আমার মনে হলো এই বিহানবেলার রূপটি কি ‘আশি লক্ষ ভোর’এর একটি? হতে পারে। ওই নামে একটি বই আছে কবি আবদুল হাই শিকদারের। আমরা কী জানি আমাদের কপালে আশি লাখ ভোর দেখার সৌভাগ্য হবে কি-না!
আশি লক্ষ ভোর-এর কবি : ড. মাহবুব হাসান
Printed Edition
বিং ওয়াল পেপারের দেয়া কিছু ছবি প্রতিদিনই আমাকে এই বিস্ময়কর পৃথিবীর অনন্য সব রূপ দেখায়। আমি প্রায় প্রতিদিনই চমকে উঠি। আজ সকালে যখন ওপেন করছি ল্যাপটপ, বিং দেখালো ক্যালিফোরনিয়ার একটি রকি পর্বতের ছবি। পাথরের ওপার থেকে একটি নরম-কোমল আরোর উদ্ভাস দেখতে পাচ্ছি। অনন্য সেই দীপ্তির ঔজ্বল্য। ক্যালিফোরনিয়ার সানবারনারডিনোতে ছিলাম আমি, চার বছরেরও বেশি সময়, কিন্তু একবারও ওই পর্বতে যাইনি বা যাওয়ার সুযোগ পাইনি। তাই ওই ছবি অপরিচিত। সেই অপরিচয়ের বেড়া ডিঙিয়ে একটি আলোক ছটা উদিত হতে দেখলাম আমারই মনে, অন্তরাত্মায়। আমার মনে হলো ছবিটা কোনো এক বিহানবেলায় তোলা, ভোর তার দোর খুলে তাকাচ্ছে আমারই দিকে। মনে হলো নতুন ওই ভোর যেন আমাকেই ডাকছে।
আমার মনে হলো এই বিহানবেলার রূপটি কি ‘আশি লক্ষ ভোর’-এর একটি? হতে পারে। ওই নামে একটি বই আছে কবি আবদুল হাই শিকদারের। আমরা কী জানি আমাদের কপালে আশি লাখ ভোর দেখার সৌভাগ্য হবে কি-না! অত দীর্ঘ জীবন কি পাবো আমি? এর মধ্যেই তো যাপিত জীবনের বরাদ্দের বেশি অংশ ব্যয় করেছি। এখন কেবল অপেক্ষা একটি চিরদিনের ভোরের জন্য।
আশি লক্ষ ভোর-এর কবি চেতনার নাম আমি নিয়েছি।। ওই বইয়ের নামটি দেখেই আমার মনে হয়েছিল তার কল্পনাশক্তি কতটা বিপুল ব্যাসার্ধ্য।ি মনে হলো তার চিন্তার যেন ব্যাসার্ধ্য নেই। তিনি যেন কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মির বর্ণহীন কণিকায় পূর্ণ। তার মানে কি তার চিন্তা-ভাবনা বর্ণিল নয়? না, সেটা বোঝাইনি আমি। আমি বোঝাতে চেয়েছি তার নিঃশব্দপ্রায় চেতনার অভিযাত্রার কথা। আমাদের চৌপাশে কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মির খেলা চলছে কিন্তু তাকে দেখতে পাচ্ছি না। টেরও পাচ্ছি না। সূর্যরশ্মির তো খেলা আমরা দেখতে পাই। রঙধনু সেটি দেখায় আমাদের। কবির রঙধনুর নাম তার কবিতা। আর সেই কবিতার থাকগুলো নির্মিতি পায় রঙধনু আর জুমচাষের মতো স্তরে স্তরে। সেই অভিজ্ঞতা আমরা অর্জন করেছি আমাদের পার্বত্য চাষিদের চর্চা থেকে। বিং ওয়াল পেপারই যেন তার বৃহত্তর রূপ উপস্থাপন করল আমার চেতনায়, আমার দৃষ্টির সীমায় আনল নতুন দিগন্ত।
এই প্রকৃতি যে এক বিশ্ব কবি, আবদুল হাই শিকদার তা ভালো করেই জানেন। তাই তো আমরা আশি লক্ষ ভোর দেখি, তার চেতন-চোখে। আর ভাবি, তিনি কী মাছি? তার কী আছে ৬৪টি চোখ? না, তার চোখ দুটোই, তবে হৃদয়ের মতো বিশাল এক অন্তর্জগত তো তারই চিন্তারাজ্যের নিয়ন্ত্রক। তিনি তাই ভাবতে পারেন আশি লাখ ভোরের কাব্যিক বোধ। তিনি নির্মাণ করতে পারেন, তার চেতনার বর্ণহীন কসমিক রে-কে বর্ণময় ভাষায় অনুবাদ করতে। সাধু সাধু!
