নীতির ভিত্তিতে মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালিত হওয়া উচিত।
বক্তব্যের সময় নিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী তিনি আরো বেশি সময় পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সীমিত সময়েই বক্তব্য শেষ করেন।
দেশকে এগিয়ে নিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ‘লেট আস এগ্রি টু ডিসএগ্রি’-এই নীতিতে মতভেদ মেনে নিয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে জড়িয়ে অশ্লীল আচরণের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে অনলাইনসহ সব জায়গায় নোংরামি বন্ধে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান।
কেবল জনপ্রতিনিধিদের নয়, দেশের ২০ কোটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাস নির্মূলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন।
অধিবেশন সফল করতে পরিশ্রমী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক মাসের সমপরিমাণ বেতনের প্রণোদনা দেয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে, তবে অতীতে পড়ে থাকলে চলবে না। নতুন বাংলাদেশ গড়তে সম্মান, সংযম ও দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সংবিধান ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে
মির্জা ফখরুলের বক্তব্য
ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী তাদের বিরুদ্ধে ‘চেহারা বদলে গেছে’ বলে যে মন্তব্য করছে, তা সঠিক নয়। রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৫ আগস্টের পর থেকে বলা হচ্ছে আমাদের চেহারা বদলে গেছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি। বরং হঠাৎ করেই কিছু পক্ষের আচরণ বদলে গেছে। একটি পক্ষ ক্ষমতায় যাওয়ার ইঙ্গিত পেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ও অবস্থান পরিবর্তন করেছে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনব্যবস্থাকে অস্বীকার করা এবং ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলে অভিহিত করা জনগণ গ্রহণ করে না। এই দেশের মানুষ অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়।
মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং সেনারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।
সংবিধান নিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, সংবিধান দেশের অস্তিত্ব ও আবেগের সাথে জড়িত একটি দলিল, যা ১৯৭১ সালের শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। বিভিন্ন সময়ে সংবিধানে একাধিক সংশোধন হয়েছে এবং এটি ‘কাটাছেঁড়া অবস্থায়’ পৌঁছেছে।
তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রপতি একটি প্রতিষ্ঠান, কোনো ব্যক্তি নয়। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। ৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রপতির ভূমিকা না থাকলে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ইতিহাস দেশের জনগণের স্মৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। এ বিষয়ে কটাক্ষ করা হলে জনগণ কষ্ট পায়।
লন্ডন বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান এবং তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার মধ্যে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকই নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল। ‘ওই বৈঠকেই ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল’- দাবি করেন তিনি।
সংস্কার প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সঠিক নয়। বরং আমরাই সংস্কারের জনক। তিনি সংসদে রাজনৈতিক বিতর্ককে গঠনমূলক রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পারস্পরিক কটূক্তি গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দুর্বল করে।
‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের প্রক্রিয়া প্রতারণামূলক : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিগত ১৫ বছরে দেশে ‘লুটপাটের মহোৎসব’ চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, যার চিত্র এরই মধ্যে প্রকাশিত শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে।
গতকাল রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা দিয়ে কয়েক ডজন পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। ‘কে বড় মুক্তিযোদ্ধা-এই বিতর্কে না গিয়ে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়াই এখন জরুরি,’ বলেন তিনি।
সংবিধান সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে চলমান বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি কখনোই জুলাই সনদ থেকে বিচ্যুত হয়নি। ‘কিছু দল নির্দিষ্ট বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও বিএনপি সবসময় জনগণের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে,’ দাবি করেন তিনি। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই সনদকে পাশ কাটিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের প্রক্রিয়া প্রতারণামূলক। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এমন উদ্যোগ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলকে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংসদীয় রীতিনীতি মেনে জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান করাই প্রকৃত রাজনীতি। অংশীজনদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতেই সব সংস্কার ও নির্বাচনপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হবে বলে জানান তিনি। দেশে-বিদেশে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় কুৎসা রটানো সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে উল্লেখ করে তিনি এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, স্বাধীনতার নামে এই কলঙ্কিত ধারা বেশি দূর এগোতে দেয়া হবে না ।
২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
গণভোট না মানলে দেশ পিছিয়ে
যাবে : ডা: তাহের
নির্বাচনের আগে বিএনপি গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও এখন তারা তা মানছে না বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে দেশ পিছিয়ে যাবে।
ডা: তাহের বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিএনপি গণভোটের পক্ষে ছিল-এর প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু এখন তারা সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। সরকার যদি গণভোট না মানে, তাহলে দেশ উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতিতে পিছিয়ে পড়বে।’
