সাইফ পাওয়ারের বিদায় পণ্য ওঠানামায় গতি বেড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে

শাহ আলম নূর
Printed Edition

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সাইফ পাওয়ার গ্রুপের পরিচালনাধীন জেটিগুলো সরিয়ে নিয়ে দায়িত্ব নেয়ার পর নৌবাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে বন্দরের অপারেশন কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে। সময়মতো পণ্য ওঠানামা, কনটেইনার খালাস ও সরবরাহ চেইনের সমন্বয় আগের চেয়ে অনেক বেশি সুচারুভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে দেশের আমদানি-রফতানিকারকরা যেমন স্বস্তি পাচ্ছেন, তেমনি বাড়ছে রাজস্ব আয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রফতানিপণ্য ওঠানামা হয়। আগের বছরে একাধিক অভিযোগ ওঠে পণ্য খালাসে ধীরগতি, দুর্নীতি, অতিরিক্ত খরচ এবং অকারণে কনটেইনার আটকে রাখার মতো বিষয়ে। অভিযোগগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বন্দরের ইয়ার্ড ও গেট অপারেশন চালানো প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। একাধিক তদন্ত ও বাণিজ্যিক রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটিকে অপারেশন থেকে বাদ দিয়ে দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ নৌবাহিনী। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, এখন বন্দরের গেটে তদারকি বেড়েছে, গেট পাস ইস্যুতে হয়রানি কমেছে এবং রাতে কাজের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আগে কনটেইনার খালাসে তিন-পাঁচ দিন সময় লাগত। এখন ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা পণ্য হাতে পাচ্ছি। এটা আমাদের ব্যবসা পরিচালনায় বিরাট সুবিধা দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ইয়ার্ডে এখন আর আগের মতো অব্যবস্থা নেই। পণ্যের অগ্রাধিকার অনুযায়ী শিডিউল করা হচ্ছে ট্রাক চলাচল। স্বয়ংক্রিয় বারকোড স্ক্যানিং ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত পণ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। নৌবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শনে যাচ্ছেন এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো: ফরিদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা পুরো অপারেশন কার্যক্রমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছি। সবকিছুই এখন ডিজিটাল রেকর্ডে যাচ্ছে, আর এতে করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এখন প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি কনটেইনার হ্যান্ডল করতে পারছি আগের তুলনায়। আমদানি করা শিল্প-কাঁচামাল, খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ ও ভোগ্যপণ্যের খালাসে আগে যেসব ভোগান্তির কথা বলা হতো, সেগুলোর বড় একটি অংশ এখন আর নেই। ট্রাক ও ট্রেইলারের দীর্ঘ লাইনের বদলে এখন পণ্যভিত্তিক নির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে প্রবেশ ও বের হওয়া নিশ্চিত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আগে প্রতি কনটেইনার খালাসে গড়ে ১০-১৫ হাজার টাকা বাড়তি খরচ হতো। এখন সেই খরচ ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এক দিকে সময় বাঁচছে, অন্য দিকে খরচ কমে গিয়ে প্রতিযোগিতায় সুবিধা হচ্ছে।’

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নৌবাহিনীর মাধ্যমে বন্দরে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থাও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এখন প্রতিটি প্রবেশদ্বারে রয়েছে একাধিক স্ক্যানার, সিসিটিভি ও সেন্সরযুক্ত গেট। ফলে অবৈধ পণ্য প্রবেশ বা চোরাচালানের আশঙ্কাও অনেকটাই কমে এসেছে। বন্দর এলাকায় কর্মরত একজন শ্রমিক বলেন, ‘আগে যেভাবে দালালদের মাধ্যমে কাজ নিতে হতো, এখন সেটি আর নেই। নির্দিষ্ট টোকেন পদ্ধতিতে সবাই কাজ পাচ্ছে। এটি শ্রমিকদের জন্যও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে।’

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক লজিস্টিক কোম্পানি ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে আবারো উচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম র‌্যাংকিংয়ে বন্দরের অবস্থান উন্নত হওয়ার ইঙ্গিতও দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিক পারফরম্যান্স ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮৬তম। নতুন করে বন্দরের অপারেশন দক্ষতা বাড়ায় ২০২৫ সালের সূচকে আরো ভালো অবস্থান প্রত্যাশা করছে সরকার।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের এক নেতা বলেন, বন্দরটি যত বেশি সময়সাশ্রয়ী হবে, তত বেশি বিদেশী কোম্পানি আমাদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী হবে। নৌবাহিনীর দক্ষ তত্ত্বাবধান সে সম্ভাবনা উজ্জ্বল করেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আরো বাড়াতে প্যাটার্নভিত্তিক কাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, রেল সংযোগ বাড়ানো এবং পোর্ট ট্রাক ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নতুন টানেল নির্মাণ শেষ হলে বন্দর থেকে শহরের সংযোগও আরো দ্রুত হবে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা বলেন, তারা ২০৩০ সালের মধ্যে বন্দরকে পুরোপুরি স্মার্ট বন্দরে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছেন। এতে শুধু ব্যবসায়িক লাভই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। এখানে পণ্যের গতি মানেই দেশের উৎপাদন, সরবরাহ ও রফতানিপ্রবাহ ঠিক থাকা। সাইফ পাওয়ার গ্রুপের বিদায়ের পর নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বন্দরের শৃঙ্খলা, গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা যে হারে বেড়েছে, তা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন খাতসংশ্লষ্টরা।