সরকারি স্বীকৃতি না পেয়ে অনিশ্চয়তায় বরকল রাগীব-রাবেয়া কলেজ

উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পাহাড়ি জনপদ

Printed Edition
bangla-2
সরকারি স্বীকৃতি না পেয়ে অনিশ্চয়তায় বরকল রাগীব-রাবেয়া কলেজ

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

রাঙ্গামাটির দুর্গম বরকল উপজেলায় উচ্চশিক্ষার একমাত্র ভরসা বরকল রাগীব-রাবেয়া কলেজ। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার এক যুগ পার হলেও এখনো সরকারি স্বীকৃতি না পাওয়ায় পাহাড়ি এই জনপদের শিক্ষাব্যবস্থা রয়ে গেছে নানা সীমাবদ্ধতায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা, আর্থিক সঙ্কট ও অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অর্জন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি, নাম পরিবর্তন ছাড়াই দ্রুত কলেজটিকে সরকারি করা হোক। পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির ১০টি উপজেলার মধ্যে বরকল অন্যতম দুর্গম এলাকা। ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল। বিশেষ করে ২০১৩ সালের আগে এখানে কোনো ইন্টারমিডিয়েট কলেজ না থাকায় এসএসসি পাসের পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী অর্থাভাবে ও দূরত্বজনিত কারণে পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতো।

এই বাস্তবতা থেকেই ২০১৩ সালে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। তৎকালীন বিজিবি রাঙ্গামাটি সেক্টরের কমান্ডার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নূরুল হুদার উদ্যোগে বিষয়টি সামনে আসে। পরে দানবীর ড. সৈয়দ রাগীব আলীর প্রতিষ্ঠিত রাগীব-রাবেয়া ফাউন্ডেশনের সহায়তায় একই বছরের ১ জানুয়ারি কলেজটি যাত্রা শুরু করে। শুরুতে ৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পথচলা শুরু হলেও বর্তমানে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করছে।

দুর্গম এলাকায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা শুরু থেকেই ছিল চ্যালেঞ্জিং। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে এগিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠার প্রথম বছরেই পরীক্ষার কেন্দ্র পাওয়ার মতো সাফল্য অর্জন করে কলেজটি, যা প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হচ্ছে এবং অনেকেই ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে সাফল্যের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এখনো কলেজটিতে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা সম্ভব হয়নি; কেবল মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগে পাঠদান চলছে। বর্তমানে ১০ জন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান পরিচালিত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কলেজের একজন শিক্ষকও এখনো এমপিওভুক্ত নন; শুরু থেকেই ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে তাদের বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে।

প্রায় দুই একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কলেজটির পুরো জমিই স্থানীয় জনগণের দান। অবকাঠামো নির্মাণ, আসবাবপত্র সরবরাহ এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনসহ বেশির ভাগ ব্যয় বহন করছে রাগীব-রাবেয়া ফাউন্ডেশন। একটি অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে সরকারি নিয়ম অনুসরণ করে কলেজটি পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

কলেজটি সরকারি করার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। কলেজের অধ্যক্ষ নুইচিং রাখাইন জানান, সরকারি স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হলেও কোনো লিখিত কারণ জানানো হয়নি। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কলেজের নাম এবং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতাকে ঘিরে আইনি জটিলতার কারণে আগের সরকারের সময় প্রক্রিয়াটি থমকে যায়।

তিনি আরো জানান, ২০১৯ সালে কলেজটি সরকারি করার প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশনায় প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে ২০২০ সালে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হলেও এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

সরকারের ঘোষণায় প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা থাকলেও বরকল এখনো সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সরকারি স্বীকৃতি না থাকায় শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষাসুবিধা, বিজ্ঞান বিভাগ, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।