সিটি মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা

স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে এনসিপির নতুন হিসাব : পাঁচ দফা দাবি

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনসহ দেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি বলছে, এটি তাদের বড় রাজনৈতিক প্রস্তুতির অংশ। সামনে আরো সাতটি সিটিতে প্রার্থী ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছে তারা।

গত রোববার রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন দলের আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

ঘোষণা অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রার্থী হবেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং ঢাকা উত্তর সিটিতে লড়বেন আরিফুল ইসলাম আদীব। এ ছাড়া কুমিল্লা সিটিতে তারিকুল ইসলাম, রাজশাহী সিটিতে মো: মোবাশ্বের আলী এবং সিলেট সিটিতে আবদুর রহমান আফজাল মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। দলটির নেতারা বলছেন, এই প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় এবং মানুষের সাথে তাদের যোগাযোগ ভালো।

সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে অনেক দিন ধরে স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। এতে সাধারণ মানুষ ঠিকমতো সেবা পাচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসক বসিয়ে রেখেছে, যার ফলে জনগণের অংশগ্রহণ কমে গেছে এবং জবাবদিহিও কমেছে। তিনি বলেন, মানুষ এখন নিজের ভোটে প্রতিনিধি বেছে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এতে স্থানীয় সরকার দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই দ্রুত নির্বাচন দেয়া দরকার বলে মনে করে এনসিপি।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি সরকারেরও সমালোচনা করা হয়। নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার স্থানীয় সরকারসহ অনেক প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসক নিয়োগের বিরোধিতা করলেও এখন নিজেরাই সেই পথেই হাঁটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ থাকলেও এনসিপি এতে অংশ নিচ্ছে। দলটির নেতারা বলছেন, নির্বাচনে থাকলে তারা মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করতে পারবে। তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে সবার জন্য সমান সুযোগ, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।দলের স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম বলেন, এই পাঁচটি সিটিতে প্রার্থী ঘোষণা তাদের প্রস্তুতির শুরু। খুব দ্রুত বাকি সিটিগুলোর প্রার্থীও ঘোষণা করা হবে। তিনি জানান, উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনের জন্যও এপ্রিলের মধ্যে প্রার্থী তালিকা দেয়া হতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে পাঁচটি দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হলো- ১. আগামী ৬ মাসের মধ্যে সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। ২. উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রশাসক নিয়োগ করা যাবে না। ৩. প্রশাসকের পদে বসে কেউ স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে না। ৪. লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। ৫. দলীয় মার্কা ও মনোনয়ন ছাড়া সংস্কারকৃত অধ্যাদেশ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। এই পাঁচ দাবির বাইরে আখতার হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীদের নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত নয়। তার এই বক্তব্য ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় নির্বাচনে সীমিত সাফল্যের পর দলটি এখন স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের শক্তি বাড়াতে চাইছে। একই সাথে নতুন ও তরুণ নেতাদের সামনে আনার চেষ্টা ভবিষ্যতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, এনসিপির এই প্রার্থী ঘোষণা তাদের জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তার মতে, জাতীয় নির্বাচনে বড় সাফল্য না পাওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি নিজেদের সংগঠন শক্ত করতে চাইছে। স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় না হলে কোনো দলই টিকে থাকতে পারে না। এনসিপি সেই জায়গাটিই ধরতে চাচ্ছে।” তিনি বলেন, তবে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কবে হবে এবং তা কতটা সুষ্ঠু হবে। এনসিপি দ্রুত নির্বাচন চাইলেও সরকার এখনো নির্দিষ্ট রোডম্যাপ জানায়নি। ইতোমধ্যে তারা দলীয় প্রশাসক বিভিন্ন জায়গা নিয়োগ দিয়েছেন। নিরেপক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। যদি নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য আনতে পারে।

পাঁচ সিটি করপোরেশনে প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে এনসিপি স্পষ্ট করেছে যে তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি শুধু প্রার্থী ঘোষণা নয়, বরং ভবিষ্যতের রাজনীতিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরির একটি চেষ্টা। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হয় এবং জনগণ কতটা অংশ নিতে পারে।