ভূমিকম্প : প্রাকৃতিক ঘটনা নাকি আল্লাহর প্রেরিত বার্তা

Printed Edition
islami logo
ভূমিকম্প : প্রাকৃতিক ঘটনা নাকি আল্লাহর প্রেরিত বার্তা

মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ

ভূমিকম্প একদিকে প্রকৃতির পার্থিব প্রক্রিয়ার ফল হলেও, অন্যদিকে তা আধ্যাত্মিক ও ঈমানি দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর শিক্ষা বহন করে। এই পৃথিবীতে যা ঘটে, তার পেছনে শুধু ভূতাত্ত্বিক কারণ নয়; বরং মানুষের গুনাহ, অনাচার, সীমালঙ্ঘন এবং সামাজিক অবাধ্যতার সাথে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে কোনো সম্প্রদায়কে শাস্তি দিতে পারেন, কোনো সম্প্রদায়কে পরীক্ষা করতে পারেন এবং মুমিনদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে এ ধরনের ঘটনা প্রেরণ করতে পারেন। প্রতিটি বিপদ ও দুর্যোগ মানুষকে তাদের কর্মের ফলাফলের দিকে মনোযোগী করার এবং তওবা, তাকওয়া ও সদকার মাধ্যমে নিজেদের ঠিক পথে ফেরানোর সুযোগ হিসেবে প্রেরিত হয়। কুরআনুল করিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘পৃথিবী ও সমুদ্রে নাশের কারণ হলো মানুষের নিজের কর্ম, যাতে তারা তাদের কর্মের ফল ভোগ করে এবং ফেরে।’ (সূরা রূম-৪১) অন্য আয়াতে তিনি সতর্ক করে বলেছেন- ‘তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি (আল্লাহ) ক্ষমা করে দেন।।’ (সূরা শুরা-৩০)

দুর্যোগের কারণ : মানুষ প্রায়শই দুর্যোগের কারণ খুঁজে বের করার সময় শুধু প্রাকৃতিক কারণকে দায়ী করে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি ঘটনা আল্লাহর ইচ্ছা ও কুদরতের অধীনে সংঘটিত হয়। প্রতিটি বিপর্যয় আমাদের জন্য শিক্ষা, হিকমত ও আত্মপরীক্ষার এক মাধ্যম। সুতরাং, ভূমিকম্প কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি মানুষকে সচেতন করার, আত্মসমীক্ষা করার এবং তওবার পথে ফিরে আসার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

হাদিসের আলোকে ভূমিকম্পের কারণ : হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- যেখানে নবী করিম সা: বলেন, ‘যখন নি¤œলিখিত অপরাধগুলো সমাজে বিরাজ করতে শুরু করবে, তখন সেই যুগে ভূমিকম্প, জমিনধস, চেহারা বিকৃতি, আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ এবং অন্য ভয়াবহ আজাবের ইনতেজার করো। আর বিপর্যয়গুলো এমন ধারাবাহিকভাবে ঘটবে, যেন একটি পুরান হারের সুতা ছিড়ে গেলে একটির পর একটি দানা পড়তে থাকে।’

অপরাধগুলো হলো : গণিমতের সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদ বলে গণ্য করা। জাকাতকে জরিমানা বলা। দ্বীনি উদ্দেশ্য ছাড়া ইলম অর্জন করা। পুরুষরা স্ত্রীদের আনুগত্য করা। মায়ের অবাধ্য হওয়া। বন্ধুদের নিকটবর্তী করে আর পিতাকে দূর করা। মসজিদে শোরগোল করা। পাপাচারীরা গোত্রের নেতা হয়ে যাওয়া। নিকৃষ্ট লোকেরা সমাজ নেতা হওয়া। অনিষ্টের আশঙ্কায় কাউকে সম্মান করা। গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের বিস্তার ঘটা। মদ্যপান ছড়িয়ে পড়া। উম্মতের শেষ যুগের লোকেরা প্রথম যুগের লোকদের অভিসম্পাত করা।’ (সুনানে তিরমিজি-২২১৪)

ইমাম ইবনুল কায়িম রহ. বলেন, ‘মানুষের গুনাহের কারণে পৃথিবীতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তার মধ্যে ভূমিকম্পও অন্তর্ভুক্ত।’ তিনি আরো বলেন, একবার আনাস বিন মালিক রা: ও একজন লোক হজরত আয়েশা রা:-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে উম্মুল মুমেনিন, ভূমিকম্প সম্পর্কে আমাদের বলুন।’ আয়েশা রা: বললেন, ‘যখন মানুষ প্রকাশ্যে অনাচার করে-যেমন অবৈধ সম্পর্ক, মদ্যপান এবং বাদ্যযন্ত্র বাজানো, তখন আল্লাহ পৃথিবীকে আদেশ দেন, তোমরা তাদের ওপর কেঁপে উঠো। যদি তারা তওবা করে এবং অনাচার ত্যাগ করে, তাহলে আল্লাহ মাফ করে দেন; না হলে শাস্তি প্রদান করেন। এটি মুমিনদের জন্য শিক্ষা এবং কাফিরদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।’ (মুসতাদরাকে হাকেম-৮৬২২) উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. সমস্ত প্রদেশকে লিখেছিলেন, ভূমিকম্প আল্লাহর ভয় দেখানোর একটি মাধ্যম। তিনি আরো নির্দেশ দেন, মানুষ যেন দান করে, তওবা করে এবং আল্লাহর বিধিবিধান পালন করে।

ভূমিকম্প কিয়ামতের আলামত : রাসূল সা: বলেছেন, ‘ইলম তুলে নেয়া হবে না যে পর্যন্ত না কিয়ামত হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সঙ্কুুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং খুনখারাবি বাড়বে, তোমাদের সম্পদ এত বাড়বে যে, উপচে পড়বে।’ (বুখারি-৯৭৯)

