পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন

যেসব বিষয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বাংলাদেশকে

Printed Edition

এস এম মিন্টু

রেকর্ড সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিতে গতকাল প্রথম দফার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার নির্বাচন হয়েছে। আগামী ২৯ এপ্রিল শেষ হবে দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ। এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাবনায় ভৌগোলিক অবস্থান এবং অভিন্ন ইতিহাসের কারণে পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সরাসরি বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করে। পশ্চিমবঙ্গ একটি ভূরাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ, যেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আন্তঃসীমান্ত নদী, অভিবাসনের আখ্যান এবং সবচেয়ে জরুরি উদ্বেগ হলো তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির প্রধান বাধা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকারের আপত্তিকে দেখা হয়। নির্বাচনে যদি এমন কোনো সরকার আসে যারা কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সঙ্গতি রেখে কাজ করতে আগ্রহী, তবে এই জট খোলার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু বর্তমান অবস্থান বজায় থাকলে এই অমীমাংসিত ইস্যুটি সম্পর্কের টানাপড়েন আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

এ ছাড়াও সীমান্ত ইস্যু ও অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে এই নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘অবৈধ অভিবাসন’ ইস্যুকে কেন্দ্রীয় প্রচারণায় রাখায় এটি বাংলাদেশে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। বিএসএফের কঠোর অবস্থান বা সীমান্তে কড়াকড়ি বৃদ্ধির দাবিগুলো দুই দেশের বাণিজ্যিক এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বাংলাদেশকে : ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সময় যদি সীমান্ত বা অনুপ্রবেশ নিয়ে বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়, তবে এই চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক আলোচনার জায়গা সঙ্কুচিত হয়ে পড়তে পারে।

তিস্তা নদীকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর জন্য একটি ‘জীবনরেখা’ হিসেবে ব্যাপকভাবে গণ্য করা হয়- যা বাংলাদেশের প্রায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ জনসংখ্যার প্রধান অবলম্বন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পানি বণ্টন চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ২০১১ সালের ঢাকা সফরে একটি চূড়ান্ত চুক্তি হবে বলে আশা করা হয়েছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আপত্তি তোলায় শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে যায়। রাজ্যপর্যায়ের রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে- এমনকি বাধাও দিতে পারে বাংলাদেশকে।

২০১৫ সালে বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঢাকা সফর এবং সেই বছরের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তার প্রত্যাবর্তন প্রত্যাশা বাড়িয়েছিল, কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। এর ফলে আশাবাদ ও হতাশার একটি পুনরাবৃত্ত চক্র তৈরি হয়েছে, যা ঢাকায় একটি সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো শক্তিশালী করেছে। পশ্চিমবঙ্গের সাথে সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেয় না। তবে রাজনৈতিক ইঙ্গিত ধারাবাহিকভাবে উষ্ণই থেকেছে।

যোগাযোগ ও বাণিজ্য : দুই দেশের ভাষ্যমতে পশ্চিমবঙ্গ হলো বাংলাদেশের জন্য ভারতের প্রধান ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ বা স্থলসংযোগ। ট্রেন, বাস এবং জ্বালানি পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো এই রাজ্যের ওপর দিয়ে যায়। রাজ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা বৈরিতা সরাসরি এই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের ফলাফল যদি বিজেপির দিকে যায় তাহলে যোগাযোগ-বাণিজ্যের চাইতে বড় সমস্য তৈরি হবে দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে। কারণ ৯১ লাখ ভোটার পশ্চিমবঙ্গে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। এরচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, তারা ওই দেশে দীর্ঘদিন নাগরিত্ব নিয়ে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও তারা বর্তমানে অবৈধ নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে। আর এর প্রভাব পুরোটাই পড়বে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। অতীতের মতো প্রায় কোটি খানেক ভারতীয় নাগরিকতে অবৈধ বানিয়ে বাংলাদেশে পুশইন বা জোরপূর্বক ঠেলে দেয়ারও ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সীমান্ত বাণিজ্যের ওপরও একটি বড় প্রভাবের শঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট : বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের জন্য পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কূটনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে, যেখানে একটি মেরুকৃত বা শত্রুভাবাপন্ন রাজনৈতিক পরিবেশ দ্বিপক্ষীয় অবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল আগামী দিনে তিস্তা চুক্তি, গঙ্গা চুক্তির নবায়ন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো কতটা সহজ বা কঠিনভাবে সমাধান হবে তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি বাংলাদেশ। সম্প্রতি ভারত সফরে যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সেখানে বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী-এমপিদের সাথে বৈঠক হলেও তিস্তাচুক্তি পানি বণ্টনের কোনো আলোচনা গুরুত্ব পায়নি।

এ প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে দুই বাংলার যে সাম্প্রতিক সম্প্রীতি তা একটি ফলাফলেই বদলে দিতে পারে অনেক হিসাব-নিকাশ।

তিনি বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার হলেও, সেই ব্যবস্থাপনার ধরন, পদ্ধতি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রতিবেশী আস্থা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার- যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নদী ও জলাভূমি দ্বারা গঠিত। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তোলে এবং উভয় দেশের জন্যই নিরাপত্তা, চোরাচালান ও অবৈধ পারাপার একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পদ্ধতি যদি মানবিকতা ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার পরিপন্থী হয়, তাহলে তা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। এমনিই ভারতের নজর বাংলাদেশের ওপর। তারমধ্যে যদি কোনো কারণে পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল ভিন্নরূপ নেয় তাহলে এর প্রভাব শুধু দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরই নয়, সামগ্রীকভাবে সীমান্ত নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলবে।