আওয়ামী আমলে অর্থের বিনিময়ে চাকরি না পেয়ে ভিন্ন কৌশল
মাউশিতে পরিকল্পিত মব তৈরি করে দৈনন্দিন কাজে বাধা
Printed Edition
- পরিচয়পত্র ছাড়া দর্শনার্থী প্রবেশে কড়াকড়ি
- ভেতর থেকে উসকানি দিচ্ছেন কিছু কর্মকর্তা
- ডিজির কক্ষের দরজায় লাথি মারার ধৃষ্টতা
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় পরিচয় আর মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চাকরি নিশ্চিত করতে পারেনি ছয় শতাধিক চাকরি প্রত্যাশী। ফলে টাকার ক্ষোভ আর ক্ষমতা হারানোর যন্ত্রণায় এখন প্রতিদিন মাউশিতে এসে পরিকল্পিত মব তৈরি করছেন চাকরিপ্রত্যাশী ওই ৬১০ জন প্রার্থী। তবে তাদের সাথে মাউশিতে এসে নিয়মিত বিশৃঙ্খলা তৈরিতে ইন্ধন যোগাচ্ছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বর্ণচোরা কিছু কর্মী। যদিও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাত্র এক সপ্তাহ পরেই আওয়ামী মনোনীত এই প্রার্থীদের নিয়োগপত্র দেয়ার সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পলাতক আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পাহাড়সম অনিয়ম আর জুলুম নির্যাতন উপেক্ষা করে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে দেশকে লাখো ছাত্র-জনতা মুক্ত করার পর তাদের নিয়োগ আটকে যায়। এখন আওয়ামী লীগের সুপারিশের সেই চিহ্নিত প্রার্থীরাই নিয়মিত মাউশিতে এসে কর্মকর্তাদের জিম্মি করে দাবি আদায়ের নাম করে মব তৈরি করছে। সর্বশেষ গতকাল বুধবার এবং এর আগে গত মঙ্গলবারও ‘চাকরি প্রার্থীরা’ কৌশলে মাউশি চত্বরে প্রবেশ করে মহাপরিচালকের সাথে অশোভন ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে। তারা ডিজির গাড়িও পথে আটক করে বিক্ষোভ করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই এই প্রতিবেদককে জানান, এর আগে গত ৩ জুন মাউশির তৃতীয় তলায় ডিজির রুমের সামনে অবস্থান নিয়ে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে কথিত এই চাকরি প্রার্থীরা। একপর্যায়ে তারা ডিজির কক্ষের দরজায় লাথিও মেরেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি প্রতিষ্ঠান প্রধানের কক্ষে এভাবে লাথি মারার সংস্কৃতি কাদের আচরণের মিলে যায় সেই অভিযোগও করেছেন অনেকে। আবার এই প্রার্থীদের অনেকে মাউশির দক্ষ ও সৎ হিসেবে পরিচিতি কর্মকর্তাদের অশোভন ভাষায় ফ্যাসিস্ট এবং সুবিধাভোগী বলেও গালাগালি করেছে। তাদের ব্যানার এবং ফেস্টুনেও বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফ্যাসিস্টদের দোসর বলে আখ্যায়িত করে অপমাণ করেছে। চাকরিপ্রত্যাশী এই প্রার্থীদের মাউশির ভেতর থেকেই কোনো কোনো কর্মকর্তা উসকানি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাউশির অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা এসব কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করতে দাবিও উঠেছে।
এ দিকে গতকাল বুধবার সকাল থেকে মাউশিতে দর্শনার্থীদের প্রবেশে কড়াকড়ি করেছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার রাতেই জরুরি এক নোটিশে মাউশির ভবনে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। ঐ নোটিশে বলা হয় এখন থেকে (গতকাল বুধবার) মাউশি ও এর অধীন সব প্রকল্প ও উইংয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্যতামূলকভাবে পরিচয়পত্র দেখিয়ে কার্যালয়ে প্রবেশ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাউশির সহকারী পরিচালক (সাধারণ প্রশাসন) মো: খালিদ হোসেন স্বাক্ষরিক নোটিশ এ কথা জানানো হয়েছে। সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একাধিক দল ও গ্রুপ নানা অজুহাত এবং দাবিতে মাউশিতে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। বহিরাগতরা মিছিল, অনশন, মানববন্ধন ও ভাঙচুর চালিয়েছে। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে এ নির্দেশনা দেয়া হয়।
অপর দিকে মাউশির অধীনে চাকরিপ্রত্যাশী এসব প্রার্থীকে অভিযোগের বিষয়ে মাউশির কর্মকর্তারা নয়া দিগন্তকে জানান, আওয়ামী সরকারের আমলে দলীয় পরিচয়ের বাইরেও তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতাদের ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়ার জন্য সমঝোতা করেছিল সেই সব প্রার্থীরাই এখন নিজেদের বঞ্চিত কিংবা জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দিয়ে মাউশিতে এসে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করছে। সূত্র আরো জানায়, চাকরি প্রার্থীদের দাবি দাওয়ার এই সুযোগে কিছু বহিরাগত ছাত্র (অনেকের ধারণা তারা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ) এসে তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে। এই অপরিচিত কিছু ব্যক্তির আচরণ বা চলাফেরাও সন্দেহজনক বলে জানা গেছে।
