ফুটবলার হতেই ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা

Printed Edition

রফিকুল হায়দার ফরহাদ

ঢাকার পল্টন ময়দান বা আউটার স্টেডিয়াম। সেখানে নিয়মিত অনুশীলন করেন আবদুর রহমান ফুটবল একাডেমির খেলোয়াড়রা। আবদুর রহমানের পরিচয়- তিনি বাফুফের মিডিয়া বিভাগের কর্মচারী। স্টেডিয়াম এলাকায় বড় হওয়া। স্রেফ বয় হিসেবেই পরিচয়। তবে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায় নিজে গড়েছেন ফুটবল একাডেমি। এই একাডেমিতে প্রায়ই এক-দুইজন নারী ফুটবলারকে দেখা যায়। যারা অনুশীলন করেন ছেলেদের সাথে। তবে বেশি দিন স্থায়ী হন না তারা। এবার রহমান ফুটবল একাডেমিতে পাওয়া গেল একসাথে চার নারী ফুটবলারকে। এদের তিনজন এসেছেন সাভারের ধামরাই থেকে। অপরজনের বাড়ি বরিশালে। বড় ফুটবলার হতেই তারা একত্রে ঢাকার সায়েদাবাদে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। সবারই লক্ষ্য বড় ফুটবলার হওয়া। লাল-সবুজ জার্সিতে জাতীয় দলে খেলা।

অল্প বয়সী মেয়ে। ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকবেন। এতে পরিবার থেকে সম্মতি জুটছিল না। আবার বাসা ভাড়া যে নেবেন এ ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালারাও বাড়ি ভাড়া দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত আবদুর রহমানের উদ্যোগেই সায়েদাবাদে সাড়ে চার হাজার টাকা ভাড়ায় বাসা জোগাড় করা। এমন প্রবল প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়েই তারা এখন নিয়মিত অনুশীলন করছেন রহমান ফুটবল একাডেমিতে। এবারের নারী দিবস উপলক্ষে বাফুফে আয়োজিত ফুটবল ফেস্টিভালে তাদের পাওয়া গেল বাফুফের টার্ফে।

ধামরাই থেকে আসা তিনজনের একজন তাসলিমা আক্তার। ইন্টার মিডিয়েটে সেকেন্ডে ইয়ার পড়েন। মা-বাবা কেউই নেই তাসলিমার। তিন বোন আর এক ভাইয়ের মধ্যে মেজো বোন এই তাসলিমা। বড় হয়েছেন নানীর বাড়ি। একে তো মা-বাবা নেই। তার ওপর এলাকার নানান জনের বাজে কথা। স্ট্রাইকিং পজিশনে খেলা তাসলিমা জানান, ‘নানাবাড়িতে বিভিন্নভাবে বাধা আসত। আশপাশের মানুষও বাজে বাজে কথা বলত; কিন্তু আমার মধ্যে জেদ ছিল আমি ফুটবলার হবই। এরপর স্কুল দলের হয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে খেলার পর এখন আর বাধা আসে না। নেতিবাচক কথাও কেউ বলে না।’ জানান, ‘আমার লক্ষ্য এখন জাতীয় দলে খেলা। এর আগে নারী ফুটবল লিগে প্রতিনিধিত্ব করতে চাই।’

তাসলিমার মতোই মা নেই অলি সরকারের। তবে বাবা আছেন। বাবা কাঠমিস্ত্রি। অলির বাবাও প্রথমে রাজি ছিলেন না তার ফুটবলার হওয়ার বিষয়ে। তবে স্কুল পর্যায়ে ভালো খেলার পর বাবার কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত মিলেছে। সিঙ্গাইর ডিগ্রি কলেজের এই ছাত্রীর ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার খরচসহ অন্যান্য খরচ বাবাই বহন করেন। জানান অলি। এই ধামরাই থেকে আসা অপর ফুটবলার হলেন অনিমা রানী। মাছ বিক্রেতা বাবার মেয়ে তিনি। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ছোট তিনি। আন্তঃস্কুল ফুটবল খেলেই তিনি এখন ঢাকায় লিগ খেলার স্বপ্ন দেখছেন। স্কুল ফুটবলে খেলার পাশাপাশি স্থানীয় কোচরা বিভিন্ন স্থানে খেলতে নিয়ে যেতেন বিভিন্ন টুর্নামেন্টে। এ ক্ষেত্রে প্রতারণারও শিকার হয়েছেন। জানান, কোচ আমাদের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতেন; কিন্তু খেলা শেষে টাকা দেয়ার কথা থাকলেও পরে আর সেই টাকা দিতেন না।

অনিমা রানী ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকবেন এটা মানতে চাচ্ছিলেন না তার বাবা। অনিমা বলেন, আমি একটা মেয়ে, ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকব এতে আপত্তি ছিল পরিবার থেকে। বাবা একা একা আমাকে ছাড়তে রাজি হচ্ছিলেন না। তবে আমার জেদের কারণেই শেষ পর্যন্ত সম্মতি দিয়েছেন। এখন ঢাকায় থাকার খরচও দিচ্ছেন।

তবে এই ফুটবলার হতে গিয়েই পরিবারের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে বরিশাল সদরের মেয়ে শ্রাবণী আক্তারের। তাই তার মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এই ফুটবল খেলতে গিয়ে অনেক কিছুই হারিয়েছি। আবার পেয়েছিও অনেক কিছু। ফুটবল খেলার কারণে বাবা-মায়ের আদর হারিয়েছি। দুবাই প্রবাসী ভাই আমার সাথে দু’বছর ধরে সম্পর্কই রাখছে না।

অথচ মাছ বিক্রেতা বাবার দুই ছেলের সাথে একমাত্র মেয়ে তিনিই। মিডফিল্ডার শ্রাবণীর এবারের লিগে খেলার কথা ছিল; কিন্তু ইনজুরি তাকে ক্লাব পেতে দেয়নি।

কোচদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন শ্রাবণীও। জানান, ‘দেখা গেল পুরো দলকে খেলার জন্য পাঁচ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে; কিন্তু কোচ একাই তিন হাজার টাকা নিয়ে চলে গেছেন। বাকি টাকা আমরা খেলোয়াড়দের জন্য।’ পরিবার থেকে বাবা কিছু টাকা দেন। বাকি অর্থ ফুটবল খেলেই জোগাড় করে এখন জীবন চালাচ্ছেন তিনি। আরো তথ্য দেন, ফুটবলার হওয়ার জন্যই আমি ঢাকায় বাসা নিয়ে থাকি। অথচ লেখাপড়া করছি বরিশালে। দশম শ্রেণীর ছাত্রী আমি। তাই শুধু পরীক্ষা দেয়ার জন্যই বরিশালে যাই।