যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রস্তুতির নির্দেশ নেতানিয়াহুর
Printed Edition
- গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নেতানিয়াহু
- শিফা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সমাহিত ৬১ ফিলিস্তিনির লাশ উদ্ধার
গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রতিনিধি দলকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শেষে কাতার থেকে ফিরে আসা একটি প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠকে এ নির্দেশ দেন তিনি।
টাইমস অব ইসরাইল ও আলজাজিরার খবরে বলা হয়, ওই বৈঠকে ইসরাইলি মন্ত্রী এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় নেতানিয়াহু ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফের প্রস্তাবের অধীনে আলোচনার প্রস্তুতির নির্দেশ দেন, যার মধ্যে ১১ জন ইসরাইলি বন্দীর তাৎক্ষণিক মুক্তি এবং মৃত বন্দীদের অর্ধেকের দেহাবশেষ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইসরাইলি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম কেএএন জানিয়েছে যে, উইটকফ ১০ জন বন্দীর মুক্তির বিনিময়ে যুদ্ধবিরতি ৬০ দিনের জন্য বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এ দিকে শুক্রবার হামাস যুদ্ধবিরতি বাড়ানো এবং আরো ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বন্দীদের মুক্তি দেয়ার বিনিময়ে শেষ জীবিত ইসরাইলি-মার্কিন বন্দী এডান আলেকজান্ডারকে মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া ইসরাইলি-মার্কিন দ্বৈত নাগরিকত্বধারী আরো চারজন- ইতাই চেন, ওমর নিউট্রা, গাদি হাগাই এবং জুডি ওয়েইনস্টাইনের লাশ ফেরত দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই হামাসের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নেতানিয়াহু
আল জাজিরা জানায়, গাজা উপত্যকা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার, আগ্রাসন বন্ধ করা এবং পুনর্গঠন শুরু করার প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে যাওয়া নেতানিয়াহুর লক্ষ্য। তিনি একটি নতুন পথ তৈরির চেষ্টা করছেন, যেখানে বন্দীদের বিনিময়ে ধাপে ধাপে সাহায্য প্রদান করা হবে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হামাস ও ইসরাইলি বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাস্তবায়ন স্থবির হয়ে পড়েছে। অবশ্য তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলি প্রধান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কৌশলে এড়িয়ে চলা এবং প্রতিশ্রুতিহীনতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করতে তার অনীহা স্পষ্ট। তিনি প্রথম পর্যায়ের সময়সীমা বাড়ানো এবং গাজা উপত্যকায় সাহায্য ও ওষুধ সরবরাহের শর্তে বন্দীদের মুক্তির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নেতানিয়াহু যে সম্প্রসারণমূলক ধারণার ভিত্তিতে এগোচ্ছেন, তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি তাকে মূল চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য করে না। বিশেষ করে গাজা উপত্যকা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার, আগ্রাসন বন্ধ করা এবং পুনর্গঠন শুরু করার প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে যাওয়া তার লক্ষ্য। তিনি একটি নতুন পথ তৈরির চেষ্টা করছেন, যেখানে বন্দীদের বিনিময়ে ধাপে ধাপে সাহায্য প্রদান করা হবে- যতক্ষণ না হামাসের শক্তি ও কূটনৈতিক সমর্থন সরিয়ে নেয়া হয়।
নেতানিয়াহুর জন্য বেশ কয়েকটি কারণে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। যেমন যুদ্ধ বন্ধ ও গাজা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত তার চরমপন্থী জোটকে দুর্বল করতে পারে, যা আগাম সংসদীয় নির্বাচনের পথ খুলে দেবে। মতামত জরিপে দেখা যাচ্ছে, তিনি সেই নির্বাচনে পরাজিত হবেন। ফলে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হতে পারে। যুদ্ধ-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিশনের আওতায় নেতানিয়াহুকে ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও গাজায় যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হতে পারে। এর ফলে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরো হুমকির মুখে পড়তে পারে। চরম ডানপন্থী নেতারা এই চুক্তিকে ইসরাইলের জন্য ঐতিহাসিক পরাজয় হিসেবে দেখছেন। কারণ এটি গাজার যুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক ব্যর্থতাকে প্রকাশ করেছে এবং তার কৌশলগত শক্তিকে দুর্বল করেছে। মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য ও ইসরাইলের চরম ডানপন্থী সরকারের কৌশল এক নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে গাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ হোক। কারণ এই যুদ্ধের ধারাবাহিকতা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। এ ছাড়া বন্দীদের মুক্তি করা। বিশেষ করে মার্কিন নাগরিকদের, যা মার্কিন প্রশাসনের একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হবে।
এসব কারণে মার্কিন বন্দীবিষয়ক দূত অ্যাডাম বোহলার সরাসরি হামাসের সাথে যোগাযোগ করেছেন এবং ইসরাইলি মন্ত্রী রন ডার্মারের আপত্তির জবাবে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আমরা ইসরাইলের এজেন্ট নই।’
