‘দক্ষ জনশক্তি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়তে উন্নয়ন পরিকল্পনা : ৫

জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকিতে শিক্ষার্থী কাজে আসছে না ল্যাব যন্ত্রপাতি

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

দেশের বিভিন্ন পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। আবার বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে ষাটের দশকে স্থাপিত ল্যাব এবং এগুলোর জন্য কেনা যন্ত্রপাতিও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। কিছু ল্যাব ও যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ানের পদও শূন্য। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে ভালো বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও এগুলোর ভবিষ্যত কোন পর্যায়ে পৌঁছায় তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

সম্প্রতি ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একটি পুরনো ছাত্রাবাসের ছাদ ভেঙে একজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পর দেশের অন্যান্য পুরনো ভবন ও ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকিতে রয়েছেন। তারা দ্রুত এসব পুরনো ভবন সংস্কার কিংবা নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, গত ১৫ জুন ঢাকা পলিটেকনিকের সবচেয়ে পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ছাত্রাবাস ‘লতিফ হল’-এ ছাদ ধসে পড়ার ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রাবাসের চতুর্থ তলার ৪০৮ নম্বর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। ছাদের বড় একটি অংশ কক্ষটির এক শিক্ষার্থীর বিছানার ওপর ভেঙে পড়ে।

এ দিকে পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দক্ষ শিক্ষক কিংবা প্রশিক্ষকের অভাবে শিক্ষার্থীরা কাক্সিক্ষত পর্যায়ের দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছে না। কেননা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা তখনই দক্ষ হবে যখন দক্ষ প্রশিক্ষক পাওয়া যাবে। যদিও শিক্ষকদের দক্ষ প্রশিক্ষক হওয়ার জন্য টিটিটিসির তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। এ ছাড়া উচ্চতর ডিগ্রি যেটি দেয়া হয় সেটিও অনেকাংশে অগ্রহণযোগ্য।

সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে ১৮ ক্যাডার পলিটেকনিক-সহ সর্বোমোট ৫০টি পলিটেকনিক রয়েছে। তবে এগুলোসহ বেশির ভাগ পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানে যেসব ল্যাব ও ওয়ার্কশপের যন্ত্রপাতি রয়েছে এগুলো একেবারেই অকেজো ও বেশির ভাগই ’৬০-এর দশকের। এর মধ্যে ১০ ভাগ ঠিক থাকলেও দক্ষ ক্রাফট ইন্সট্রাক্টরের অভাবে সেগুলোও কর্মক্ষম রাখা যাচ্ছে না। আবার দীর্ঘ দিন শিক্ষকসঙ্কট থাকায় অতিথি বক্তা/শিক্ষক দিয়ে পলিটেকনিকগুলোতে ক্লাস নেয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের থেকে তেমন ফিডব্যাক পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে পলিটেকনিক ও টিএসসিতে তিন হাজারের অধিক শিক্ষক নিয়োগ হলেও পলিটেকনিকগুলোতে এখনো ৬০ ভাগ শিক্ষকসঙ্কট রয়েছে। যদিও দীর্ঘ দিন ধরে স্থবির হয়ে পরা পলিটেকনিকগুলোকে সম্প্রতি দক্ষ শিক্ষক পদায়নের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষক এই প্রতিবেদককে জানান, প্রকৃতপক্ষে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয়, যা একটি বিশেষায়িত কোর্স। এখানে শিক্ষক-ছাত্রের অনুপাত থাকার কথা ১:১২। কিন্তু বাস্তবে আছে ১:৫০। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই অনুপাত এর চেয়েও বেশি। আবার প্রতিটি বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক ল্যাব কিংবা ওয়ার্কশপ নেই। যেসব ল্যাব বা ওয়ার্কশপ নতুনভাবে স্থাপন করা হচ্ছে সেগুলোও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। উদাহরণ দিয়ে এই শিক্ষক বলেন, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিটিউট ডিজাইন করা হয়েছিল পাওয়ার, সিভিল ও ইলেকট্রনিকসের ১২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য। অবকাঠামো সেই আগের মতো থাকলেও বর্তমানে ইনটেক হচ্ছে আড়াই হাজারের অধিক শিক্ষার্থী।

সূত্র জানায়, অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন বিল্ডিং ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নিলেও আসন অনুযায়ী ইনটেক কমানো হচ্ছে না। যার কারণে কোয়ালিটি এডুকেশন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিটি পলিটেকনিকে একই অবস্থা। এখনো পলিটেকনিক/কারিগরি শিক্ষাকে অবহেলার চোখে দেখে সাধারণ মানুষ। এই বিষয়ে সরকার এখনো মেইন স্ট্রিম এডুকেশনে কারিগরি শিক্ষাকে নিয়ে আসতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স ইন্ডাস্ট্রির সাথে কানেক্টেড থাকার কথা থাকলেও তেমন কোনো সক্ষমতা কারিগরি শিক্ষা বোর্ড দেখাতে পারছে না। পলিটেকনিক থেকে বের হয়ে শতভাগ চাকরির নিশ্চয়তা থাকলেও দক্ষতা ও সমাজের নিচু মনমানসিকতায় অনেকেই ঝরে পড়ছে। প্লেসমেন্ট সেলগুলো অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে।

পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন নতুন প্রকল্প নেয়ার বিষয়ে ইতোমধ্যে একনেকে পাস হয়েছে জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব রেহানা ইয়াসমিন নয়া দিগন্তকে জানান, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের আওতায় বর্তমানে চলমান ১৯টি প্রকল্পের মধ্যে কারিগরি সেক্টরের জন্যই ১২টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের ১১টি প্রকল্প এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় রয়েছে আরো একটি প্রকল্প।

তিনি আরো জানান, দেশের ১৫টি বিদ্যমান সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বৃদ্ধি শীর্ষক একটি প্রকল্প এক হাজার ৫১৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য গত মাসে (২৪ মে ২০২৫ ইং) একনেকে অনুমোদন হয়েছে। একই সাথে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের আওতাধীন আটটি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ শীর্ষক একটি প্রকল্প ৪৫১ কোটি সাত লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য গত মাসের ওই একই তারিখে একনেকে অনুমোদন হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা জানান, পিএসসির মাধ্যমে ক্যাডার এবং নন ক্যাডার এই উভয় ভাগেই শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই পলিটেকনিকে শিক্ষক সঙ্কটও আর থাকবে না।