জ্বালানিতে কড়া নজরদারি : ট্যাগ কর্মকর্তার মাঠে নামা, প্রিপেইড মিটারের চার্জেও তদন্ত

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং কৃত্রিম সঙ্কটের অভিযোগ মোকাবেলায় একযোগে কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে একজন করে ‘ট্যাগ কর্মকর্তা’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় এবার তাদের জন্য বিস্তারিত কর্মপরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। রোববার জারি করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। একই সাথে বিদ্যুৎ খাতে প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেলের সরবরাহে অস্থিরতা, পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির অভিযোগ বাড়তে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সরকার মনে করছে, সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপ কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা গেলে অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবে এবং ভোক্তা পর্যায়ে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ট্যাগ কর্মকর্তাদের মূল দায়িত্ব হবে ফিলিং স্টেশনের দৈনন্দিন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা। প্রতিদিনের শুরুতেই স্টেশনে থাকা জ্বালানি মজুদ রেকর্ডভুক্ত করতে হবে। ডিপো থেকে সরবরাহকৃত তেল স্টেশনে পৌঁছলে তা সরাসরি উপস্থিত থেকে পরিমাপ করে গ্রহণ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট চালান ও অর্ডারের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। এতে সরবরাহের পরিমাণে কোনো অসঙ্গতি থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে ধরা সম্ভব হবে।

এ ছাড়া ডিপো-রিড বা ডিপো-স্টকের মাধ্যমে সরবরাহের পরিমাণ নিশ্চিত করা, দৈনিক গ্রহণের হিসাব রেজিস্টারে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হচ্ছে কিনা তা তদারকি করাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। ডিসপেন্সিং মেশিনের দৈনিক মিটার রিডিং পর্যবেক্ষণ করে বিক্রির সাথে সামঞ্জস্য যাচাই করতে হবে। দিনের শেষে সমাপনী মজুদ পর্যালোচনা করে ঘাটতি বা অতিরিক্ততার বিষয় শনাক্ত করতে হবে।

সরকার বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে পরিমাপের সঠিকতার ওপর। তাই নিয়মিতভাবে ডিসপেন্সিং মেশিনের পরিমাপ ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে হবে ট্যাগ কর্মকর্তাদের। একই সাথে অনুমোদিত লে-আউট প্ল্যান অনুযায়ী স্টেশনের মজুদ ক্ষমতা এবং বাস্তব মজুদের মিল রয়েছে কি না তাও যাচাই করতে হবে। কোনো অননুমোদিত ট্যাংক বা স্থাপনা থাকলে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো স্বচ্ছ করতে ডিপো থেকে পাম্প এবং পাম্প থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে দৃশ্যমান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ জন্য তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ডিপো, ট্যাঙ্কার, পাম্প ও খুচরা বিক্রির তথ্য সমন্বিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রতিটি পাম্পে দিনে অন্তত তিনবার সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় স্টকের হালনাগাদ তথ্য নিশ্চিত করতে হবে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলো, ডিপো থেকে জ্বালানি গ্রহণের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিক্রি শুরু করতে হবে। এক ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি শুরু না হলে তা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে সতর্কতা, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এবং প্রয়োজনে সাময়িক স্থগিতাদেশের মতো ব্যবস্থা নেয়া হবে। এতে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি বা মজুদ রেখে বাজারে চাপ সৃষ্টি করার প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া পাম্প খোলা রাখা, স্টক রেজিস্টার হালনাগাদ রাখা, ডিসপ্লে বোর্ডে তথ্য প্রদর্শন, ক্যাশ মেমো প্রদান এবং নির্ধারিত সীমা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না এসব বিষয়ও নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অবৈধভাবে কনটেইনারে জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে কিনা তা-ও নজরদারির আওতায় থাকবে। প্রতিটি পর্যবেক্ষণ জিও-ট্যাগযুক্ত প্রমাণসহ নিয়মিত প্রতিবেদন আকারে জমা দিতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। বিশেষ করে সরবরাহে স্বচ্ছতা বাড়লে বাজারে অস্থিরতা কমবে এবং ভোক্তারা হয়রানি থেকে মুক্তি পাবেন।

অন্য দিকে বিদ্যুৎ খাতেও ভোক্তা অসন্তোষের একটি বড় কারণ প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারবিষয়ক এক গোলটেবিল বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, প্রিপেইড মিটারে মাসিক ‘মিটার চার্জ’ কিভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ কেটে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মিটারের ব্যবহৃত সফটওয়্যার বা প্রোগ্রাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। মিটারের ভেতরের সেটিংস কিভাবে কাজ করে, কোন ভিত্তিতে চার্জ নির্ধারণ হয় এসব বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝার চেষ্টা চলছে। মন্ত্রী আরো উল্লেখ করেন, প্রিপেইড মিটারের কার্যপ্রণালী পুরোপুরি বোঝা গেলে এই অতিরিক্ত চার্জের সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। প্রয়োজনে নীতিগত পরিবর্তন আনা হতে পারে, যাতে গ্রাহকদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ না পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ এই দুই গুরুত্বপূর্ণ খাতে একযোগে নজরদারি জোরদার করা হলে সামগ্রিকভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী হবে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর। ট্যাগ কর্মকর্তাদের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন হবে। সব মিলিয়ে সরকার যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা ইতিবাচক হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিয়মিত মনিটরিং, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর। ভোক্তারা এখন দেখার অপেক্ষায় এই পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা স্বস্তি এনে দিতে পারে।