গাজায় ভূমি দিবস পালিত

গাজায় ভূমি দিবস এখন শুধু ঐতিহাসিক জমির অধিকার নয়, বরং যুদ্ধ, অবরোধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে টিকে থাকার প্রতীক

Printed Edition
onno-2
গাজা সিটির দক্ষিণ-পূর্বে ভূমি দিবস উপলক্ষে পতাকা হাতে ফিলিস্তিনিরা : ইন্টারনেট

আলজাজিরা

একটি ছোট জমিতে তাঁবু খাটিয়ে সন্তানদের সাথে বসে আছেন সাওসান আল-জাদবা। ইসরাইলের ২০২৩ সালের গণহত্যার আগে তার তিনটি জমি ছিল, প্রতিটি প্রায় দুই হাজার বর্গমিটার। সেখানে তিনি জলপাই ও লেবুজাতীয় ফল ফলাতেন। এখন তার হাতে আছে মাত্র ৬০০ বর্গমিটার জমি। তিনি বলেন, ‘জমি মানে সম্মান। এক মিটার থাকলেও আমি তা আঁকড়ে ধরব।’

১৯৭৬ সালের ৩০ মার্চ ইসরাইলি বাহিনীর হাতে ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনার স্মরণে ভূমি দিবস পালিত হয়। আজ তা হয়ে উঠেছে নতুন বাস্তবতার প্রতীক যেখানে মানুষ তাদের সাম্প্রতিক হারানো জমি ও ঘরে ফেরার দাবি জানাচ্ছে। যুদ্ধ চলাকালে আল-জাদবা পরিবার দক্ষিণ গাজায় বাস্তুচ্যুত হয়। যুদ্ধবিরতির পর ফিরে এসে তিনি দেখেন তার বাড়ি ধ্বংস, জমি বুলডোজার দিয়ে মাটিচাপা দেয়া। তবুও তিনি চাষাবাদ শুরু করেছেন বেগুন, মরিচ, টমেটো, শাকসবজি। তিনি বলেন, ‘জীবন মানে জমি আঁকড়ে ধরা।’ ইসরাইলের সর্বশেষ হামলায় তিনি দুই ছেলেকে হারিয়েছেন। তার স্বামী নিহত হয়েছিলেন ২০০৮-০৯ সালের যুদ্ধে। তবুও তিনি জমি ছাড়ার কথা ভাবেননি। ‘গাজায় গণহত্যা, ক্ষুধা, লুটপাট কিছুই আমাকে জমি থেকে সরাতে পারবে না। মৃত্যুর পরও আমি এখানেই কবর হবো।’

ভূমি দিবস সাধারণত বিক্ষোভ ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হয়। কিন্তু টানা তিন বছর ধরে গাজায় তা হচ্ছে ধ্বংসস্তূপ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে। অনুমান করা হচ্ছে, ইসরাইল এখন গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। কৃষিজমি ধ্বংস বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ৬৮ বছর বয়সী বাশির হামুদা বলেন, ‘আজ আমরা শুধু ১৯৪৮ বা ১৯৭৬ সালের জমি নয়, বরং সাম্প্রতিক হারানো ঘরবাড়ি ও জমি ফেরত চাই।’ তিনি জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, রেখে এসেছেন তিনটি বাড়ি ও দু’টি জমি। তার চোখে জল এসে যায় ‘জমি মানে হৃদয়। হৃদয় ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না।’ তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক নীরবতা ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। ‘আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের জমি দখল হয়েছিল, বিশ্ব কিছু করেনি। আজও আমরা গণহত্যার শিকার, বিশ্ব নীরব।’ গাজা ও পশ্চিমতীরে জমি দখল ও বসতি সম্প্রসারণের মধ্যে ভূমি দিবসের অর্থ বদলে গেছে। এখন তা শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং বর্তমানের টিকে থাকার লড়াই। হামুদা বলেন, ‘আমি নাতি-নাতনীদের জমির অর্থ শেখাই। আমরা ভুলব না। যদি আমরা না ফিরতে পারি, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ফিরবে।’

ভূমি দিবসের ইতিহাস ও বর্তমান সঙ্কট

১৯৭৬ সালের ৩০ মার্চ ইসরাইলের জমি দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ছয়জন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং শতাধিক আহত হন। প্রতিবাদ হয়েছিল গালিলি অঞ্চলে, যেখানে ইসরাইলি সরকার প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমি বাজেয়াপ্ত করে। সাখনিন, আররাবে ও দেইর হান্না শহর ছিল সেই আন্দোলনের কেন্দ্র।

প্রতি বছর ৩০ মার্চ ফিলিস্তিনিরা ভূমি দিবস পালন করে। ইসরাইল ও দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজা, পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমে তারা মিছিল, প্রতিবাদ ও জলপাই গাছ রোপণের মাধ্যমে জমির সাথে সম্পর্ক পুনর্নবীকরণ করে। এ দিন বিশ্বজুড়েও বিক্ষোভ হয়।

ইসরাইল এখনো জমি দখল করছে। ২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি নিরাপত্তা ক্যাবিনেট পশ্চিমতীরে নতুন পদক্ষেপ নেয়, যাতে ফিলিস্তিনি জমি সহজে ইসরাইলি বসতকারীদের কাছে বিক্রি করা যায় এবং ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা বাড়ানো হয়। মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন দেশ এটিকে ‘বাস্তবিক সংযুক্তি’ এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনার ওপর সরাসরি আঘাত বলে নিন্দা জানিয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইল বসতি সম্প্রসারণ আরো বাড়িয়েছে। ২০২৩ সালে ১২,৩৪৯, ২০২৪ সালে ৯,৮৮৪ এবং ২০২৫ সালে রেকর্ড ২৭,৯৪১টি বসতি ইউনিট অনুমোদন দেয়া হয়েছে। একই সাথে ১৯টি অবৈধ বসতিকে বৈধ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

এ সময় পশ্চিমতীরে ইসরাইলি সেনা অভিযান, বাড়িঘর ধ্বংস ও গ্রেফতার বেড়েছে। বসতকারীরা হামলা চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে এবং তাদের সম্পত্তি ধ্বংস করছে। জাতিসঙ্ঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিমতীরে অন্তত ১,০৯৪ ফিলিস্তিনি ইসরাইলি সেনা ও বসতকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন। ২০২২ সালে বসতকারীদের হামলা ছিল ৮৫২টি, ২০২৩ সালে ১,২৯১টি, ২০২৪ সালে ১,৪৪৯টি এবং ২০২৫ সালে ১,৮২৮টি- গড়ে প্রতিদিন পাঁচটি হামলা।

এ দিকে ইসরাইলের চরমপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ দক্ষিণ লেবানন সংযুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, লিটানি নদী পর্যন্ত সীমান্ত বাড়াতে হবে। এর ফলে এক মিলিয়নের বেশি লেবাননি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল ক্যাটজ বলেছেন, ইসরাইলিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননে মানুষকে ফিরতে দেয়া হবে না। ভূমি দিবস আজ শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং বর্তমানের জমি হারানো ও ঘরে ফেরার দাবির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।