শীতের ছুটি : কুলসুম বিবি
Printed Edition
আরাফ গাড়ি থেকে যখন দাদুর বাড়ির সামনে খালি জায়গায় নামল, ঠিক তখনই সূর্যের সোনালি রোদ উঁকি দিয়েছে পূর্ব দিক থেকে। কুয়াশার আড়ালে সূর্য যেন লুকোচুরি খেলছিল। দাদী আর দাদা আরাফের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আরাফ দৌড়ে গিয়ে তাদের জড়িয়ে ধরল। দাদীর কপালে চুমু খেয়ে বলল, কেমন আছো দাদী? দাদী, দাদা দুজনেই আবেগাপ্লুত হয়ে গেল আরাফকে কাছে পেয়ে। তারা আরাফকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগল।
সেই দিন দুপুরে দাদী রান্না করেছিলেন দেশী মুরগির ঝোল আর শাকভাজি। ভাতের সাথে গরম গরম সেই খাবার খেয়ে আরাফের মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার এটাই!
বিকেলবেলা আরাফ তার বাড়ির বন্ধু রতন আর সোহাগের সাথে দেখা করল। তারা মিলে বাড়ির পেছনের বড় পুকুরের দিকে গেল। পুকুরের পানি এত স্বচ্ছ যে, তলার শেওলা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। পুকুরপাড়ে বরই গাছের পাকা বরই দেখে তাদের জিভে পানি চলে এলো। তারা লম্বা বাঁশ দিয়ে বরই পেড়েছে। টক মিষ্টি স্বাদের বরই তিন বন্ধু মিলে অনেক মজা করে খেল। বরই খাওয়ার চেয়ে আরো বেশি আনন্দদায়ক ছিল তিন বন্ধুর একত্রে সময় কাটানো। বরই খেতে খেতে তিনজনে মিলে হাঁটতে লাগল গ্রামের পথ ধরে। পথের পাশে অনেক বড় বড় গাছ ছিল আরাফ সেগুলো দাঁড়িয়ে দেখে আবার হাঁটে। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটি পাখির বাসা। সে রতন ও সোহাগকে বলল, দেখো ওই যে গাছের ডালে কী দেখা যাচ্ছে।
রতন এবং সোহাগ একসাথে বলে উঠল, আরে এটা তো একটা পাখির বাসা। তিনজন সেই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল- কী করা যায়, হঠাৎ রতন বলে উঠল- আমি তো গাছে উঠতে পারি। তোমরা নিচে থাকো, আমি গিয়ে দেখে আসি পাখির বাসার ভেতরে কী আছে। এই বলে রতনে গাছে উঠে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে পাখির বাসা হাতে গাছ থেকে নামল। সোহাগ আর আরাফ তাড়াতাড়ি পাখির বাসা হাতে নিলো আর বলল, দেখি দেখি এর ভেতর কী আছে। তিনজনে মিলে দেখতে লাগল। দেখে পাখির বাসার ভেতর ছোট্ট দু’টি ছানা। এখনো চোখ ফোটেনি। আরাফ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। এর আগে কোনো দিন সে এমন পাখির বাসা ও ছানা দেখেনি। সে সোহাগ ও রতনকে জিজ্ঞেস করল, এখন ছানাগুলোকে কী করবে?
সোহাগ বলল, এরকম ছোট্ট ছানা আমরা বাড়িতে নিয়ে রাখতে পারব না। কারণ এগুলোর খাবার দরকার আর এই ছোট ছানাকে মা-পাখি ছাড়া আর কেউ খাওয়াতে পারে না। রতন বলল, হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। তাহলে আবার ছানাসহ বাসাটি গাছের ডালে রেখে আসি। এতে তিনজনই রাজি হলো, বাসাটি রেখে এলো আবার আগের জায়গায়। কিন্তু আরাফ পাখির ছানাগুলোকে ভুলতে পারছিল না, কারণ এরকম পাখির ছানা সে প্রথম দেখেছে। এই ঘটনা তার মনে দাগ কেটে গেছে। সে ভাবছে মা-পাখি ও ছানাগুলোর কথা। মা-পাখিটা ছানাদের কিভাবে খাবার খাওয়ায়, কতদিন পর ওদের পালক উঠবে। চোখ ফুটবে কখন, এরকম হাজার প্রশ্ন তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এগুলো নিয়ে কথা বলতে বলতেই তিনজনে বাড়িতে চলে এলো।
এভাবেই প্রতিদিন দাদার সাথে ঘুরতে যাওয়া, দাদীর হাতের মজার মজার খাবার খাওয়া, বন্ধুদের সাথে খেলতে যাওয়া, খুব আনন্দের সাথে দিনগুলো কেটে গেল আরাফের। ছুটি শেষ হয়ে এলো। ফিরে যাওয়ার দিনটা খুবই বেদনাদায়ক ছিল। দাদা-দাদীর চোখেও ছিল অশ্রু। আরাফ তাদের জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আবার খুব শিগগিরই আসব।’ দাদা-দাদী তোমরা মন খারাপ করো না। রতন আর সোহাগ ও এলো আরাফকে বিদায় জানাতে। তাদের জন্য আরাফের মন কাঁদছে। এই কদিনে তাদের সাথে অনেক ভালো সময় কাটিয়েছে সে। গাড়িতে উঠে পেছন ফিরে তাকাল আরাফ। দাদা-দাদী দাঁড়িয়ে আছে গেটে, হাত নাড়াচ্ছেন। দূরে মাঠ, পুকুর, সবুজ গাছপালা- সব কিছুর যেন মন খারাপ। তারা হাত নাড়িয়ে আরাফকে বলছিল। আবার এসো বন্ধু।