সঙ্গীত আমাদেরকে নিজের কাছাকাছি আনে : আমাল গুয়ারমাজি
Printed Edition
সাকিবুল হাসান
প্যারিসভিত্তিক প্রখ্যাত তিউনিসীয় সঙ্গীতশিল্পী, সঙ্গীততত্ত্ববিদ এবং কন্ডাক্টর আমাল গুয়ারমাজি বিশ্বাস করেন যে, সঙ্গীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের আত্মার এক গভীর আশ্রয়স্থল এবং আত্মঅন্বেষণের শক্তিশালী হাতিয়ার। সঙ্গীত মানুষকে নিজের কাছাকাছি আনে। দীর্ঘ বছর ধরে নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘মাজিকা অর্কেস্ট্রা’র মাধ্যমে তিনি পশ্চিমা দর্শকদের কাছে আরবি সঙ্গীতের এক ধ্রুপদী ও আধুনিক মেলবন্ধন উপস্থাপন করে চলেছেন। বিশ্বখ্যাত লেখকদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, যেখানে শব্দ ব্যর্থ হয় সেখানে সঙ্গীত কথা বলে এবং যা মুখে বলা অসম্ভব অথচ যে বিষয়ে নীরব থাকাও দায়, সঙ্গীত ঠিক সেই না বলা কথাগুলোই প্রকাশ করে। সঙ্কটের সময়ে সঙ্গীতের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে তিনি জানান, এটি কোনো পলায়নবাদ নয়, বরং জীবনের গভীর মূল্যবোধের কাছে ফিরে আসা এবং অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের একটি উপায়। মঞ্চে পরিচালনার সময় তিনি লক্ষ্য করেছেন কিভাবে সুরের মূর্ছনায় পুরো হলের দর্শক একই ছন্দে শ্বাস নেয় এবং সুরের ঐকতান মানুষের মনের অস্থিরতাকে নতুন করে বিন্যস্ত করে দেয়। তার মতে, সঙ্গীতের ছন্দ শরীরকে, হারমনি মনকে এবং মেলোডি মানুষের স্মৃতি ও আবেগকে স্পর্শ করে এটি একটি সামষ্টিক অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। মানসিক চাপ ও উদ্বেগের সময়ে সঙ্গীতকে নিছক নেপথ্য শব্দ বা ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ হিসেবে না দেখে একে একটি দৈনিক প্রার্থনার মতো গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনার পরামর্শ দেন তিনি, যা মানুষকে তার নিজের সত্তার আরো কাছাকাছি পৌঁছে দেয়। সঙ্গীতশিল্পী থেকে কন্ডাক্টর হয়ে ওঠার পথটি তার জন্য ছিল একটি ক্রমবিকাশমান সচেতনতা, যেখানে তিনি কেবল নিজের বাদ্যযন্ত্রের অংশটুকু না শুনে পুরো সুরের সৃষ্টিকে একটি সামগ্রিক দর্শনে রূপান্তর করতে শিখেছেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে একজন আরব নারী হিসেবে অর্কেস্ট্রা পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি এক বিশাল দায়িত্ববোধ অনুভব করেন; তিনি চান তার প্রাচীন সংস্কৃতির কণ্ঠস্বর যেন বিশ্বজুড়ে সেই সম্মান পায় যার সেটি যোগ্য। যদিও একজন আরব নারী কন্ডাক্টর হিসেবে শুরুতে তাকে অনেক সংশয়ী দৃষ্টির সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং নিজেকে নেতা ও নারী উভয় পরিচয়েই দু’বার প্রমাণ করতে হয়েছে, তবুও তিনি দমে না গিয়ে মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই সংশয়কে শ্রদ্ধায় রূপান্তর করেছেন। তিনি মনে করেন, নারীর উপস্থিতি নেতৃত্বের মূল সত্তাকে পরিবর্তন করে না, বরং একে এক ভিন্ন সংবেদনশীলতায় সমৃদ্ধ করে। সবশেষে আরব বিশ্বের নারীদের প্রতি তার জোরালো বার্তা হলো, অন্যের দেয়া সুযোগের অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজেদের কণ্ঠস্বরের ওপর আস্থা রাখা এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। আমাল গুয়ারমাজির এই জীবনদর্শন ও সঙ্গীত সাধনা প্রমাণ করে যে, ঐতিহ্যকে সমকালীন ভাষায় প্রকাশ করার মাধ্যমেই বিশ্বমঞ্চে নিজের শিকড় ও পরিচয়কে অর্থবহ করে তোলা সম্ভব।