নেশার আড়ালে ঢাকা পড়ে মানবিক সত্তা

রাজধানীর পথশিশুদের বিবর্ণ জীবন

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

সাত বছরের শিশু তাহসিন রমনা কালীমন্দিরের সামনে ফুল বিক্রি করে। তার বাবার জন্ম কামরাঙ্গীরচরের এক খুপরিতে; তাহসিনের জন্মও একটি বস্তি ঘরে। বর্ণমালার সাথে তার কোনো পরিচয় নেই, সে জানে শুধু রজনীগন্ধার ঘ্রাণ আর খদ্দেরের পিছু নেয়া। অন্য দিকে, ১২ বছরের ওহাবের দিন কাটে গুলিস্তান স্টেডিয়াম এলাকায় জুতোর আঠা বা ‘ডেন্ডি’র নেশায় বুদ হয়ে। ওহাবের ভাষায়, ‘তিন-চার দিন না খাইয়া থাকলেও নেশার ঝাজে ক্ষুধা লাগে না।’ এ তাহসিন বা ওহাবরা কোনো বিচ্ছিন্ন গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান এক মানবিক সঙ্কটের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধায় বন্দী শৈশব

বাংলাদেশে পথশিশুর সঠিক সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যে বিশাল ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। ইউনিসেফের ‘চিলড্রেন ইন স্ট্রিট সিচুয়েশনস ইন বাংলাদেশ ২০২৪’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩৪ লাখেরও বেশি পথশিশু মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (ইইঝ) এবং ইউনিসেফের ‘পথশিশু জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী ৫-১৭ বছর বয়সী পথশিশুর সংখ্যা ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ জন।

ঢাকার পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। বিবিএস-এর মতে, দেশের মোট পথশিশুর প্রায় ৪৮.৫% ঢাকা বিভাগে অবস্থান করছে। ইউনিসেফের ২০২৪-২৫ সালের পর্যবেক্ষণ বলছে, শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরীতেই প্রায় চার লাখ ৫০০ জন শিশু খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। এদের মধ্যে ৩০.১% সরাসরি ফুটপাতে ঘুমায় এবং ৮২% শিশুর জন্য নেই কোনো বিছানা বা মশারি।

মাদকাসক্তি : যখন নেশাই একমাত্র আহার

পথশিশুদের মাদকাসক্ত হওয়া এখন এক মহামারি। সেভ দ্য চিলড্রেন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য মতে, ঢাকার প্রায় ৪৪% থেকে ৫০% পথশিশু কোনো না কোনোভাবে মাদকের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো ‘ডেন্ডি’ বা জুতো মেরামতের আঠা।

ইউনিসেফ ও সেভ দ্য চিলড্রেনের গবেষণায় উঠে এসেছে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার তীব্র যন্ত্রণা ভুলে থাকতে তারা সস্তা ‘ডেন্ডি’ ব্যবহার করে, যা তাদের স্নায়ুকে অবশ করে দেয়। যার ফলে ক্ষুধার যন্ত্রণা ভুলে থাকা সম্ভব হয়।

পারিবারিক বিচ্ছেদ বা নির্যাতনের ট্রমা থেকে মুক্তি পেতে তারা নেশার পথে পা বাড়ায়। হার্ডওয়্যারের দোকানে খুব সস্তায় আঠা পাওয়া যাওয়ায় এটি তাদের প্রধান নেশায় পরিণত হয়েছে।

সহিংসতা ও নির্যাতনের করুণ বাস্তবতা

পথশিশুরা প্রতিনিয়ত শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিবিএস ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ বলছে, প্রায় ৮২.৯% পথশিশু পথচারী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কোনো না কোনোভাবে হেনস্তার শিকার হয়। মেয়ে শিশুদের অবস্থা আরো শোচনীয়। ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ (গঔঋ), আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (অঝক) মতে, পথশিশুদের প্রায় ১৪.৫% নিয়মিত যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হয়। সামাজিক লোকলজ্জা এবং আইনি পরিচয়ের অভাবে এ অপরাধগুলোর বিচার হয় না বললেই চলে।

