তেলেগু সম্প্রদায়ের আড়াইশ’ বছর
মৌলিক অধিকারের জন্য হাহাকার
Printed Edition
হাবিবুল বাশার
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হিসেবে নাগরিকদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী-সংলগ্ন ধলপুর এলাকায় বসবাসরত তেলেগু সম্প্রদায়ের শত শত মানুষের জীবনে এ সাংবিধানিক অধিকারগুলো কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বংশপরম্পরায় আড়াইশ বছর ধরে এ ভূখণ্ডে বাস করলেও আজ তারা নিজ ভূমিতেই পরবাসী, যেখানে প্রতিটি দিন কাটে উচ্ছেদ আতঙ্ক আর চরম অমানবিক পরিবেশে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ইইঝ) সর্বশেষ ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বস্তিবাসী মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ ৪৮৬ জন। সরকারি এ হিসাব মতে, ঢাকা বিভাগে বস্তিবাসী মানুষের সংখ্যা আট লাখ ৮৪ হাজার ৪৯৬ জন। তবে সরকারি এ পরিসংখ্যান নিয়ে জনমনে ও বিশেষজ্ঞদের মাঝে গভীর সংশয় রয়েছে। নগর বিশেষজ্ঞ ও স্থপতিদের মতে, রাজধানী ঢাকার প্রায় ৪৪ লাখ মানুষ বর্তমানে বস্তি এলাকায় বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিন কোটি মানুষের এ মেগাসিটিতে সুবিধাবঞ্চিত বস্তিবাসীর সংখ্যা ৪০ লাখেরও বেশি। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক (ইজঅঈ) ও অন্যান্য এনজিওর সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০-২৫ শতাংশ মানুষ বস্তি বা অস্থায়ী বসতিতে জীবনযাপন করছে। মূলত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ‘বস্তি’র সংজ্ঞায়নের ভিন্নতা এবং ভাসমান জনসংখ্যার সঠিক হিসাব না থাকায় এ পরিসংখ্যানে বিশাল ব্যবধান দেখা যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের মৌলিক অধিকার প্রাপ্তিতে।
তেলেগু কলোনির আর্তনাদ : সংবিধান বনাম বাস্তবতা
মানিকনগর এলাকার এ তেলেগু কলোনির বাসিন্দাদের যাপনচিত্র দেখলে বোঝা যায়, সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘জনসাধারণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র তাহার প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন’- এ বিধানটি সেখানে চরমভাবে লঙ্ঘিত।
কলোনির গৃহিণী মালা রানী তার দীর্ঘদিনের কষ্টের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমরা দুই শতাধিক পরিবার এখানে ১৯৯৬ সালের পর থেকে বসবাস করে আসছি। আমাদের জন্য একটি টিউবওয়েল ও ২০টি টয়লেট তৈরি করা হয়েছিল, যার এখন অধিকাংশই ভাঙা ও অস্বাস্থ্যকর। সরকারিভাবে এ দুরবস্থার জন্য ১৭টির মতো টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে কিন্তু এখন পর্যন্ত কমোডের ব্যবস্থা করা হয় নাই।’ মালা রানীর এ বক্তব্য প্রমাণ করে, মৌলিক স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অধিকার থেকে তারা কতটা বঞ্চিত।
পেশায় চালক রাজ তার বংশপরম্পরার ইতিহাস টেনে বলেন, প্রায় ২৫০ বছর ধরে আমরা এ দেশে বসবাস করে আসছি। মানিকনগরে আছি প্রায় ৩৩ বছর ধরে। যদিও আমরা এ দেশের নাগরিক কিন্তু নাগরিকদের কোনো সুযোগ-সুবিধা আমরা পাচ্ছি না। গ্রীস্মকালীন সময়ে টিউবওয়েলের সিরিয়াল এত বেশি থাকে যে অধিকাংশ সময় পানি না পেয়ে ফিরে যেতে হয়। আর যখন বর্ষার মৌসুম হয়, তখন মনে হয় আমরা জলাশয়ের ভেতরে বসবাস করছি; পুরো এলাকা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বেদিতে পরিণত হয়। ১০ ফুট বাই ১৫ ফুটের ছোট্ট একটি ঘরের মধ্যে ১০ জনের বেশি মানুষ পর্যন্ত থাকি। আমার পরিবারের সদস্যসংখ্যা সাতজন, আমরা এখানেই থাকছি। রাজের এ আকুতি সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘আশ্রয়’ ও ‘জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ’ প্রাপ্তির চরম ব্যর্থতাকে তুলে ধরে।
রণক্ষেত্রে বীর, পুনর্বাসনে ব্রাত্য : এক মুক্তিযোদ্ধার আক্ষেপ