গত শতকের সাতের দশকের শেষপাদে আবদুর হাই শিকদারের আবির্ভাব বাংলা ভূমির কাব্যাঙ্গনে। আবির্ভাবের পর তিনি দীর্ঘ দীর্ঘ কবিতার বয়ান রচনা করেছেন। সেই ন্যারেটিভসের মৌলিক দিক হচ্ছে গণমানুষের প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থন ও তার প্রতিকার্থে, চেতনার উন্মেষ ঘটানো। রাজপথের মতোই দীর্ঘ ও সোজা পথে তিনি অবিরল হেঁটে চলেছেন। কেননা, তার কবিতার উপাত্ত যেহেতু মানুষ এবং মানুষের নির্মম নিপীড়িত জীবন সংগ্রাম, তাই কথার নির্মাতা হিসেবে তিনি তো অনর্গল তা উৎপাদন করতে পারেনই। তিনি নিয়তই নিযুক্ত থাকেন তার লেখার কর্মে, চিন্তার ফল্গুতে ঢেউ তুলে তিনি নির্মাণ করেন কবিতা। তার আপাত সর্বশেষ কবিতার বই ‘আমরা মানুষ, আমরা এসেছি’। এই বই বেরিয়েছে ২০২৫-এর একুশে গ্রন্থ মেলাকে সামনে রেখে। নাম দেখেই বোঝা যায় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের রক্তস্নাত ভোর দুপুর বিকেল আর আতঙ্কিত রাতগুলো কিভাবে ভাষায় উঠে এসেছে-
শহীদের রক্ত আর আহতদের বেদনা দিয়ে
আমরা তৈরি করি আশা
সেই আশার হৃদয়ে নির্মাণ করি ভবিষ্যৎ।
তার এই বয়ানই বলছে তিনি কাদের কথা বলছেন। অবশ্যই তারা প্রতিবাদী তরুণ সমাজ। অবশ্যই তারা স্বপ্নবাজ, যারা ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। আগামী যারা দেখতে পান না, তারা না পারেন বয়ানের ঘোর তৈরি করতে না পারেন, স্বপ্নময় বীজ উপ্ত করতে। সেই বীজ মাটির রস আর অন্ধকার ফাটিয়ে যে শিশু চারাটি মাথা তুলবে, তার নাম স্বাধীনতা। এ জন্যই শিকদার করিতার নাম রেখেছেন স্বাধীনতা ও মুক্তি।
এই কবিতার দ্বিতীয় স্তবক হচ্ছে...