তবে এই মতপার্থক্য এখনো এমন স্তরে পৌঁছায়নি যেখানে ওয়াশিংটন নেতানিয়াহুকে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে বাধ্য করবে। বরং তিনি ওয়াশিংটনে তার সমর্থকদের একত্রিত করে ট্রাম্প প্রশাসনকে হামাসের সাথে সরাসরি সংলাপ বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছেন।
গাজায় হামাস এক কঠিন মানবিক সঙ্কটের মুখোমুখি। অবরোধ প্রত্যাহার ও জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে তারা আলোচনার কৌশল নির্ধারণ করছে। তাদের কৌশল হলো, বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা, দখলদার বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তা প্রবেশ, চুক্তির মৌলিক শর্তগুলো পূরণ না হলে তারা কোনো আপস করবে না। এই প্রেক্ষাপটে কিছু নতুন ধারণাও উঠে এসেছে, যেমন বন্দীদের ধাপে ধাপে মুক্তি অথবা চুক্তির শর্ত সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নের পর একসাথে বন্দীদের মুক্তি।
নেতানিয়াহু চুক্তির বাস্তবায়ন এড়িয়ে চলছেন এবং যুদ্ধ বন্ধের জন্য বাধ্যতামূলক কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন না, বিশেষ করে মার্চের শেষ পর্যন্ত। এর কারণ হলো, তার সরকার টিকিয়ে রাখা ও বাজেট আইন পাস করা, যা ব্যর্থ হলে আগাম নির্বাচন অনিবার্য হবে। এটি অর্থমন্ত্রী স্মোট্রিচের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ, যিনি আবার সংসদে ফিরে আসতে ব্যর্থ হতে পারেন। নেতানিয়াহুর সব রাজনৈতিক কৌশল তার ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ ও চরমপন্থী জোটের অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল। তবে ইসরাইলি জনমত তার অবস্থান সমর্থন করছে না। বরং যুদ্ধের অবসান ও বন্দীদের মুক্তি চায়।
কাতারি ও মিসরীয় মধ্যস্থতাকারীরা চুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহী। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন এখনো নেতানিয়াহুকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেনি। তবে ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী অবস্থানই এই দুষ্টচক্র ভাঙতে পারে। প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প প্রশাসন কি তা করবে, নাকি নেতানিয়াহু নতুন মার্কিন প্রশাসনকে তার রাজনৈতিক জটিলতায় জড়াতে সফল হবেন?
শিফা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সমাহিত ৬১ ফিলিস্তিনির লাশ উদ্ধার
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডের শিফা হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে ৬১ ফিলিস্তিনির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ভূখণ্ডটিতে ইসরাইলি আগ্রাসনের সময় তাদের ওই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়েছিল। গত কয়েক দিনে ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স দলগুলোর প্রচেষ্টায় এসব লাশ উদ্ধার করা হয়। গতকাল রোববার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা আনাদোলু।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যথাযথভাবে সমাহিত করার জন্য এসব দেহাবশেষ উদ্ধার করা হচ্ছে এবং ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স দলগুলো গত ১৩ মার্চ থেকে কবর থেকে এসব লাশ উত্তোলন প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। আনাদোলু বরছে, প্রথম দিনে ফিলিস্তিনের সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা ১০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিসহ ৪৮টি লাশ উদ্ধার করে। দ্বিতীয় দিনে, তারা আরো ১৩টি লাশ উদ্ধার করে, যার মধ্যে তিনটি এখনো অজ্ঞাত। পরিচয় শনাক্ত হওয়া লাশগুলো তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, অন্যদের ফরেনসিক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, যুদ্ধের সময় হাসপাতালের উঠোনে প্রায় ১৬০টি লাশ সমাহিত করা হয়েছিল। আর তাই লাশ উদ্ধার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরো কয়েক দিন সময় লেগে যেতে পারে। বার্তাসংস্থাটি বলছে, এক সময় গাজার বৃহত্তম চিকিৎসাকেন্দ্র শিফা হাসপাতাল যুদ্ধের আগে বার্ষিক চার লাখ ৬০ হাজার মানুষকে সেবা প্রদান করত। জরুরি সেবার পাশাপাশি এখানে অস্ত্রোপচার, ডায়ালাইসিস চিকিৎসা এবং মাতৃস্বাস্থ্য পরিষেবাও প্রদান করত হাসপাতালটি।
তবে গাজায় বর্বর আগ্রাসনের সময় ইসরাইলি বাহিনী বারবার শিফা হাসপাতালে হামলা চালায় এবং হাসপাতালটি ধ্বংস করে দেয়। ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর এখানে প্রথম বড় অভিযান চালায় ইসরাইল। সেই অভিযান ১০ দিন স্থায়ী ছিল। এরপর ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ দ্বিতীয় দফায় হাসপাতালটিতে আক্রমণ চালায় ইসরাইল, যা ১ এপ্রিল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এ সময় ইসরাইলি সেনারা হাসপাতালের কিছু অংশ ভেঙে ফেলে, ভবন পুড়িয়ে দেয় এবং কেন্দ্রের ভেতরে এবং আশপাশে হত্যাকাণ্ড চালায়, যার ফলে এটি সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর হয়ে পড়ে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বারশ চলতি বছরের জানুয়ারিতে আনাদোলুকে বলেছিলেন, ইসরাইলের গণহত্যামূলক এই যুদ্ধের সময় হাসপাতালের ৯৫ শতাংশেরও বেশি ভবন এবং সরঞ্জাম ধ্বংস হয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং বন্দিবিনিময় চুক্তি কার্যকর হয়েছে, যার ফলে ইসরাইলের নৃশংস আক্রমণ বন্ধ হয়েছে। তবে দীর্ঘ ১৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা আগ্রাসনে ৪৮ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। বর্বর এই আগ্রাসনে গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।