তিনি আরো বলেন, সংসদে সরকারি দলের সদস্যদের আচরণ আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। অতীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে যে ধরনের ভাষা ব্যবহার করত, এখন সরকারি বেঞ্চ থেকে একই ধরনের আচরণ দেখা যাচ্ছে। অথচ সবাই মিলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল।
সংসদে ‘রাজাকার-আলবদর’ শব্দ ব্যবহারের সমালোচনা করে ডা: তাহের বলেন, ‘এ ধরনের ভাষা সংসদীয় শিষ্টাচারের পরিপন্থী। অতীতের কাদা ছোড়াছুড়ি বাদ দিয়ে গুণগত পরিবর্তনের রাজনীতি দরকার।’
তিনি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ‘অহঙ্কার’ নিয়ে সতর্ক করে বলেন, ইতিহাসে বিভিন্ন দেশের নেতারা অতিরিক্ত ক্ষমতার কারণে ভুল পথে গেছেন। ‘ক্ষমতায় গেলে যা খুশি তাই করা যাবে- এমন মানসিকতা রাষ্ট্র ও রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর,’ বলেন তিনি।
নির্বাচনের আগে ঐকমত্যের কথা বলা হলেও এখন সংসদে ‘শত্রুতামূলক পরিবেশ’ তৈরি হয়েছে, যা জাতির জন্য হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের অভিযোগের জবাবে ডা: তাহের বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে শুধু বিবৃতি নয়, রাজপথেও কর্মসূচি পালন করেছে। অতীতেও বিএনপির সাথে রাজনৈতিক সমঝোতার ইতিহাস রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ১৯৯১ সালে জামায়াতের সহযোগিতায় বিএনপি সরকার গঠন করেছিল এবং সে সময় তাদের মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দেয়া হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে ডা: তাহের বলেন, তিনি ও তার পরিবার ১৯৭১ সালে সীমান্তবর্তী এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন এবং শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছেন। ‘আমাদের সবাইকে একতরফাভাবে রাজাকার-আলবদর বলা সঠিক নয়,’ বলেন তিনি। ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। ‘সততা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে ইসলামী ব্যাংক সফল হয়েছে। এটিকে দলীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়,’ মন্তব্য করেন তিনি।
ডা: তাহের সংসদে রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই দেশের অগ্রগতির পথ খুলে দিতে পারে।
সাথে থাকলে সঙ্গী না থাকলে
জঙ্গি : নাহিদ ইসলাম
সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘বিএনপি ২৯ বছর জামায়াতের সাথে রাজনীতি করেছে। এখন সবাই বলে, সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি। এই রিকনসিলিয়েশন বা মীমাংসা করার দায়িত্ব ছিল বড় দলগুলোর।’ তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও সংসদে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বিভাজন থাকা কাম্য নয়।
প্রথম অধিবেশনের শেষ দিনে নাহিদ ইসলাম আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ফাউন্ডেশন, এটা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই। তবে মুক্তিযুদ্ধের নামে যে লুটপাট ও ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে, তাও ভোলা যাবে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধেরই নবায়ন। আমাদের উচিত ইতিহাসের এই বিতর্ক একপাশে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের নাম করে বা পক্ষ-বিপক্ষ কার্ড খেলে জনগণকে আর ভাগ করা যাবে না।’
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর অপসারণ ও তাকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, এই রাষ্ট্রপতির বঙ্গভবনে থাকার বা সংসদে বক্তব্য দেয়ার কোনো নৈতিক অধিকার নেই।
নাহিদ ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য আমি শুনিও নাই, পড়িও নাই। এবং সেই বক্তব্য এবং বক্তব্য দেয়ার সুযোগ করে দেয়াকে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। আমরা খুব স্পষ্টভাবে বলেছিলাম যে, এই রাষ্ট্রপতির অপসারণ প্রয়োজন; তাকে গ্রেফতার করা প্রয়োজন। এই রাষ্ট্রপতির আর কোনো অধিকার নেই বঙ্গভবনে থাকার, এখানে এসে বক্তব্য দেয়ার। তিনি আরো বলেন, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্যাঙ্গারু আদালতের নির্দেশে এই সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর নেতৃত্বে তিন সদস্যের জুডিশিয়াল ইনকয়ারি কমিশন অন মাইনরিটি টর্চার ইন ২০০১ করেছিল। তার প্রতিবেদন অনুসারে ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে কয়েক হাজার হিন্দুকে তারা হত্যা করেছে বলে ২৬ হাজার বিএনপি নেতাকর্মীকে দায়ী করা হয়েছিল। এবং আওয়ামী লীগ দেশে-বিদেশে এই রিপোর্ট ফেরি করে তারা নিজেদের ক্ষমতায় থাকাকে পাকাপোক্ত করেছিল। এই রাষ্ট্রপতি চুপ্পু এস আলমের হাতে ইসলামী ব্যাংককে তুলে দেয়ার কারিগর। দুই কোটি আমানতকারীকে পথে বসিয়েছেন। জুলাই গণহত্যার সময় তার ভূমিকা, ফ্যাসিবাদের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা সবকিছু আমরা জানি। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই দুর্নীতিবাজ, অপদার্থ, মিথ্যুক, গণহত্যার দোসর এখনো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।
নাহিদ বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্ররা রাষ্ট্রপতির অপসারণ চেয়েছিল; কিন্তু বিএনপি তখন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার দোহাই দিয়ে তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এখন তো নির্বাচিত সরকার, এখন কেন তাকে পরিবর্তন করা হচ্ছে না?’
একই আলোচনায় অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ১৯৪৭ কিংবা ১৯৭১- কোনোটিই মানেনি, অথচ এখন ৪৭-এর ত্যাগ নিয়ে কথা বলে।’ তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, কিছু রাজনৈতিক নেতা পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সাথে বৈঠক করে বাঙালি দমনে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, কিছুদিন আগেও পেট্রল ও বিদ্যুৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ‘এখন আর পেট্রলের লাইন নেই, লোডশেডিংও অনেক কমেছে,’ বলেন তিনি।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে মন্ত্রী বলেন, হাইকোর্ট থেকে খালাস পাওয়ার পরও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে মামলা পুনরুজ্জীবিত করে ৯ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল।
কেরানীগঞ্জ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অভিযোগ করেন, ১/১১-এর সময় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান গ্রেফতার হলেও জামায়াতে ইসলামী কোনো প্রতিবাদ জানায়নি। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া আপনাদের মর্যাদা দিয়েছেন, কিন্তু সেই মর্যাদা কতটা রক্ষা করেছেন?’ তিনি আরো বলেন, ১/১১-এর সময় বিরাজনীতিকরণের চক্রান্তের মধ্যেও তৃণমূল নেতাকর্মীরাই বিএনপিকে টিকিয়ে রেখেছিল। অতীতের ভুল স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।