পোস্তায় চামড়া সরবরাহ কম

এবার কোরবানি হয়েছে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু

শাহ আলম নূর
Printed Edition

কোরবানির ঈদের পর রাজধানীর লালবাগের পোস্তা কাঁচা চামড়ার আড়তে এবার সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সরাসরি সাভারের ট্যানারিতে চামড়া চলে যাওয়াসহ বিভিন্ন নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এবার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চামড়া সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের দিন দুপুর থেকে পোস্তায় চামড়া কেনাবেচা শুরু হয়। এমন পরিস্থিতি টানা তিন দিন ধরে চলে। তবে ঈদের চতুর্থ দিন থেকে চামড়া সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় আড়তগুলোতে জোরেশোরে শুরু হয় চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণের কাজ। তবে এবার কাঁচা চামড়া সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

চামড়া সংগ্রহের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শাহাদাত অ্যান্ড কোংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, তাদের কোম্পানির লক্ষ্য ছিল চার হাজার চামড়া সংগ্রহ করা। তবে এবার কিনতে পেরেছেন মাত্র এক হাজার ৫০০ পিস চামড়া। তিনি বলেন, ট্যানারিগুলো পোস্তা থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এ দিকে বাইরে থেকে ঢাকায় ১০ দিনের আগে চামড়া আনতে না পারার নিয়মের কারণে সরবরাহও কম। ফলে লক্ষ্য পূরণ করা যায়নি বলে তিনি জানান। আনাস লেদারস ও তোবা লেদারস কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা হাসান কালু নয়া দিগন্তকে বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের চামড়া ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার পিস। কিন্তু কিনেছেন মাত্র তিন হাজার পিস। তিনি বলেন, এবার চামড়ায় গুটি পক্স বেশি দেখা গেছে। অনেক চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে লোকসানের ঝুঁকি মাথায় রেখে তারা চামড়া ক্রয় করছেন বলে তিনি জানান।

একই অবস্থার কথা জানান কামাল অ্যান্ড সন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, গত বছর আট হাজার পিস চামড়া কিনলেও এ বছর কিনতে পেরেছেন মাত্র দুই হাজার পিস। গোডাউন সঙ্কট, আড়তের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।

এ দিকে চামড়া বিক্রির সময় প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন বিভিন্ন মাদরাসার প্রতিনিধিরা। রাজধানীর বাড্ডার দারুল উলুম নুরিয়া মাদরাসার শিক্ষক মুফতি মাহমুদুল হাসান নয়া দিগন্তকে বলেন, তারা ৬৯৫টি চামড়া নিয়ে পোস্তায় গেলে এক পরিচিত আড়তদার অগ্রিম এক লাখ টাকা দিয়ে পরে প্রতি পিস ৭২৫ টাকা ধরে মূল্য পরিশোধ করেছেন। তাদের যে দাম দেয়া হয়েছে তা বাজার দামের তুলনায় অনেক কম। অথচ পরিচিত অনেকে চামড়া ৮০০ থেকে সাড়ে ৮০০ টাকায় বিক্রি করতে পেরেছেন বলে তিনি জানান। এ দিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছর চামড়ায় গুটি পক্সের প্রকোপ, সঠিকভাবে গোশত না ছাড়ানো, সময়মতো লবণ না দেয়া ইত্যাদি কারণে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, অনেকেই অসুস্থ পশুর চামড়া এনে বিক্রির চেষ্টা করছেন। ফলে আড়তদাররা লোকসানের মুখে পড়ছেন।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি মঞ্জুরুল হাসান নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে লবণযুক্ত চামড়া ক্রয়ের নিয়ম থাকলেও অনেকেই লবণ ছাড়া চামড়া নিয়ে আসছেন। এমন পরিস্থিতিতে দাম কম হচ্ছে। শহরের চামড়া সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে এবং বাইরের চামড়া রাত ১০টার মধ্যে পোস্তায় নিয়ে আসতে পারলে পচন রোধ সম্ভব। এমন পরিস্থিতিতে অনেক চামড়া দেরিতে আসার কারনে গরমে নষ্ট হচ্ছে বলে তিনি জানান।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে এবার ঈদুল আজহায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে গরু-মহিষ কোরবানি হয়েছে ৪৭ লাখ পাঁচ হাজার ১০৬টি। ছাগল-ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি এবং অন্যান্য প্রাণী (উট, দুম্বা ইত্যাদি) কোরবানি হয়েছে ৯৬০টি।

জানা গেছে, লবণজাতকরণে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। তবে পরিবহন সমস্যা, যানজট ও প্রচণ্ড গরমের কারণে এবারো অনেক চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। এ দিকে চামড়া রফতানির প্রধান বাজার চীনে আগের মতো আগাম এলসি খোলা হচ্ছে না। সরবরাহের দুই-তিন সপ্তাহ পর অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরা অর্থ সঙ্কটে পড়ছেন। ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারের আন্তরিকতা ছাড়া চামড়া শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্তরায়িত দৈব নমুনায়নের (স্ট্র্যাটিফায়েড র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং) ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করে পশু কোরবানির হিসাব করা হয়েছে। এ জন্য প্রতিটি উপজেলার তিনটি গ্রাম (ছোট, মাঝারি ও বড়) থেকে অন্তত ১ শতাংশ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, গত ঈদুল আজহায় এক কোটি চার লাখ ৮ হাজার ৯১৮টি পশু কোরবানি দেয়া হয়। সে হিসাবে এ বছর পশু কোরবানি কমেছে, সংখ্যার হিসাবে যা ১২ লাখ ৭২ হাজার ১৮৪।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব বিবেচনায় নিলে গত চার বছরের মধ্যে এই ঈদে পশু কোরবানি সবচেয়ে কম হয়েছে। অধিদফতরের গত ৯ বছরের (২০১৭ থেকে ২০২৫) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবচেয়ে কম কোরবানি হয়েছিল ২০২১ সালে। ওই বছর ৯০ লাখ ৯৩ হাজার পশু কোরবানি দেয়া হয়। অবশ্য তখন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে করোনা মহামারির প্রকোপ ছিল। সবচেয়ে বেশি পশু কোরবানি হয়েছিল ২০১৯ সালে। ওই বছর এক কোটি ছয় লাখের বেশি পশু কোরবানি হয়।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো: আবু সুফিয়ান নয়া দিগন্তকে বলেন, এবার কোরবানি কিছুটা কম হয়েছে, এটা দৃশ্যমান। ছাগল-ভেড়া এ বছর কিছুটা কম কোরবানি হয়েছে। এতে মনে হচ্ছে ব্যক্তিপর্যায়ে কোরবানি কিছুটা কমেছে। আরো তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করতে হবে। বিস্তারিত বিশ্লেষণের পর কেন এবার কোরবানি কমলো, তা বলা যাবে।

এ দিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বলেছে, এবার পশু অবিক্রীত ছিল ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি। এর কারণ হিসেবে অধিদফতর বলছে, এ বছর কোরবানির পশুর উৎপাদন বেশি ছিল। তাই কোরবানির পশু অবিক্রীত থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তা ছাড়া অবিক্রীত এই পশু সামনে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে দরকার হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতর জানিয়েছে, এ বছর পশু কোরবানি সবচেয়ে কম হয়েছে সিলেট বিভাগে। এই বিভাগে তিন লাখ ১৯ হাজার ৮২৩টি পশু কোরবানি হয়েছে। সিলেটের পর সংখ্যার দিক থেকে কোরবানি কম হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে। এই বিভাগে তিন লাখ ৮৩ হাজার ১৬২টি পশু কোরবানি হয়েছে।

এ বছর সবচেয়ে বেশি পশু কোরবানি হয়েছে রাজশাহী বিভাগে, ২৩ লাখ ২৪ হাজার ৯৭১টি। ঢাকা বিভাগে পশু কোরবানি হয়েছে ২১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০টি। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৭৩২টি, রংপুর বিভাগে ৯ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯৯টি, খুলনা বিভাগে ৮ লাখ চার হাজার ২২৪টি এবং বরিশাল বিভাগে চার লাখ ৭৮৩টি পশু কোরবানি হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের ডিন মো: রুহুল আমিন নয়া দিগন্তকে বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা হয়তো ভালো না, যার কারণে এবার কোরবানি কম হয়েছে। সাধারণত রাজনৈতিক নেতারা কোরবানির জন্য বড় আকারের গরু কেনেন। আবার অনেক নেতা একাধিক গরু কোরবানি দেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এখন পলাতক। এর প্রভাব কোরবানির পশু বিক্রির ক্ষেত্রে পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।