কলোনির বাসিন্দা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রমনা সাহেবের জীবনের গল্পটি রাষ্ট্রের জন্য এক চরম লজ্জার বিষয়। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে কাউসার সাহেবের নেতৃত্বে ঢাকার ভেতরে যুদ্ধ শুরু করেছিলাম। আমরা যুদ্ধ করেছিলাম নিউমার্কেট, বাংলামোটর, বেইলি রোড ও রোজ গার্ডেন এলাকায়। তিনটা গুলি খেয়েছি কিন্তু আমি বেঁচে আছি। যুদ্ধের শেষ দিকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। আমার সহযোদ্ধাদের খোঁজার চেষ্টা করার পরও তাদের খুঁজে পাইনি। এখনো পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা থেকে শুরু করে কোনো সুযোগ-সুবিধা আমি পাইনি। আড়াইশ বছর আগে থেকে আসা এ সম্প্রদায় দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধ করেছি কিন্তু তার স্বীকৃতিটুকু আমি পাইনি। জন্মসূত্রে এ দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা আমাদের মিলে না। স্থায়ী কোনো ঠিকানা আমাদের নেই। জানি না আদতে এ সুযোগ-সুবিধা পাবো কি না। বাড়ি থেকে শুরু করে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আমরা বসবাস করছি পালাক্রমে কিন্তু স্থায়ী কোনো ঠিকানা আমাদের মেলেনি।
উচ্ছেদ আতঙ্ক ও নাগরিকত্বের সঙ্কট
তেলেগু কলোনির বাসিন্দা বাবু দাশ নয়া দিগন্তকে জানান, ওয়ারী, ধলপুর, মোহাম্মদপুর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে আমাদের তেলেগু সম্প্রদায়ের মানুষ আছে তিন লক্ষের মতো। জন্মসূত্রে আমরা সবাই বাংলাদেশী। এ দেশের প্রয়োজনে আমরা এগিয়ে আসি কিন্তু সঠিক মূল্যায়ন আমরা পাই না। ১৯৯৬ সালে আমাদের কলোনিতে অনাকাক্সিক্ষতভাবে আগুন ধরে যায়, যার ফলে তৎকালীন ৯৬টি পরিবারকে পথে আশ্রয় নিতে হয়। আমাদের এখানে অধিকাংশ পরিবারই ঋণে জর্জরিত। আওয়ামী লীগের মেয়র ফজলে নূর তাপসের সময়কালে বিনা নোটিশে আমাদেরকে উচ্ছেদ করা হয়। বৃদ্ধ, নারী, শিশুদেরকে নিয়ে তখন আমরা খোলা মাঠে অবস্থান করি। আমাদের এখানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান সম্প্রদায় বাস করে। অনেক কষ্ট ও পরিশ্রমের ফলে এখানে আমরা আশ্রয় পেয়েছি। শুধুমাত্র একটাই চাওয়া, আমাদের স্থায়ী আবাসন দরকার। আমরা যেন এ দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে থাকতে পারি। নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকারগুলো যেন আমরা ফিরে পাই।
আইনি সুরক্ষা ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা
১৯৯৯ সালের ঐতিহাসিক ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র (অঝক) বনাম বাংলাদেশ’ মামলায় উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদের ‘আশ্রয়’ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার অনুযায়ী যথাযথ পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া এবং পর্যাপ্ত সময় দিয়ে নোটিশ না পাঠিয়ে কাউকে আশ্রয়হীন করা যাবে না। আদালত স্বীকার করেছিলেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো সরাসরি কার্যকরযোগ্য না হলেও, রাষ্ট্র যখন কোনো পদক্ষেপ নেয় তখন তাকে অবশ্যই মানবিক হতে হবে।
কিন্তু মানিকনগরের এ তেলেগু কলোনির চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সংবিধানের ১৫(ক) এবং ১৮(১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেয় নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। উচ্চ আদালতের রায় এবং সাংবিধানিক নৈতিকতা মেনে এ প্রান্তিক মানুষদের স্থায়ী পুনর্বাসন ও নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া এখন সময়ের দাবি। নচেৎ, উন্নয়নের এ চাকচিক্য কেবল বৈষম্যের পাহাড়কেই বড় করবে। এ আড়াইশ বছরের বঞ্চনা ঘোচাতে রাষ্ট্রের অভিভাবকসুলভ ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই।