- মো: বদরুল মিল্লাত ইবনে হান্নান
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে যদিও ‘মালাক্কা প্রণালী’ নামটি হয়তো একেবারেই অপরিচিত। প্রণালীটির ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে আমাদের দৈনন্দিন সংবাদেও এটি খুব একটা স্থান পায় না। অথচ এই ছোট সমুদ্রপথটি বিশ্ব রাজনীতির এমন এক সমীকরণ তৈরি করছে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে জোরালো হচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী পারস্য উপসাগরের ‘হরমুজ প্রণালী’র মতোই ভারত মহাসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ যার নাম মালাক্কা প্রণালী। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যবর্তী এই প্রণালীটি কোথাও কোথাও মাত্র ১.৫ কিলোমিটার প্রশস্ত। আকারে ছোট হলেও বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং হাব বা ‘বিশ্বের কারখানা’ খ্যাত চীনের জন্য এটিই একমাত্র লাইফলাইন ও সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুর্বলতা (চোক পয়েন্ট)। কারণ, চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশ।
এই কঠিন বাস্তবতার গভীরতা চীনের চেয়ে ভালো আর কেউ উপলব্ধি করে না।
ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশ ও কম্পিউটার থেকে শুরু করে সোলার প্যানেল কিংবা বৈদ্যুতিক গাড়ি—বৈশ্বিক বাজারের সিংহভাগ পণ্যই তৈরি হয় চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে। কিন্তু বিপুল জালানি শক্তির জোগান ছাড়া এই বিশাল উৎপাদন খাত সচল রাখা প্রায়ই অসম্ভব। আর ঠিক এই জায়গাতেই বর্তমান বিশ্বের দুই পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—মালাক্কা প্রণালীকে কেন্দ্র করে এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।
চীনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: ‘মালাক্কা কৌশলগত সংকট’ (Malacca Dilemma)
অর্থনৈতিকভাবে মহাশক্তিশালী হলেও জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীন এক বড় সংকটের মধ্যে রয়েছে। দেশটির নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ দেশের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। চীনের মোট আমদানিকৃত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে এই মালাক্কা প্রণালী হয়ে দেশটিতে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ভূগর্ভে বিশাল জরুরি তেলের রিজার্ভও চীনের নেই, যা দিয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদি কোনো যুদ্ধ মোকাবিলা করতে পারবে।
চীনের এই বড় কৌশলগত দুর্বলতাকে বলা হয় ‘মালাক্কা ডাইলেমা’। ২০০৩ সালে চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও প্রথম এই শব্দটির ব্যবহার করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, চীনের অর্থনীতির মূল লাইফলাইনটি আসলে বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণে।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা: ইরান, ব্রিকস এবং রোহিঙ্গা সংকট
মালাক্কা প্রণালীকে ঘিরে চলা এই দ্বন্দ্বটি বিশ্ব রাজনীতির অন্যান্য সংকটের সাথেও গভীরভাবে যুক্ত। এর অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো মধ্যপ্রাচ্য। চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এর মধ্যে চীন প্রতিনিয়ত ইরানকে অর্থনৈতিক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও প্রযুক্তিগত সহায়তাসহ কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, যা ওয়াশিংটনকে মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। একই সাথে, ব্রিকস (BRICS) জোটে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। চীন ব্রিকস ভুক্ত দেশগুলোকে সাথে নিয়ে আঞ্চলিক মুদ্রার মাধ্যমে একটি বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যার মূল লক্ষ্য হলো ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো। এর মাধ্যমে বেইজিং নিশ্চিত করতে চায় যেন মালাক্কা প্রণালীতে কোনো যুদ্ধ বাধলে পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তাদের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে। এক্ষেত্রে ভারত পশ্চিমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ব্রিকসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো ‘R5’ নামের একটি নতুন মুদ্রা চালু করার পরিকল্পনা করছে। প্রতিষ্ঠাতা পাঁচ দেশের মুদ্রার নামের আদ্যক্ষর (ব্রাজিলের রিয়াল, রাশিয়ার রুবল, ভারতের রুপি, চীনের রেনমিনবি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার র্যান্ড) মিলিয়েই এই নামকরণ। এমতাবস্থায় ভারতের এই দ্বিমুখী অবস্থানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নেবে, তা দেখার বিষয়।
অদৃশ্য ফাঁদ: মাল্লাকার প্রবেশ মুখে মার্কিন-ভারতীয় সামরিক বলয়
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মালাক্কা প্রণালীর দুই প্রান্তেই চীনের জন্য একটি ভৌগোলিক ফাঁদ তৈরি করে রেখেছে। প্রণালীর পূর্ব প্রান্তে, প্রশান্ত মহাসাগরের প্রবেশমুখে রয়েছে সিঙ্গাপুর, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সপ্তম নৌবহরের নিয়মিত ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয় ‘চাঙ্গি নেভাল বে’।
অন্যদিকে প্রণালীর পশ্চিম প্রান্তে, ভারত মহাসাগরের প্রবেশমুখে রয়েছে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, যার মালিকানা ভারতের। চীনকে কাউন্টার করার জন্য গঠিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী ‘কোয়াড (Quad)’ জোটের অন্যতম প্রধান অংশীদার হলো ভারত। ভারত এই দ্বীপপুঞ্জে শক্তিশালী সামরিক ও বিমান ঘাঁটি গড়ে তুলেছে।
