ভি-ডেমের বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে সব আমলেই সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
বংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার ইতিহাস বরাবরই চ্যালেঞ্জপূর্ণ। রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও গণমাধ্যমের ওপর চাপ, নিয়ন্ত্রণ ও হয়রানির প্রবণতা বিভিন্ন সময় ভিন্ন মাত্রায় অব্যাহত থেকেছে। সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্র্যাসির (ভি-ডেম) তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময়জুড়ে সাংবাদিকরা সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে শাস্তি, মামলা, গ্রেফতার ও ভয়ভীতির মুখে পড়েছেন।
ভি-ডেমের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রায় ৫৫ বছরের ইতিহাসে অন্তত ২৭ বছর সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। অর্থাৎ দেশের অর্ধেকেরও বেশি সময় গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। এই সময়গুলোতে রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সমালোচনা করলেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পেশাগত জীবনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে, এমনকি কেউ কেউ পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
বিশেষভাবে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কে সবচেয়ে কঠিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই এক দশকে স্বাধীন সাংবাদিকতা সূচকের ১০টি সবচেয়ে খারাপ স্কোরের মধ্যে ৯টিই স্থান পেয়েছে। ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করলে মামলা, গ্রেফতার ও ভয়ভীতি প্রদর্শন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এই আইনের মাধ্যমে অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত মতামত বা প্রতিবেদনের ওপর কঠোর নজরদারি ও শাস্তির ব্যবস্থা তৈরি হয়।
তবে সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়নের ইতিহাস আরো পুরনো। ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণমাধ্যম প্রায় সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সে সময় বেসরকারি সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়ে মাত্র কয়েকটি রাষ্ট্রীয় মাধ্যম চালু রাখা হয়। ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে ১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসনামলেও গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। সংবাদ প্রকাশে সেন্সরশিপ আরোপ, প্রকাশনার ওপর বিধিনিষেধ এবং সাংবাদিকদের হয়রানি ছিল নিয়মিত ঘটনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারবিরোধী বা সংবেদনশীল প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
অন্য দিকে ১৯৯১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সময়কে তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ধরা হয়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এই সময়ে গণমাধ্যমের বিস্তার ঘটে এবং বেসরকারি সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তবে এই সময়ও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, রাজনৈতিক চাপ ও গণমাধ্যম বন্ধের ঘটনাও ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও তা স্থায়ী হয়েছে বলা যায় না। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু সাংবাদিক চাকরি হারান এবং আইনি জটিলতায় পড়েন। তবে সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতার কারণে সরাসরি হয়রানির মাত্রা কিছুটা কমেছে বলে ভি-ডেমের তথ্য নির্দেশ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার প্রতি প্রশ্ন সহনশীলতার অভাব রয়েছে। ফলে বিরোধী মত দমন করতে যে কৌশল ও আইন ব্যবহৃত হয়, তা অনেক সময় গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়। সরাসরি দমন-পীড়নের পাশাপাশি নজরদারি, মামলা, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণসহ অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমেও সাংবাদিকদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা হয়।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। কেবল সরকার পরিবর্তন নয় বরং টেকসই আইনি সুরক্ষা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া এই পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।