চুন-সুরকির গাঁথুনিতে আড়াই শ’ বছরের খানবাড়ি মসজিদ

Printed Edition
bangla-3
চুন-সুরকির গাঁথুনিতে আড়াই শ’ বছরের খানবাড়ি মসজিদ

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ

সময়ের স্রোত বদলায়, বদলায় মানুষের জীবনযাপন ও স্থাপত্যের ধরন। কিন্তু ইতিহাসের কিছু নিদর্শন নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে অতীতের সাক্ষী হয়ে। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার জোরবাড়িয়া গ্রামের খানবাড়ি মসজিদ তেমনই একটি স্থাপনা, যা প্রায় আড়াই শ’ বছর ধরে স্থানীয় ইতিহাস, ধর্মীয় চর্চা ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে টিকে আছে।

উপজেলার সদর ইউনিয়নের জোরবাড়িয়া গ্রামের পূর্বভাটিপাড়া এলাকায় অবস্থিত এই এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে ‘খানবাড়ি মসজিদ’ নামে পরিচিত। চার পাশে সবুজ প্রকৃতি, পুকুর ও গ্রামীণ পরিবেশের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটি যেন অতীত সময়ের এক নীরব দলিল।

স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১২০০ হিজরি সালে তৎকালীন প্রভাবশালী ও দানবীর ব্যক্তি হায়াত খান মসজিদটি নির্মাণ করেন। সে সময় দেশে সিমেন্টের ব্যবহার ছিল না। ফলে চুন-সুরকি ও ইট দিয়ে নির্মিত এই মসজিদের দেয়াল প্রায় ৪০ ইঞ্চি পুরু করে তৈরি করা হয়। চৌকো কাঠামোর ওপর নির্মিত ছাদের মাঝখানে রয়েছে একটি বড় গম্বুজ, আর চার কোণে স্থাপিত পিলারগুলোতে রয়েছে কলসি আকৃতির কারুকাজ। ভেতর ও বাইরের দেয়ালে সূক্ষ্ম অলঙ্করণ এখনো দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

মসজিদের সামনে রয়েছে শানবাঁধানো ঘাটসহ প্রায় এক একর আয়তনের একটি পুকুর। শান্ত পানিতে মসজিদের গম্বুজের প্রতিচ্ছবি যেন অতীত ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে। মসজিদের পেছনেও রয়েছে আরেকটি পুকুর এবং আশপাশে রয়েছে কবরস্থান, যা স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সাথে মসজিদটির গভীর সম্পর্কের সাক্ষ্য দেয়।

জনশ্রুতি আছে, মসজিদ নির্মাণের সময় দক্ষ কারিগর বিদেশ, বিশেষ করে ফ্রান্স থেকে আনা হয়েছিল। যদিও এর সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবু স্থানীয় মানুষের কাছে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী গল্প হিসেবে প্রচলিত রয়েছে।

মসজিদের পাশেই রয়েছে ‘বিবিঘর’ নামে পরিচিত একটি ঘর। একসময় মানুষ অসুস্থতা থেকে মুক্তির আশায় এখানে মানত করতেন। জুমার নামাজ শেষে সেই মানতের শিরনি মুসল্লিদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। তবে আধুনিক সময়ের পরিবর্তনে এই প্রথা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম খান জানান, প্রতিষ্ঠাতা হায়াত খান মৃত্যুর আগে মসজিদের জন্য প্রায় সাত একর জমি দান করে গেছেন। সেই জমির আয় থেকেই বর্তমানে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা দেয়া হয় এবং মসজিদের রণাবেণ করা হয়।

প্রকৌশলীদের মতে, চুন-সুরকির শক্ত গাঁথুনি ও মজবুত নির্মাণশৈলীর কারণে মসজিদটি এখনো দৃঢ়ভাবে টিকে আছে এবং যথাযথ পরিচর্যা করলে ভবিষ্যতেও দীর্ঘদিন স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, আড়াই শ’ বছরের ইতিহাস বহনকারী এই প্রাচীন মসজিদটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয় বরং একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক নিদর্শন। যথাযথ সংরণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে এটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব।