সারা দেশে জ্বালানি তেলের হাহাকার মজুদদারির দায়ে জেল-জরিমানা

নীলফামারীতে তেল চুরির অভিযোগে ৩ জনকে ৬ মাসের কারাদণ্ড

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কট ও কৃত্রিম অভাব তৈরির অপচেষ্টায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অসাধু সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে চারজনকে কারাদণ্ড এবং কয়েক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তেল না পেয়ে কোথাও কোথাও সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। সঙ্কটের সুযোগে গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে সক্রিয় রয়েছে।

ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ফুলপুরে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুদ করার দায়ে ‘মেসার্স পপি ট্রেডার্স’ নামের একটি মিনি ফিলিং স্টেশনকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গত শনিবার দুপুরে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ১৯ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল ও ৪ হাজার ৫০০ লিটার পেট্রোল জব্দ করে। ইউএনও সাদিয়া ইসলাম সীমা জানান, বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই প্রায় এক মাস ধরে তেল মজুদ করে পাম্পটি বন্ধ রাখা হয়েছিল, যা বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে। জব্দকৃত তেল জনস্বার্থে সচল পাম্পগুলোর মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।

নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, তেলের লরি থেকে অবৈধভাবে তেল চুরি করে বোতলজাত করার সময় তিনজনকে আটক করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। গত শনিবার সন্ধ্যায় মশিউর রহমান ডিগ্রি কলেজ সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে লরির ড্রাইভার, হেল্পার ও ম্যানেজারকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই সাথে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে সহকারী কমিশনার নিয়াজ ভুঁইয়া এই আদেশ প্রদান করেন। পুলিশ জানায়, আসামিরা লরি থেকে গোপনে তেল চুরি করে বিক্রির চেষ্টা করছিল। দণ্ডপ্রাপ্তদের রাতেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, পাম্পে মজুদ থাকলেও তেল দেয়া হচ্ছে না; এমন অভিযোগে লস্কর পেট্রোল পাম্পের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহকরা। গত শুক্রবার রাতে বিক্ষুব্ধ জনতা টায়ার ও বাঁশ ফেলে আগুন জ্বালিয়ে প্রধান সড়ক বন্ধ করে দেয়। এতে প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। গ্রাহকদের অভিযোগ, পাম্প মালিকরা সিন্ডিকেট করে তেল সরিয়ে রাখছেন এবং চড়া দামে খোলা বাজারে বিক্রি করছেন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ওসি মাসুদুর রহমান জানান, মজুদদারির প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর আগেও একই দাবিতে কপোতাক্ষ ফিলিং স্টেশনের সামনে বিক্ষোভ হয়েছিল।

দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, বীরগঞ্জে অবৈধভাবে অকটেন ও ডিজেল মজুদ করে চড়া দামে বিক্রির দায়ে পরিতোষ রায় নামের এক ব্যক্তিকে সাত দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। শনিবার ধনগাঁও বাজার এলাকায় তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৩৫০ লিটার ডিজেল ও ৩০ লিটার অকটেন উদ্ধার করে প্রশাসন। অবৈধ মজুদের দায়ে তাকে পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ডও করা হয়। জব্দকৃত তেল সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বাজারে তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং কালোবাজারি রুখতে জনস্বার্থে এ ধরনের ঝটিকা অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হবে।

মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় তেলের তীব্র সঙ্কটে অধিকাংশ পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। গত শনিবার সকাল থেকে উপজেলার ডজনখানেক পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও সরবরাহ নেই অথবা সীমিত আকারে দেয়া হচ্ছে। এতে মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান আটকে পড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো পাম্পে নামমাত্র তেল দেয়া হলেও অধিকাংশ গ্রাহক খালি হাতে ফিরছেন। পাম্প মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে তেল না আসায় তারা বিক্রি করতে পারছেন না। তবে সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে তাদের জিম্মি করা হচ্ছে। তেলের অভাবে থমকে গেছে উপজেলার পরিবহন ব্যবস্থা।

কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কর্ণফুলীতে তেলের সঙ্কটের অজুহাত দেখিয়ে সিএনজি অটোরিকশাগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করছে। আনোয়ারা থেকে চাতরী চৌমুহনী পর্যন্ত ১০০ টাকার ভাড়া নেয়া হচ্ছে ২০০ টাকা। শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত ৪০ টাকার ভাড়া পৌঁছেছে ৮০ টাকায়। গ্যাসচালিত গাড়ি হওয়া সত্ত্বেও তেলের সঙ্কটের দোহাই দিয়ে এই অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ায় যাত্রী ও চালকদের মধ্যে প্রতিনিয়ত বাগি¦তণ্ডা চলছে। পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে এবং প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে কঠোর তদারকি চালানো হবে।

গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, গোবিন্দগঞ্জে অবৈধভাবে তেল মজুদের দায়ে দুই ব্যবসায়ীকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত শনিবার রাতে কামদিয়া বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৫০ লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়। মুদি ব্যবসায়ী আলম মিয়াকে ১০ হাজার এবং মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সে তেল বিক্রির দায়ে ‘আশা এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক বাদশা মিয়াকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ইউএনও সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানার নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন ম্যাজিস্ট্রেট তামশিদ ইরাম খান। প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে, তেলের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে বাজার অস্থিতিশীল করার কোনো সুযোগ দেয়া হবে না।

গাংনী (মেহেরপুর) সংবাদদাতা জানান, গাংনীতে তেলের সঙ্কটকে কেন্দ্র করে পাম্পগুলোতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। কোথাও কোথাও বাগি¦তণ্ডা গড়াচ্ছে হাতাহাতিতে। বাঁশবাড়িয়া ফিলিং স্টেশনে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গোপাল চন্দ্র নামের এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ ছাড়া মালিক পক্ষের হাতে এক রাজনৈতিক নেতা প্রহৃত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নেমেছেন স্থানীয় এমপি, জেলা প্রশাসক ও সেনাবাহিনী। সংসদ সদস্য নাজমুল হুদা বিভিন্ন পাম্প পরিদর্শন করে সাধারণ মানুষকে ধৈর্য ধরার এবং সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

নালিতাবাড়ী (শেরপুর) সংবাদদাতা জানান, নালিতাবাড়ীতে তেলের তীব্র সঙ্কটে গত তিন দিন ধরে একমাত্র ফিলিং স্টেশনসহ সব দোকান বন্ধ রয়েছে। উপজেলার ‘হাজী সাইজ উদ্দিন ফিলিং স্টেশন’ কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৬ মার্চ থেকে তাদের মজুদ শেষ হয়ে গেছে। ডিপু থেকে সামান্য বরাদ্দ পাওয়া গেলেও তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। তেল না পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ভাড়াটে মোটরসাইকেল চালক ও শিক্ষকরা। এ দিকে গ্রামগঞ্জের ছোট দোকানগুলোতে নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারে ৭০-৮০ টাকা বেশি নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইউএনও রেজওয়ানা আফরিন জানান, বরাদ্দ পাওয়া গেছে এবং দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে।

ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ সদরের একটি পাম্পে জ্বালানি তেলের জন্য মোটরসাইকেল চালকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তীব্র তাপদাহ আর দীর্ঘ অপেক্ষায় নাজেহাল সাধারণ মানুষ। একদিকে তেলের সঙ্কট, অন্য দিকে শৃঙ্খলার অভাবে মহাসড়কের এই অংশে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট, যা মহাসড়কে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে।