মিনিকেট-জিরাশাইল বিতর্কে বিভ্রান্ত বাজার, উপেক্ষিত ভোক্তার অধিকার

বৃহৎ অটো রাইস মিল মালিকদের চাপে নতি স্বীকার

শাহ আলম নূর
Printed Edition

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের (ডিএনসিআরপি) সিদ্ধান্তে বাধা সৃষ্টি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চলতি মাসের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে বাজার থেকে ‘মিনিকেট’ ও ‘জিরাশাইল’ নামে চাল বাজারজাত বন্ধের নির্দেশনা কার্যকর করতে না পারায় প্রশ্ন উঠেছে ভোক্তা অধিদফতরের এখতিয়ার ও ক্ষমতা নিয়ে। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ- বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের বৃহৎ চালকল মালিকদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে।

১৩ জুলাই ডিএনসিআরপির মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মিল মালিক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, বাজারে মিনিকেট বা জিরাশাইল নামে কোনো চাল বিক্রি করা যাবে না, কারণ এগুলো প্রকৃত জাত নয়। ২০ জুলাই ভোক্তা অধিদফতর এ নিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। কিন্তু ঠিক পরদিন, ২১ জুলাই বাংলাদেশ রাইস ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানায়।

চালকল মালিকদের অভিযোগ- মিনিকেট ও জিরাশাইল নামে ধান কৃষকদের কাছে প্রায় ৫০ লাখ টন মজুদ রয়েছে। সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে মিল মালিকরা কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় বন্ধ করবে, যার ফলে কৃষকরা বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। একই সাথে খাদ্য ঘাটতির শঙ্কাও তুলে ধরেছে মিলমালিকরা। তাদের পক্ষে মেঘনা গ্রুপ, এসিআই, প্রাণ, সাদমান অ্যাগ্রোসহ শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো লিখিতভাবে নিজেদের অবস্থান জানায়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) আব্দুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভোক্তা অধিদফতরের এমন নির্দেশনা জারির এখতিয়ার নেই। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তসাপেক্ষ।’ খাদ্য মন্ত্রণালয়ও এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মত দেয়।

তবে ভোক্তা অধিদফতর জানায়, ‘মিনিকেট’ বা ‘জিরাশাইল’ নামে সরকারিভাবে কোনো ধানের জাত নেই। সাধারণত বিআরআরআই-২৮ জাতের ধান অতিরিক্ত পালিশ করে চিকন ও সাদা করা হয় এবং তা বিভ্রান্তিকর নামে বাজারজাত করা হয়, যা খাদ্য অপচয় এবং প্রতারণা-দু’টিই। ২০২৪ সালের খাদ্য বিধিমালার ৩(ক) ধারা অনুযায়ী, এ ধরনের বিভ্রান্তিকর কার্যক্রম দণ্ডনীয়।

এসিআই, মেঘনা ও আকিজের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, এই চালের প্রকৃত জাত মিনিকেট বা জিরাশাইল নয়। জনপ্রিয়তা ও বাজারের চাহিদার কারণেই এই নামগুলো ব্যবহার করা হয়। ভোক্তারা যেহেতু এ নামেই চিনি, তাই বিপণনের সুবিধার্থে তা চালু রাখা হয়েছে বলেও তারা যুক্তি দেন।

কৃষি বিপণন অধিদফতরের (ডিএএম) ২০২৩ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, অতিরিক্ত পালিশের কারণে বছরে প্রায় ৫.১৭ লাখ টন চাল অপচয় হয়, যা দেশের বার্ষিক উৎপাদনের প্রায় ১.২৯%। অথচ এর পরও প্রতি বছর ১০-১৫ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অপচয় ও বিভ্রান্তিকর বিপণন বন্ধে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং বাণিজ্য ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। অন্যথায়, এক দিকে যেমন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্য দিকে খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে।

ভোক্তা অধিদফতর, কৃষক ও মিল মালিকদের মধ্যে দ্বন্দ্বের দ্রুত সমাধান না হলে বাজারে নৈরাজ্য ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে- এটা কি ভোক্তার অধিকার নাকি মিল মালিকদের প্রভাবের বিজয়?