উৎসবের সাজে সেজেছে পাহাড়

বিজু সাংগ্রাই বৈস –বিষু চাংক্রান চাংলান পাতা বিহুতে মুখর পার্বত্য চট্টগ্রাম

Printed Edition
3rd-11
পাহাড়ে চলছে বর্ষবরণ উৎসব : নয়া দিগন্ত

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করতে উৎসবের রঙে রাঙিয়েছে পাহাড়। রাঙ্গামাটি থেকে শুরু করে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন মুখর ঐতিহ্যবাহী বিজু,সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা ও বিহু উৎসবে। এই আয়োজন শুধু বর্ষবরণের নয়, এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য প্রকাশ। পাহাড় সেজেছে আজ উৎসবের রঙে। আনন্দ উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে রাঙ্গামাটি ও আশপাশের অঞ্চল।

বৃহস্পতিবার রাঙ্গামাটিতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। শোভাযাত্রায় বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে বার্তা দেয়া হয়।

উৎসব ঘিরে সামনে রয়েছে নানা আয়োজন। এর মধ্যে আছে ফুল ভাসানো, ঘর সাজানো, পিঠা-পুলি দিয়ে আপ্যায়ন, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সব মিলিয়ে এটি এখন এক সার্বজনীন আনন্দের আয়োজন। পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিজেদের স্বকীয় রীতিতে এই উৎসব পালন করে। এতে বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আরো সমৃদ্ধ হয়।

বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায়ের এই উৎসবকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন সাজ সাজ রব। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে এই উৎসবের ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। চাকমারা উদযাপন করেন বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসু বা বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু, অহমিয়ারা বিহু এবং চাক, ম্রো, বম ও খুমিরা চাংক্রান নামে উৎসব পালন করেন।

সমতলের মানুষের কাছে এই উৎসব ‘বৈসাবি’ নামে বেশি পরিচিত। বৈসুর ‘বৈ’, সাংগ্রাইয়ের ‘সা’ এবং বিজুর ‘বি’ থেকে ‘বৈসাবি’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। তবে এবারের উৎসব ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এসেছে। ‘বৈসাবি’ নামের পরিবর্তে প্রতিটি পাহাড়ি সম্প্রদায়ের নিজস্ব নামে উৎসব পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগকে শুধু নাম পরিবর্তন নয়, বরং সাংস্কৃতিক স্বাতস্ত্র্য রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। এসবই আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ। তাই বৈচিত্র্যকে এক নামে সীমাবদ্ধ না রেখে নিজ নিজ পরিচয়ে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

রাঙ্গামাটিতে সপ্তাহব্যাপী এই উৎসবে রয়েছে নানা আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, পিঠা উৎসব, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মঞ্চনাটক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

রাঙ্গামাটিতে সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু, সাংক্রাই, চাংক্রান ও পাতা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, আগামীকাল ১২ এপ্রিল এ পর্ব শেষ হবে। এছাড়া ১৭ এপ্রিল মারমা সংস্কৃতি সংস্থার সাংগ্রাই জলোৎসবের মাধ্যমে রাঙ্গামাটির উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।

আগামী ১২ এপ্রিল রোববার রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারের পূর্বঘাটে কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হবে। এ ছাড়া ঘর সাজানো, বয়স্ক স্নান, বস্ত্র বিতরণ এবং পিঠা-পুলি দিয়ে অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন থাকবে। এ দিকে এই সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে বিপণিবিতানগুলোতেও জমে উঠেছে কেনাকাটা।

পাহাড়ি উৎসবগুলোর মূল বার্তা শান্তি ও সম্প্রীতি। এই বার্তা অক্ষুণœ রেখে প্রতিটি সম্প্রদায় যদি নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারে, তবে তা হবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের প্রতিফলন।