ক্ষুধার চেয়ে নেশা সস্তা

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খেলনা বিক্রেতা কিশোর সোহাগ (১৭) ও জুনায়েদ (৯) জানায়, তাদের পৈতৃক নিবাস কিশোরগঞ্জ। মা ও বোনের চিকিৎসার পেছনে ৯ লাখ টাকা খরচ করে তাদের পরিবার এখন ঋণে জর্জরিত হয়ে বস্তিবাসী।

কমলাপুর স্টেশনের কিশোরী তানজিলার বক্তব্য বুক কাঁপিয়ে দেয়ার মতো। তানজিলা এক কিশোরী। হাতে জুতার গামের ঠোঙা (ডেন্ডি)। খেঁঁঁাঁজখবর নিয়ে বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়নি। মা-বাবার সন্ধান সে জানে না। দূর সম্পর্কে এটা এক নানির সাথে ঢাকায় এসেছে। তার ভাষ্য মতে, ছয় বছর বয়সে সে নানিকে হঠাৎ করে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর পর থেকে কমলাপুর স্টেশনের আশপাশে থাকতো। পুলিশ ও রক্ষাকারী বাহিনী ধাওয়ায় পড়েছেন তিনি। চড়থাপ্পড় খাওয়া ছিল প্রতিদিনের রুটিন। কাগজ প্লাস্টিক বস্তায় ঢুকিয়ে বিক্রি করে জুতার গাম কিনে; কিন্তু খাবারের চিন্তা করে না। তাকে প্রশ্ন করলাম ক্ষুধা লাগে না? সে উত্তর দিলো ডেন্ডি খাওয়ার পরে ক্ষুধা কম থাকে। প্রতিদিনের খাবারের চাইতে ডেন্ডি অনেক কম টাকায় পাওয়া যায়।

একই চিত্র গুলিস্তান গোলাপশাহ মাজারের পাশে। সেখানে আঠা নিয়ে বসে থাকা একদল কিশোরের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের অধিকাংশেরই মস্তিস্ক নেশার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের লক্ষ্য একটাই কখন মাদক শেষ হবে আর কখন তারা নতুন করে তা সংগ্রহ করবে।

সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার : কাগজ-কলমে সুরক্ষা

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, শিশুদের অনগ্রসর অংশ হিসেবে রাষ্ট্র তাদের জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে বাধ্য। এ ছাড়া ‘শিশু আইন, ২০১৩’-এর ধারা ৮৯ ও ৫৩ অনুযায়ী পথশিশুদের অপরাধী নয়; বরং ‘সুরক্ষার প্রয়োজন’- এমন শিশু হিসেবে গণ্য করতে হবে। অথচ বাস্তবে জন্মনিবন্ধন না থাকায় তারা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ‘ঘুরে বেড়ানো ও আশ্রয়হীন ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন, ২০১১’ অনেক সময় শিশুদের সুরক্ষার বদলে আটকের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা শিশু আইনের সাথে সাংঘর্ষিক।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ফড়িং’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও এর আশপাশে ফুল বিক্রেতা, টোকাই বা ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত শিশুদের অবর্ণনীয় জীবন দেখে সাকিব ও তার একদল উদ্যমী সহপাঠী এ উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

সাকিবের ভাষ্যমতে, দল-মতের ঊর্ধ্বে ওঠে পথশিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। ভবিষ্যতে তারা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘পাবলিক ফান্ডিং’ ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছেন। সাকিব বলেন, ‘রাষ্ট্র যখন মৌলিক অধিকার দিতে ব্যর্থ হয়, তখন এটি কেবল আইনি প্রশ্ন থাকে না, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা সেই ঘাটতি পূরণে সামান্য আলো জ্বালানোর চেষ্টা করছি মাত্র।’