ভূমিকম্পের ব্যাপারে কুসংস্কার : ভূমিকম্পকে ঘিরে মানুষের মাঝে বিভিন্ন অদ্ভুত ধারণা প্রচলিত আছে। কেউ বলে, অতিপ্রাকৃতিক শক্তিসম্পন্ন বিশাল দানবরা, যারা নাকি পৃথিবীর ভেতরে বাস করে, তারাই ভূমিকম্প সৃষ্টি করে। হিন্দুদের একটি বিশ্বাস হলো- পৃথিবী নাকি একটি গরুর শিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে; গরুটি যখন শিং বদলায়, তখন ভূমিকম্প হয়। কিছু বানোওয়াট রেওয়ায়েতেও এ ধরনের কথাবার্তা রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলে, পৃথিবী একটি বিশাল কাছিমের পিঠের ওপর রাখা, সে নড়াচড়া করলে ভূমিকম্প হয়। এগুলো সম্পূর্ণই কুসংস্কার।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভূমিকম্প : বিজ্ঞানীদের মধ্যেও ভূমিকম্প সম্পর্কে মতভিন্নতা রয়েছে। কারো মতে, ‘পৃথিবীর ভেতরের গরম বায়ু বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করলে ভূমিকম্প হয়।’ আবার কেউ বলেন, ‘পৃথিবী ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হচ্ছে, আর এই ঠাণ্ডা হওয়ার প্রক্রিয়ায় এর বাইরের স্তরে ফাটল সৃষ্টি হয়, ফলে ভূমিকম্প দেখা দেয়।’ কিছু বিজ্ঞানীর দাবি, ‘পৃথিবীর অভ্যন্তরে ভয়াবহ উত্তাপের অগ্নিগহ্বর আছে, যার প্রভাবে পৃথিবীর শরীর বেলুনের মতো স্ফীত হয়; আর সে কারণেও ভূমিকম্প হতে পারে।’

কিন্তু বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব হলো ‘প্লেট টেকটোনিক্স তত্ত্ব’। বহু ভূতত্ত্ববিদও মনে করেন, ‘পৃথিবীর স্তরগুলো মাটি, পাথর ও শিলাপুঞ্জের বিশাল প্লেট দ্বারা গঠিত। যখন এই প্লেটগুলো ভূ-চাপের কারণে ভেঙে যায় বা স্থানচ্যুত হয়, তখন ভূকম্পীয় তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। তরঙ্গগুলো দেখা না গেলেও এর কারণে ভূমির ওপরের সব কিছু কাঁপতে থাকে।’

ইসলাম ও বিজ্ঞানের পার্থক্য : বিজ্ঞান আমাদের এ পর্যন্ত জানাতে পেরেছে যে, পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলো নড়াচড়া করলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। কিন্তু এ সমস্যা থেকে বের হওয়ার উপায় কী, আর এমন পরিস্থিতিতে মানুষ কী করবে, এর সমাধান বিজ্ঞান দিতে পারেনি। এ কারণেই রাসূল সা:-এর যুগে যখন মদিনায় ভূমিকম্প ঘটেছিল, তিনি ইরশাদ করেছিলেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক চান যে তোমরা তোমাদের ভুল-ত্রুটির ক্ষমা প্রার্থনা করো।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা- ৮৩৩৪)

ভূমিকম্পে নিহত ব্যক্তি : যে ব্যক্তি ঈমানের হালতে ভূমিকম্প বা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় মারা যায়, সে শহীদে হুকমি হিসেবে গণ্য হবে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘শহীদ পাঁচ প্রকার- যে শত্রুর আঘাতে নিহত হয় বা পেটের ব্যথায় মারা যায়, অথবা পানিতে ডুবে মারা যায়, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে মারা যায়, তারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়।’ (২৮২৯)

পুনশ্চ : ভূমিকম্পের কাঁপন শুধু মাটিকে নাড়ায় না, এটি মানুষের হৃদয়, বিবেক ও অহঙ্কারকে গভীরভাবে ঝাঁকিয়ে দেয়। পৃথিবীর বুকের এই সামান্য কাঁপনে সভ্যতার সমস্ত আয়োজন মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। যেন খোদায়ি বার্তা অনুরণিত হয়ে উঠে ধ্বনিত হতে থাকে ‘দেখো! তোমাদের উন্নতি, প্রযুক্তি, শক্তি সব কিছু সত্ত্বেও তোমরা কত দুর্বল। তাই তোমাদের ফিরতে হবে আমার দিকেই।’

ইসলাম আমাদের শেখায়, এ ধরনের বিপর্যয় অকারণ নয়। এগুলো সতর্কবার্তা, মানুষের ভুল ও অবহেলার ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে এক শক্তিশালী বার্তা। পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন কোনো জাতি আল্লাহকে ভুলে যায়, গুনাহে ডুবে থাকে, তখন নানা দুর্যোগ তাদের অন্তরে ভয়ের ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়; যাতে তারা ফিরে আসে, অনুতাপ করে, সংশোধন হয়। একজন ঈমানদার সেই সতর্কতাকে অস্বীকার করে না, হতাশও হয় না; বরং ভূমিকম্পের প্রতিটি কম্পন তার অন্তরে ঈমানের আলোকে উজ্জ্বল করে তোলে। সে মনে করে, ‘আজ যদি ক্ষণিকের কম্পনে মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়, তবে কিয়ামতের মহান ভূমিকম্পে মানুষের অবস্থা কী হবে?’

মুদাররিস : জামিয়া নুরিয়া ইসলামিয়া কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা।