ই-ক্যাবের নির্বাচনকে সামনে রেখে পুনর্গঠিত হচ্ছে পতিত আওয়ামী লীগের ব্যবসায়ীরা

পলক ও শমী কায়সারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর এসব ব্যবসায়ী গোষ্ঠী

ই-ক্যাবে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় অংশ নেয়ার কথা বলে সেখানে পুরনো ফ্যাসিবাদীদের ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছেন সংগঠনের কয়েকজন সদস্য।

শাহ আলম নূর
Printed Edition
E-Cab

ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) ২০২৫-২৭ সেশনের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক এই সংগঠনটিতে পতিত ফ্যাসিবাদের দোসর ব্যবসায়ীরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার তাদের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করেছে। এমন পরিস্থিতিতে জুলাই আগস্ট আন্দোলনের পক্ষের ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তারা বলছেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও শমী কায়সারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে এসব ব্যবসায়ী গোষ্ঠী।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী ৩১ মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হয়েছে গত ২২ এপ্রিল থেকে। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ই-ক্যাবে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় অংশ নেয়ার কথা বলে সেখানে পুরনো ফ্যাসিবাদীদের ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছেন সংগঠনের কয়েকজন সদস্য। সংগঠনটির সদস্যদের অভিযোগ, প্রথমে জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির কথা বলে কয়েকজন সদস্য বর্তমান ই-ক্যাবে নেতৃত্ব দেয়া ‘বৈষম্যবিরোধী ইক্যাব’ ব্যানারের উদ্যোক্তাদের দলে ভেড়াতে চেষ্টা করেন। এ লক্ষ্যে ইউনাইটেড আইসিটি ফোরাম নামে একটি প্ল্যাটফর্ম খোলেন এসব ব্যবসায়ী। সেখানে আইসিটি খাতের সব সংগঠন যেমন বেসিস, বাক্কো, ই-ক্যাবসহ সব সংগঠনের নেতাদের জড়ো করেন তারা। এর মধ্য দিয়ে নিজেকে আইসিটি খাতের মাফিয়া ভাবতে শুরু করেন। পতিত আওয়ামী লীগের ব্যবসায়ীদের কেন বিভিন্নভাবে সুযোগ দেয়া হচ্ছে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন ই-ক্যাবের নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ কিছু আওয়ামী-সমর্থক ব্যবসায়ীকে একত্রিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সুযোগে আওয়ামী লীগ আমলে ই-ক্যাবের নেতৃত্বে থাকা শমী-তমালের ঘনিষ্ঠরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের ঘনিষ্টজনরা তার এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজ করে যাচ্ছে।

অন্য দিকে, বৈষম্যবিরোধী ই-ক্যাবের নেতাদের নানা অপবাদ দিয়ে অথবা স্টার্টআপ বাংলাদেশ লি. থেকে ফান্ড পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ই-ক্যাবের নির্বাচন থেকে ‘মাইনাস’ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর আগে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকার গুলশানে নিজের প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে বসে বৈষম্যবিরোধী ও বিএনপিপন্থী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেন একজন উদ্যোক্তা। এসব বৈঠকে ই-ক্যাবের আসন্ন দ্বিবার্ষিক নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একটি প্যানেল নির্বাচিত করে নিয়ে আসার আশ্বাস দেন তিনি। তবে এ জন্য তিনি প্যানেলে কয়েকটি বড় ব্র্যান্ডের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন। অভিযোগ উঠেছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ উদ্যোক্তাদের নিয়ে নির্বাচনী প্যানেল তৈরি করেছেন কয়েকজন উদ্যোক্তা।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ করে বলেন, ইক্যাবের নির্বাচনের জন্য যে প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে এদের মধ্যে হোসনে আরা নূরী নওরীন বিগত শমী-তমাল কমিটিতে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন। এমনকি গাড়িতে চড়ে বেড়ানো এই উদ্যোক্তাও পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ হাজার টাকার অনুদান। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ভারত ফ্রেন্ডশিপ অ্যাওয়ার্ড পায় এই উদ্যোক্তা। এদিকে জাহিদুজ্জামান সাঈদ বিগত সরকারের আমলে ডিজিটাল পল্লী নামের প্রকল্পে কনসালট্যান্টের কাজ করেছেন। একটি অনলাইন পোর্টালে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শিরোনামে টকশোর সঞ্চালক ছিলেন তিনি। এ ছাড়া নুরুজ্জামান আওয়ামী ঘনিষ্ঠ মো: সবুর খানের প্রতিষ্ঠিত ডেফোডিল গ্রুপের গ্রুপ সিইও হয়ে কাজ করছেন দীর্ঘদিন। এ ছাড়া নুর নবী হাসান ও মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন শিপন গত বছর শমী কায়সারের নেতৃত্বাধীন অগ্রগামী প্যানেলের হয়ে নির্বাচন করেছেন। এদের নিয়ে নির্বাচনের প্যানেল গঠন করে কাজ করছেন একদল আওয়ামী ঘরানার উদ্যোক্তা।

এ কারণে ই-ক্যাবে বিএনপিপন্থী ও বৈষম্যবিরোধী সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। ই-ক্যাবের সহায়ক কমিটিতে ছিলেন এমন একজন সদস্য নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি একজন বিএনপির নগণ্য কর্মী হয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই। প্যানেল পরিচিতি মিটিংয়ে দাওয়াত পেয়েও আমি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি। জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী নেতাদের কাছে এর বিচার চাই।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শমী কায়সারের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কমিটির সবাই পদত্যাগ করেন। এরপর সংগঠনটিতে প্রশাসক হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কমার্স সেলের উপসচিব মুহাম্মদ সাঈদ আলীকে নিয়োগ দেয় সরকার।