আমরা আমাদের জনগণের জন্য
উপস্থাপন করি মেঘমুক্ত আকাশ
এবং আমাদের জাতির জন্য
সৃষ্টি করি স্বাধীনতা ও মুক্তি।
(১৩ জুলাই ২০২৪)
লক্ষণীয় যে, প্রথম স্তবকে তিনি লিখেছেন তৈরি শব্দটি, আর দ্বিতীয় ও শেষ স্তবকে লিখেছেন সৃষ্টি। তৈরি আর সৃষ্টি শব্দের মধ্যে যে অর্থ ও রূপগত পার্থক্য, সেটি বুঝতে হবে। কবিতাটি ন্যারেট করা। মানে বর্ণনাত্মক। এখানে অ্যালেগরি বা মেটাফরই কাজ করছে। কোনো উপমা বা চিত্রকল্প রচনা করেননি। কিন্তু কল্পনার দুয়ার যে উন্মুক্ত করেছেন, যা আমাদের ভাবতে শেখায়, তিনি স্বাধীনতা আর মুক্তিকে কেন মেঘমুক্ত করার কথা বলেছেন।
মীর মুগ্ধকে নিয়ে লিখেছেন কবিতা। তার চার পঙ্ক্তি...
রাত পোহাবে প্রভাত হবে মুগ্ধ কি আর নাই
সব হৃদয়ে তার বাড়িঘর সব মানুষের ভাই
চাঁদনি রাতে মুগ্ধ হবো দুপুরবেলার ঘাম,
স্বাধীনতার সব মিছিলে থাকবে তারই নাম।
আবার আবু সাঈদকে নিয়ে তার উচ্চারণ...
হাজার নদী রক্ত ঢেলে দুয়ার খোলে ভোরের,
দানববংশ ধ্বংস করে বিনাশ করে চোরের।
গুমপুরীতে আনলো জুলাই দোয়েল পাখির শিস,
জুলাই তুমি আবু সাঈদ তোমাকে কুর্নিশ।
(জুলাই বাংলাদেশ)
চব্বিশের যে গণ-অভ্যুত্থান, যারা রক্ত দিয়ে আবারো স্বাধীন করেছে আমাদের রাজনৈতিক ফ্যাসিজমের নিগড় থেকে, ব্যক্তি ফ্যাসিস্টের সাত পাকে বাঁধা সোহাগ থেকে আমাদের মুক্তির মন্ত্রণাদাতা হচ্ছে নয়া প্রজন্মের তরুণরা। আবদুল হাই শিকদার সে কারণেই আবু সাঈদের আত্মবলিদানকে কুর্নিশ করেছে। আমরাও, সে দিন টিভি নিউজ লাইভ স্ক্রিনে দেখলাম তাকে পুলিশ কিভাবে হত্যা করেছে। যারা এই হত্যার জন্য দায়ী তারা মানুষ, এই তকমা পেতে পারে না। ওপরওয়ালার নির্দেশ পালন করার চেয়ে প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠের স্লোগান কি সেই হৃদয়হীন পুলিশের মনে হয়নি ওই আবু সাঈদ তারই ভাই, সহোদর, যাকে গুলিতে ঝাঝরা করছে পুলিশ তারাও তো মানুষই ছিলেন, তাদেরও তো ভাই, বোন আর শিশু সন্তান আছে। এতটা অমানুষ হতে পারে তারাই যারা এ দেশের নয়, তারা ভিনদেশী ঘাতক, এটিই আমার ধারণা।
আমি আরো কয়েক ফোঁটা কবিতার পঙ্ক্তি উদ্ধার করি আমরা মানুষ, আমরা এসেছি থেকে। সেখানে শিকদারের চেতনার রঙ কিভাবে চিত্র আর চিত্রকল্পের দ্বৈরথে নির্মিতি পেয়েছে বাঙ্ময় রূপে।
আমরা মানুষ আমরা এসেছি পলাশীর গোঙরানি
আমরাএসেছি মজনু শাহের দহন
আমরা এসেছি শ্রীরঙ্গপত্তম
আমরা এসেছি ১৮৫৭-এর বজ্রের গর্জন
আমরা এসেছি গালিবের ক্রন্দন
আমরা মানুষ আমরা এসেছি আন্দামানের কারাগারগুলো ভেঙে
আমরা মানুষ আমরা এসেছি কোটি তিতুমীর ছেলে
আমরা এসেছি জালিয়ানঅলা থেকে
আমরা এসেছি বীর শমসের গাজী
আমরা মানুষআমরা এসেছি চুরুলিয়া থেকে আগুনের ফুল হয়ে