ফাঁদ এড়াতে চীনের বিকল্প কৌশল
এই বিপজ্জনক ফাঁদ থেকে বাঁচতে চীন তার মেগা প্রজেক্ট ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)’ চালু করেছে। বাইরে থেকে এটিকে কেবল বাণিজ্যিক বিনিয়োগ মনে হলেও, বাস্তবে এটি মালাক্কা প্রণালীকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প পথ তৈরির একটি মহাপরিকল্পনা।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)’ প্রকল্প। চীনের এই পরিকল্পনা অত্যন্ত নিখুঁত: মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলবাহী জাহাজ পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরে পৌঁছাবে। সেখান থেকে পাইপলাইন ও রেল-সড়কপথে তেল সরাসরি পশ্চিম চীনে পৌঁছানো সম্ভব হবে, ফলে মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা ও সেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
পাশাপাশি, থাইল্যান্ডের সংকীর্ণ কিন্ত মালয় উপদ্বীপকে এশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্তকারী সবচেয়ে সংকীর্ণ ভূ-খণ্ড ‘ক্রা এলাকা’ কেটে একটি বিশাল খাল খননের জন্য বেইজিং বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে জাহাজগুলো সিঙ্গাপুর ও মালাক্কা প্রণালীকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগরে প্রবেশ করতে পারবে।
তবে এই বিশাল সব প্রকল্প সত্ত্বেও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা চীনের সামনে একটি বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরেছেন। চীনের এত সব বিকল্প রুট মিলে তাদের মোট জ্বালানি চাহিদার মাত্র ২০ থেকে ২৮ শতাংশের সরবরাহ করতে পারবে। বাকি ৭২ থেকে ৮০ শতাংশ জ্বালানি আমদানির জন্য বেইজিংকে এখনো এই মালাক্কা প্রণালীর ওপরই নির্ভর করতে হবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৌশল কী হওয়া উচিত?
চীন যখন মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প খুঁজছে, তখন ভূরাজনৈতিকভাবে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। আর ঠিক এই সমীকরণেই দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বের মাঝপথে পড়েছে বাংলাদেশ।
কৌশলগতভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত মধ্য এশিয়া থেকে চীনকে নজরদারিতে রাখতে চেয়েছিল। যদি তারা ইরানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারত, তবে আফগানিস্তানের বাগরামে একটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বানিয়ে চীনের পশ্চিম সীমান্তে নজরদারি চালানো সহজ হতো। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর মার্কিন কৌশলগত যোদ্ধ সফল না হওয়ায়, এই অঞ্চলে চীনের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্থায়ী স্থলঘাঁটি নেই।
ফলে, ভারত মহাসাগরে চীনের সামুদ্রিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর নজর রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
একইভাবে, চীনের কাছেও বাংলাদেশ সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মহেশখালী এবং মোংলা বন্দর চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাব। (বিস্তারিত বিশ্লেষণ রয়েছে দৈনিক সমকালে প্রকাশিত আমার নিবন্ধ: “'নেক্সট ইলেভেন'-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বাংলাদেশ”-এ)।
পরাশক্তির চাপ সামলাতে বাংলাদেশ কতটুকু প্রস্তুত?
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত তীব্র হবে, বাংলাদেশের ভূকৌশলগত গুরুত্ব ও ঝুঁকি ততই বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি দুই পরাশক্তির সাথে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে?
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়" এই পররাষ্ট্রনীতি সফলভাবে অনুসরণ করে আসছে। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনীতিতে এই নিরপেক্ষতা বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। চীন যেখানে বাংলাদেশের সড়ক, সেতু ও বন্দরসহ অবকাঠামো খাতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক।
যেকোনো এক পক্ষকে অতিরিক্ত সুবিধা দিতে গেলে তা অন্য পক্ষকে ক্ষুব্ধ করবে। চীনের দিকে বেশি ঝুঁকলে মার্কিন ও ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হবে, আবার ওয়াশিংটনের বেশি কাছাকাছি গেলে চীনের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশের প্রয়োজন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী কূটনীতি। কারণ, পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আজ আর কেবল কোনো আঞ্চলিক ভূখণ্ড নয়, বরং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এক অন্যতম ‘গেম চেঞ্জার’।
মাত্র ২.৮ কিলো মিটার এই সংকীর্ণ জলপথটিই হতে পারে আগামী দিনের বৈশ্বিক সংঘাতের মূল উৎস। আর এর উত্তাপ যত বাড়বে, দক্ষিণ এশিয়ার জলসীমা তত বেশি বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হবে।
মো. বদরুল মিল্লাত ইবনে হান্নান সিপিএ অস্ট্রেলিয়ার একজন অ্যাসোসিয়েট (ASA) এবং কানাডার আইএফসি ইনকর্পোরেটেডের একজন সার্টিফাইড ফিন্যান্সিয়াল কনসালট্যান্ট (CFC)। তিনি একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকার এবং কৌশলগত বিশ্লেষক; যিনি মূলত ভূ-রাজনৈতিক অর্থনীতি, ব্রিকস (BRICS) বিশেষজ্ঞ এবং ফিনটেকের বিবর্তনীয় প্রেক্ষাপট নিয়ে কাজ করেন।
লেখক: ইমেইল: badrul01913@gmail.com
লিঙ্কডইন: md-badrul-millat-ibne-hannan-asa-cpa-aust