চাকরি প্রার্থীদের মাউশিতে এসে এভাবে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে বড় কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করছেন মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ড. আজাদ খান। তিনি এই প্রতিবেককে বলেন, চাকরিপ্রার্থীদের ফল প্রকাশ কিংবা তাদেরকে চাকরি দেয়া না দেয়ার পুরো বিষয়টি মন্ত্রণালয় দেখভাল করছে। কাজেই মাউশিতে এসে আমাদের কর্মকর্তাদের চাপ দেয়া কিংবা উদ্দেশ্যমূলকভাবে মব তৈরি করার কোনো মানেই হয় না। এর আগে আমি নিজে বিষয়টি নিয়ে চাকরি প্রার্থীদের সাথে কথা বলেছি। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে তারা (চাকরি প্রার্থীরা) চাকরির জন্য আবেদন করছেন না। তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন কোনো কিছু থাকতে পারে। কেননা যেখানে তাদের সমস্যাটি নিয়ে সরাসরি মন্ত্রণালয় ডিল করছে সেখানে মাউশিকে টার্গেট করে এভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার তো কোনো মানেই হয় না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা ভিন্ন কিছু মনে করে সেভাবেই মোকাবেলা করব। কোনো পক্ষকেই মাউশির দৈনন্দিন কাজের কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে দেয়া যাবে না। তিনি চাকরিপ্রার্থীদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, কারো কোনো অভিযোগ থাকলে তা সমাধানের পথও খোলা আছে। মাউশির কাজের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে দাবি আদায়ের নামে মব তৈরি করে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার সুযোগ কাউকেই দেয়া হবে না। মাউশিতে হাজার হাজার শিক্ষকের নিয়মিত কাজে বাধা দেয়ার এমন দৃষ্টতা মেনে নেয়া হবে না।
মাউশির অন্য একটি সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের শুরুতে (জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কিছু দিন আগে) আওয়ামী লীগের দলীয় পরিচয় আর নেতাদের সুপারিশ নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরে (মাউশি) চাকরি নিয়েছেন তিন হাজার ১৮৩ জন কর্মচারী। মাউশি ও এর অধস্তন দফতর এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২৮টি ক্যাটাগরির বিভিন্ন পদে ২০২৩ সালের ২২ আগস্ট এবং ১৪ নভেম্বর চাকরিতে যোগদান করেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের সুপারিশ কিংবা টাকার বিনিময়ে চাকরি পেয়েছেন তারা। যদিও জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের কারণে তালিকায় থাকা বাকি ৬১০ জনকে নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের দেয়া তালিকার এই ৬১০ জনকে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হলেও বর্তমানে বিষয়টি ঝুলে গেছে।
সূত্র আরো জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্রজনতার বিপ্লবের মাত্র দুই মাস আগে চূড়ান্ত করা হয়েছিল তাদের মনোনীত প্রার্থী বাছাইয়ের একটি গোপন তালিকা। সেই তালিকার ৬১০ জন নিয়োগপত্র এখনো পায়নি। তবে ওই তালিকা বাতিলও করা হয়নি। তৃতীয় শ্রেণীর (গ্রেড-১০) কলেজের বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শক পদে এই ৬১০ জন নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করারও একটি ইঙ্গিত কিছু দিন আগেও পাওয়া গিয়েছিল। এই ধরনের নিয়োগে অর্থের লেনদেন বিষয়ে মাউশিতে একাধিক কর্মকর্তার সাথে আলাপ হলেও কোনো কর্মকর্তাই প্রকাশ্যে কোনো কথা বলতে চাননি। সূত্র জানায়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের অধীন সরকারি কলেজের জন্য দশটি বিষয়ে ৬১০ জন প্রদর্শক ও সমমানের পদে নিয়োগে ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট নামকাওয়াস্তে ৭০ নম্বরের সাজানো এমসিকিউ পরীক্ষা নেয়া হয়। নিয়োগ কমিটির কেউ কেউ পূর্ণ ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নেয়ার পক্ষে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। টাকার বিনিময়ে এবং ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সরকারি কলেজগুলোতে নিয়োগ দিতে যাওয়া এই প্রদর্শকরাই পরবর্তীতে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত হয়ে থাকেন। পদোন্নতি পেয়ে তারা অধ্যাপকও হতে পারবেন। যদিও শিক্ষা ক্যাডারের সৎ কর্মকর্তারা কথিত ওই এমসিকিউ পরীক্ষা বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধীনে লিখিত পরীক্ষা নেয়ার দাবি তুলেছিলেন সেই সময়েই।
আওয়ামী আমলের পাঁচ সদস্যের নিয়োগ কমিটির সভাপতি ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের কলেজ ও প্রশাসন শাখার তৎকালীন পরিচালক বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপক বিতর্কিত নেতা মো: শাহেদুল খবির চৌধুরী। অধিফতরের তৎকালীন সাধারণ প্রশাসন শাখার উপপরিচালক বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস সদস্যসচিব এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন করে কর্মকর্তা এর সদস্য ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তাদের অনিয়ম দুর্নীতির কারণে সবাইকে অন্যত্র বদলি করে দেয়া হয়েছে।
প্রদর্শক পদে ভাইভার ফলাফল প্রকাশের দাবিতে গত মঙ্গলবার থেকে মাউশিতে অমরণ অনশন শুরু করে অবস্থান করছেন প্রদর্শক পদে ফলাফল প্রত্যাশীরা। ফলপ্রত্যাশীরা জানান, প্রদর্শক গবেষণা সহকারীসহ অন্যানা পদের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। ফল প্রকাশ না করা পর্যন্ত আমরণ অনশন চলবে বলেও জানান তারা।