(আমরা মানুষ আমরা এসেছি)
আমরা যারা পাঠক, বুঝতে পারি পরাধীন ভারতের বীরদের নিয়ে রচিত হয়েছে এই রাজনৈতিক কথামালা। এই কবিতায় আছে অনেক চিত্র ও চিত্রসাম্য। আমরা সেগুলোকে চিত্রকল্পে পরিণত হতে তেমন একটা দেখি না বটে, তবে ওই সব ব্যক্তির সংগ্রাম যে স্বাধীনতার পতাকাবাহী ছিল তা বুঝতে পারি। আর সেই পতাকার আলো জলমল চেহারা আমরা কল্পনার কল্পে রাঙাতে পারি। সেই রাঙানো কল্পনায় কেবল স্বাধীনতার বোধই বাঙ্ময় হয়নি, আমাদের ইতিহাসের রাজনৈতিক সংগ্রামের ছায়ায় আমাদের মনন-মানস নির্মাণ করে। তবে, এ কবিতায় ক্ষুদিরামের সহোদর হওয়ার যে বাসনা তিনি চাইছেন, তা স্বাধীনতার পক্ষের কোনো দর্শন নয়, তা বঙ্গভঙ্গরদ করার বিরুদ্ধে ক্ষুদিরামের অস্ত্রধারণ ছিল। বঙ্গভঙ্গরদ হচ্ছে রাজধানী ঢাকা থেকে আবারো কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম। বৃহত্তর হিন্দুইজমের পক্ষে ক্ষুদিরাম ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, যা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই কেবল নয় পূর্ববাংলা ও আসামের সাধারণ মানুষদের বিরুদ্ধেও ছিল। তাই ক্ষুদিরামের সহোদর হলে আমরা হিন্দুইজমের সহযোগী হই, যা মূলত সাম্প্রদায়িক কাজ।
সান্দ্রাংশ থেকে কয়েক পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করি। তাতে আবদুল হাই শিকদারের রাজনৈতিক মননের স্পর্শ পাওয়া যাবে।
এ কোন বাংলাদেশ- চারদিকে শুধু রক্ত, মৃত্যু, ধ্বংসের উৎকট বিভীষিকা। ক্ষত বিক্ষত রক্তাক্ত আর্ত, আহত মানুষের গোঙানি। মাথার উপর ঘনঘন চক্কর দিচ্ছে হেলিকপ্টার জনতার ওপর ছোঁড়া হচ্ছে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, বুলেট। রাজপথে, অলিতে-গলিতে, মাঠে-ময়দানে যেখানেই আন্দোলনকারীরা, সেখানেই পুলিশ নির্বিচারে চালাচ্ছে গুলি। স্নাইপাররা টার্গেট করে হত্যা করছে মানুষ। রক্তে ভাসছে দেশ। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আজ বিস্মিত, স্তম্ভিত। বাকরহিত।
এই কয়েকটি বাক্যের ভেতরে গেঁথে উঠে এসেছে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকারের ফ্যাসিস্ট হিংস্রতা। ফ্যাসিজম বাংলাদেশ পছন্দ করে না। মনে-প্রাণে ঘৃণা করে। পাকিস্তানি ফ্যাসিস্টদের আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিতাড়িত করেছি ১৯৭১ সালে। আবার ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকেও পরাজিত করেছি আমরা। ওই ফ্যাসিস্ট হাসিনার হিংস্রতার নমুনা মাত্র কয়েকটি বাক্যেই উঠে এসেছে, যা আবদুল হাই শিকদার তার আমরা মানুষ, আমরা এসেছি-তে তুলে এনেছেন। তাকে ধন্যবাদ এই রাজনৈতিক ইতিহাসের নমুনা সংরক্ষণের জন্য।