গাজায় হামলার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যু

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition

ইসরাইলি হামলা বন্ধে মিসরের নতুন প্রস্তাব

  • হাসপাতালে হামলায় হামাস নেতা নিহত
  • হত্যা বন্ধের আহ্বান ইইউর
  • ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নে পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ভূখণ্ড গাজা উপত্যকায় বর্বর ইসরাইলি বাহিনীর অবিরাম বোমাবর্ষণ অব্যাহত। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুসারে শেষ ২৪ ঘণ্টার পুরো উপত্যকা জুড়ে বিমান ও স্থল হামলায় কমপক্ষে ৬১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার নাসের হাসপাতালে ইসরাইলি বাহিনীর বোমা হামলার কয়েক ঘণ্টা পর এই নতুন আক্রমণ শুরু হয়, যেখানে হামাস নেতা ইসমাইল বারহুম-সহ কমপক্ষে দুইজন নিহত হন।

গত রোববার সন্ধ্যায় ওই হাসপাতালে হামলা চালায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। হামাসের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইসরাইলি হামলার শিকার হয়েছেন বারহুম। হামলায় তার সহকারীও নিহত হয়েছেন। অন্য দিকে রোববার ইসরাইলি বাহিনী গাজার দক্ষিণতম শহর রাফায় একটি জেলা ঘিরে ফেলার পর হাজার হাজার ফিলিস্তিনি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।

ইসরাইল তেল আস-সুলতান এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে, উপকূল বরাবর বিস্তৃত তাঁবুশিবিরের আল-মুওয়াসির দিকে যাওয়ার জন্য একটি একক পথে হেঁটে যেতে বলা হয়েছে ফিলিস্তিনিদের। হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে গেলেও ওই এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, অনেকেই ইসরাইলি সেনাদের ঘেরাওয়ে পড়েছেন। রাফা পৌরসভা জানিয়েছে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক এখনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।

আলজাজিরা আরবির সংবাদদাতা জানিয়েছেন, গাজার মধ্যাঞ্চলের নুসাইরাত শিবিরের একটি স্কুলে বাস্তুচ্যুতদের জন্য নির্মিত একটি তাঁবু লক্ষ্য করে ইসরাইলি বিমান হামলা চালালে এক শিশুসহ তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হতাহতদের আল-আওদা হাসপাতাল নেয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা স্কুলটিতে হামলায় আরো ১৮ জন আহত হয়েছে।

পৃথকভাবে, দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের পূর্বে মান এলাকায় ইসরাইলি হামলায় এক শিশু নিহত এবং আরো অনেকে আহত হয়েছে। এ ছাড়া গাজা উপত্যকার উত্তরে গাজা শহরের পূর্বে তুফাহ পাড়ায় আল-কারামা স্কুলের কাছে গোলাগুলিতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। এ দিকে গাজা উপত্যকার দক্ষিণ অংশে অবস্থিত আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির সদর দফতরে রাফা শহর থেকে ইসরাইলি কামান বোমা হামলা করা হয়েছে।

মৃতের সংখ্যা বাড়ছে : গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজায় মৃতের সংখ্যা ৫০ হাজার ৮২ জনে পৌঁছেছে, আহত হয়েছে আরো এক লাখ ১৩ হাজার ৪০৮ জন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শেষ ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৬১ জন নিহত হয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গত দিনে ১৩৪ জন আহত ব্যক্তিকে গাজার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং রাস্তায় বেশ কিছু ভুক্তভোগী আটকে আছে, অ্যাম্বুলেন্স এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষাকর্মীরা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।’

মিসরের নতুন প্রস্তাব : মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ইসরাইল-হামাস যুদ্ধবিরতি পুনরায় কার্যকর করার জন্য মিসর একটি নতুন প্রস্তাব পেশ করেছে। গাজা উপত্যকায় মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর অনুমতি এবং এক সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি দেয়ার বিনিময়ে হামাস পাঁচজন জীবিত বন্দীকে মুক্তি দেবে, যার মধ্যে একজন আমেরিকান ইসরাইলিও রয়েছেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মিরীয় কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ইসরাইল শত শত ফিলিস্তিনি বন্দীকেও মুক্তি দেবে। হামাসের একজন অজ্ঞাত কর্মকর্তা এপিকে জানিয়েছেন যে, ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী দলটি এই প্রস্তাবের বিষয়ে ‘ইতিবাচক সাড়া’ দিয়েছে, তবে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।

হাসপাতালে হামলা : অন্য দিকে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দাবি, ‘বিস্তৃত গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের পর’ তারা হাসপাতালের ভেতরে অবস্থানরত এক শীর্ষ হামাস সদস্যকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তারা আরো জানায়, ‘নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে ক্ষতি সীমিত রাখা যায়।’ তবে হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় চিকিৎসাকর্মীসহ অন্য অনেকে আহত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরো জানিয়েছে, হামলার পর হাসপাতালের যে বিভাগটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা খালি করা হয়েছে। বিবিসির যাচাই করা ফুটেজে দেখা গেছে, হামলার পর লোকজন আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। ইসরাইল বারবার অভিযোগ করে আসছে, অস্ত্র ও কমান্ড সেন্টার আড়াল করার জন্য হাসপাতাল ব্যবহার করছে হামাস। তবে ইসরাইলের এ অভিযোগ হামাস অস্বীকার করে আসছে।

বিবিসিকে হামাসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রোববার খান ইউনুসে আলাদা এক ইসরাইলি বিমান হামলায় আরেক হামাস নেতা সালাহ আল-বারদাউইল নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় খান ইউনুসের নাসের হাসপাতালে ইসরাইলি বোমা হামলার নিন্দা জানিয়ে একে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

হত্যা বন্ধের আহ্বান ইইউর : এ দিকে গাজা ভূখণ্ডে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা ক্যালাস। গাজায় যুদ্ধবিরতি পুনরায় কার্যকরে চাপ দেয়ার জন্য ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে মিসরে যাত্রাবিরতির সময় এই মন্তব্য করেন তিনি। গাজায় যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘর্ষ বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই শীর্ষ কূটনীতিক। এএফপির খবর অনুসারে, কায়রোতে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদুল আতির সাথে এক সংবাদ সম্মেলনে ইইউয়ের কাজা ক্যালাস বলেন, ‘আমরা ইসরাইলের পুনরায় হামলা শুরুর তীব্র বিরোধিতা করি, যার ফলে গাজায় ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটেছে। এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। নতুন যুদ্ধে উভয় পক্ষই হেরে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে, এটা খুবই স্পষ্ট যে, হামাসকে অবশ্যই সব বন্দীকে মুক্তি দিতে হবে ও ইসরাইলকে অবশ্যই গাজায় মানবিক সহায়তা সম্পূর্ণরূপে পুনঃস্থাপন করতে হবে এবং আলোচনা পুনরায় শুরু করতে হবে।’

কায়রোতে যাত্রাবিরতির পর কাজা ক্যালাস ইসরাইলে পৌঁছে গেছেন বলে ক্যালাসের টিম পরে নিশ্চিত করেছে। তার কার্যালয় জানিয়েছে, গতকাল সোমবার সেখানে এবং ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলোয় আলোচনার সময় তিনি অবিলম্বে ‘যুদ্ধবিরতি-বন্দিমুক্তি চুক্তির সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে ফেরত আসার আহ্বান জানাবেন’ বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া গাজায় এবং সমগ্র অঞ্চলে মানবিক সহায়তার নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার এবং টেকসই বিতরণের গুরুত্বও তুলে ধরবেন ক্যালাস।

ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নে পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার : বার্তা সংস্থা আনাদোলুর খবর অনুসারে, ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ড থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নে পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরাইল। এমনই অভিযোগ করেছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। এ ছাড়া গাজায় সব মৌলিক পরিষেবা বন্ধ করে ইসরাইল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কনভেনশন লঙ্ঘন করছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। আনাদোলু বলছে, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস রোববার ইসরাইলকে গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার জন্য ‘যুদ্ধের অস্ত্র’ হিসেবে পানিকে ব্যবহার করার অভিযোগ করেছেন। বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে দেয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট আব্বাস বলেন, ‘দখলদার (ইসরাইল) আমাদের জনগণের দুর্ভোগ, বাস্তুচ্যুতি এবং প্রকৃতপক্ষে ধীরে ধীরে মৃত্যু আরো বৃদ্ধির জন্য আরেকটি অস্ত্র ব্যবহার করেছে। সব মৌলিক পরিষেবা বন্ধ করে এই কাজ করছে তারা। বিশেষ করে পানি বন্ধ করে এবং মানবিক সাহায্যের প্রবেশ বন্ধ করে ইসরাইল এই কাজ করছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক রেজুলিউশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।