দাম নেই, কোল্ডস্টোরেজেও ঠাঁই নেই দিশেহারা মুন্সীগঞ্জের আলুচাষিরাষ মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি

Printed Edition
bangla-2
কৃষকের নিজের বাড়িতে স্তূপ করে রাখা আলু : নয়া দিগন্ত

বাম্পার ফলন সত্ত্বেও ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং কোল্ডস্টোরেজে জায়গা না পেয়ে বর্তমানে দ্বিমুখী চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মুন্সীগঞ্জের আলুচাষিরা। জেলার সদর, টঙ্গীবাড়ী, লৌহজং, গজারিয়া ও সিরাজদিখান উপজেলায় আলু উত্তোলনের কাজ প্রায় শেষ হলেও বাজারে চাহিদা কম থাকায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে জমিতেই আলু স্তূপ করে রাখছেন। এতে একদিকে পচনঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে লোকসানের আশঙ্কা।

কৃষকদের অভিযোগ, বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিকের খরচ বেড়ে গেলেও বাজারে আলুর দাম আশানুরূপ বাড়েনি। বর্তমানে প্রতি মণ আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪০০ টাকায়। অথচ এক বস্তা আলু কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করতে খরচ পড়ছে প্রায় ৮০০ টাকা। ফলে সংরক্ষণ করেও লাভের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না চাষিরা।

আব্দুল্লাহপুর বেতকার আলুর পাইকারি ব্যবসায়ী তারেক বেপারী বলেন, ‘কৃষকের ওপর যেন একসাথে ঝড় নেমে এসেছে। দাম নেই, আবার রাখার জায়গাও নেই। অনেকেই বাধ্য হয়ে জমিতেই আলু ফেলে রাখছেন।’

টঙ্গীবাড়ীর কৃষক মোক্তার হোসেন জানান, দামের কারণে কোল্ড স্টোরেজে আলু রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রায় ৪০০ মণ আলু জমিতে জড়ো করে রেখেছি। পাইকার আসে না, বিক্রিও হচ্ছে না। খুচরা বাজারে দাম থাকলেও আমরা সেই সুবিধা পাই না। সরকার দ্রুত রফতানির ব্যবস্থা না করলে আলুচাষে ধস নামবে।

একই উপজেলার বলই গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, উৎপাদন বেশি হওয়ায় কোথাও জায়গা পাচ্ছি না। খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জেলাজুড়ে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় অধিকাংশ কোল্ড স্টোরেজ ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে অনেক কৃষক সংরক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আব্দুল্লাহপুর পপুলার কোল্ডস্টোরেজের ম্যানেজার মীর আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘স্টোরেজে আর জায়গা নেই। অনেক কৃষক আলু রাখতে না পেরে জমিতেই রেখে দিচ্ছেন। পাইকার পেলে তখন বিক্রি করবেন এ আশায়।’

কম্বাইন্ড কোল্ডস্টোরেজের সুপারভাইজার ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জানান, ‘ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি আলু আসায় সবাইকে সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে পয়সা কোল্ডস্টোরেজের হিসাবরক্ষক মনির খন্দকার বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংরক্ষণ ভাড়া বাড়াতে হয়েছে, যা কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।’

বেতকা ইয়াছিন বাণিজ্যালয়ের ম্যানেজার শামসুদ্দিন বলেন, বীজ, সার ও শ্রমিকের খরচ বেড়েছে, কিন্তু আলুর দাম নেই। খরচই উঠছে না, লাভ তো দূরের কথা।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে মুন্সীগঞ্জে প্রায় ৩৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৯ লাখ ৭৫ হাজার টন, যার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ ৪৯ হাজার টন। জেলায় ৬১টি কোল্ড স্টোরেজ চালু থাকলেও বন্ধ রয়েছে তিনটি।

জেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, সংরক্ষণ সঙ্কট নিরসন ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে সংশ্লিষ্টদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বাম্পার ফলনের পরও ন্যায্য দাম ও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকলে আলুচাষে কৃষকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এ খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।