১৯৭০ ও ২০২৬ সাল : ৫৬ বছরে কতটা বদলেছে নিত্যপণ্যের দাম

Printed Edition
back-4
১৯৭০ ও ২০২৬ সাল : ৫৬ বছরে কতটা বদলেছে নিত্যপণ্যের দাম

বিশেষ প্রতিবেদন

ঢাকার বাজারে এখন এক কেজি মাঝারি মানের চাল কিনতে খরচ গড়ে ৭০ টাকা, মসুর ডাল ১২০ টাকা, সরিষার তেল ৩৩০ টাকার আশপাশে। অথচ ১৯৭০ সালে একই শহরে এক কেজি চাল মিলত এক টাকারও কম দামে, ডাল দেড় টাকার কাছাকাছি, আর সরিষার তেলের দাম ছিল মাত্র কয়েক টাকা। অর্ধশতাব্দীর একটু বেশি সময়ে শুধু পণ্যের দামই বাড়েনি; বদলে গেছে দেশের অর্থনীতি, মানুষের আয়, উৎপাদনব্যবস্থা, বাজার কাঠামো এবং ভোগের ধরন।

৫৬ বছরের এই ব্যবধানে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির অনুপাতে কোনো সামঞ্জস্য নেই। স্বর্ণের দাম যেখানে ১৫০০ গুণ বেড়েছে সেখানে ডলারের দাম বেড়েছে ২৬ গুণের মতো। আর চালের দাম ৮৭ গুণের কাছাকাছি, ডালের দাম ৬০ গুণের কম, সরিষার তেলের দাম বেড়েছে ৮০ গুণের মতো, লবণের দাম ১৬০ গুণের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। ডলারের সাথে তুলনা করলে দ্বিগুণ বা তিন গুণ দাম বেড়েছে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের। কিন্তু স্বর্ণের দামের সাথে এই মূল্যবৃদ্ধির কোনো তুলনাই চলে না।

দুই সময়ের স্বর্ণ ও ডলারের দাম

১৯৭০ সালে যে পরিমাণ অর্থে (১৫০-১৮০ টাকা) এক ভরি স্বর্ণ কেনা যেত, বর্তমানে তার জন্য প্রয়োজন প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা। অর্থাৎ স্বর্ণের দাম প্রায় ১,৫০০ গুণেরও বেশি বেড়েছে। একই সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এক মার্কিন ডলার কিনতে যেখানে প্রয়োজন হতো মাত্র চার টাকা ৭৫ পয়সা, বর্তমানে বাংলাদেশে সেই একই ডলার কিনতে ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় ১২৩ টাকা। অবশ্য স্বর্ণের দামের বৃদ্ধির অনুপাতের সাথে ডলারের দাম বৃদ্ধির অনুপাতের কোনো মিলই নেই। উপরের দু’টি সূচক দেখায় যে, গত ৫৬ বছরে শুধু নিত্যপণ্যের দামই বাড়েনি; মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে ১৯৭০ সালের বাজারদরের সাথে বর্তমান বাজারদরের সরাসরি তুলনা করতে হলে মূল্যস্ফীতি, আয়ের বৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন, সবকিছু একসাথে বিবেচনা করা জরুরি।

কেন এত বেড়েছে দাম?

প্রথম কারণ, মুদ্রাস্ফীতি। ১৯৭০ সালের এক টাকার ক্রয়ক্ষমতা আজকের টাকার তুলনায় বহু গুণ বেশি ছিল। গত পাঁচ দশকে টাকার প্রকৃত মূল্য কমেছে এবং সাধারণ মূল্যস্তর ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

দ্বিতীয়ত, জনসংখ্যা। ১৯৭০ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ছয় কোটি। বর্তমানে তা ১৭ কোটির বেশি। ফলে খাদ্যের চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে।

তৃতীয়ত, উৎপাদন খরচ। কৃষিশ্রমিকের মজুরি, সার, বীজ, বিদ্যুৎ, সেচ, পরিবহন ও জ্বালানির ব্যয় এখন অতীতের তুলনায় অনেক বেশি।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাজার। ভোজ্যতেল, ডাল, গমসহ বহু পণ্যের জন্য বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর। বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার এবং পরিবহন ব্যয় সরাসরি দেশের বাজারকে প্রভাবিত করে।

তবে কেবল দাম বাড়ার হিসাব দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। ১৯৭০ সালে একজন সরকারি কর্মচারীর মাসিক বেতন ছিল কয়েক শ’ টাকার মধ্যে। বর্তমানে একই ধরনের চাকরিতে বেতন কমপক্ষে বিশ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয়ও বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেক মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার চিত্র নামমাত্র মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় ভিন্ন।

বাজারব্যবস্থার পরিবর্তন

১৯৭০ সালের বাজার ছিল মূলত স্থানীয় উৎপাদননির্ভর। এখন বাজারে দেশী ও আমদানিকৃত পণ্য পাশাপাশি বিক্রি হয়। আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা, সুপারশপ, কোল্ড চেইন, অনলাইন বাণিজ্য এবং সরকারি বাজার তদারকিও যুক্ত হয়েছে। একই সাথে বৈশ্বিক সঙ্কট, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বাজারকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রভাবিত করছে।

১৯৭০ সালের সাথে ২০২৬ সালের বাজারদরের তুলনা করলে দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় অধিকাংশ পণ্যের দাম অন্তত দশ থেকে কয়েক শত গুণ বেড়েছে। তবে এর পেছনে শুধু মূল্যস্ফীতি নয়; অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি, আয়ের পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, উৎপাদনব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারের প্রভাবও সমানভাবে কাজ করেছে। তাই বাজারদরের ইতিহাস শুধু মূল্যবৃদ্ধির গল্প নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।