দোষীদের বিচার, যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিতের দাবি

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর

Printed Edition
back-3
সাভারে ধসে যাওয়া রানা প্লাজার সামনে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত বিক্ষোভ : নয়া দিগন্ত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

শোক-ক্ষোভ আর হতাশার মধ্য দিয়ে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পালিত হলো গতকাল। শ্রমজীবী মানুষের শোকার্ত এই দিনে সাভারে রানা প্লাজা ধসে নিহত শ্রমিকদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন আহত শ্রমিক, নিহত শ্রমিকদের স্বজন ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ধ্বংস হয়ে যাওয়া রানা প্লাজার সামনে অবস্থিত অস্থায়ী শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন তারা। এর আগে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও হতাহতদের ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করে কয়েকটি শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা। শুধু শ্রমিক সংগঠনই নয়, শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

বিক্ষোভে শ্রমিক নেতারা বলেন, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সংঘটিত রানা প্লাজা ধসে ১,১৩৬ জন শ্রমিক নিহত এবং ২,৪৩৮ জন শ্রমিক আহত হন, যাদের বেশির ভাগই নারী ও তরুণ শ্রমিক। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবার যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন উপযুক্ত চিকিৎসা এবং ন্যায্যবিচার পাননি। দীর্ঘ সময় পার হলেও শ্রমিক নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ এবং শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার পথে নানামুখী বাধার কারণে তারা তাদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। শুধু রানা প্লাজার ঘটনা নয়, অন্যান্য শিল্পক্ষেত্রেও বারবার দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে, যার মূল কারণ চিহ্নিত করা এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো ব্যর্থ। রাষ্ট্র এই ক্ষেত্রে তার দায়বদ্ধতা যথাযথভাবে পালন করতে পারছে না। বক্তার আরো বলেন, এই সমস্ত দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা এখনো উপযুক্ত শাস্তি পাননি, যা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়িয়েছে। শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তার মান উন্নয়ন এবং সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। মালিকপক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত না হওয়ার ফলে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য দাবির জন্য রাস্তায় আন্দোলনে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। আগামী দিনে শ্রমিক নিরাপত্তা, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে সংহতি, সচেতনতা এবং সক্রিয় উদ্যোগ অপরিহার্য, যাতে শ্রমিকেরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারে এবং তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা যায়। সব শিল্প দুর্ঘটনার বিচার, যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হলে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। একই সাথে কার্যকর নজরদারি, আইন প্রয়োগের শক্তিশালী ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়।

গ্রিন বাংলা গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন ও ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স ইউনিটি সেন্টারের সভাপতি সুলতানা বেগমের নেতৃত্বে এ সময় উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো: ইলিয়াস, সহসভাপতি সেলিনা হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মো: ফরিদ উদ্দীন, যুগ্ম সম্পাদক রোজিনা আক্তার সুমি, প্রচার সম্পাদক মো: তাহেরুল ইসলাম, আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মো: ইউসুফ শেখ, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিক নিলুফা, শিলা, নিলুফা, হাসিনা, মাসুদা ও নিহত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। তারা সম্মিলিতভাবে শ্রমিকদের ন্যায়বিচারের নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বিপ্লবী গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অরবিন্দ ব্যাপারী বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের ১২ বছরে দোষীদের বিচার দেখতে পাইনি। আগের সরকার বিচারের আশ্বাস দিয়েছিল; কিন্তু বিচার হয়নি। বিএনপি সরকারের কাছে আমাদের দাবি ন্যায্য দাবিগুলো যেন পূরণ করা হয়।

সাভার (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, গতকাল সকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশ তৃণমূল গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি সাভারের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় জড়িতদের বিচার এখনো সম্পূর্ণ হয়নি, যা নিহতদের পরিবার ও আহত শ্রমিকদের জন্য গভীর হতাশার বিষয়। সংগঠনের সাভার থানা কমিটির সভাপতি মো: শফিকুল ইসলাম বেপারীর নেতৃত্বে আয়োজিত এই কর্মসূচি থেকে ভবন মালিক সোহেল রানার ফাঁসি এবং ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়।

এ ছাড়াও বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে রয়েছে রানা প্লাজার জমি ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে পুনর্বাসন, আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা, এক জীবনের আয়ের ক্ষতিপূরণ প্রদান, ২৪ এপ্রিলকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা এবং দুর্ঘটনাস্থলে একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ। একই সাথে দেশের সব কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়। বক্তারা আরো বলেন, এই দিনটি নিহত ও আহতদের পরিবারের জন্য এক গভীর বেদনার স্মারক। তাদের দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। এ সময় গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, গার্মেন্ট শ্রমিক অধিকার আন্দোলন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল-গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, গার্মেন্ট শ্রমিক জোট বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স ইউনিটি সেন্টার, গ্রামীণ বাংলা গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনসহ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।