কাচঘেরা শপিংমলে ঈদ : মামুন সরকার

Printed Edition
agdum-1
কাচঘেরা শপিংমলে ঈদ : মামুন সরকার

শপিংমলে কাচের দেয়াল ঘেঁষে থরে থরে সাজানো ডামি পুতুলগুলো যেন জীবন্ত। কারো গায়ে ঝলমলে লেহেঙ্গা, কারো গায়ে নরম রঙের পোশাক, কারো হাতে কাচের চুড়ি। লাইটের ঝলকানিতে তারা যেন ঈদের আগাম হাসি ছড়িয়ে দিচ্ছে।

সেই স্বপ্নগুলোর সামনে প্রতিদিন এসে দাঁড়ায় এক কিশোরী। কাচের দেয়ালের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন সে ডামি পুতুলে সাজানো ঝলমলে পোশাকগুলো দেখে। বয়স তেরো কি চৌদ্দ। চেহারা মলিন, গায়ে একটি ছেঁড়া ফ্রক। চুলগুলো এলোমেলো, তবু চোখদুটো আশ্চর্য রকমের উজ্জ্বল।

বস্তির সরু গলির ঘর থেকে হাঁটতে হাঁটতে সে শহরের বড় শপিংমলের সামনে এসে দাঁড়ায়। অপলক তাকিয়ে থাকে কাচের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ডামি পুতুলের গায়ে গোলাপি পোশাকের দিকে। হাতায় সাদা লেস, গলায় ঝলমলে ছোট ছোট পাথর আর ফুলের কাজ। লাইটের আলোয় পোশাকটা ঝিকমিক করছে। কিশোরী চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখে ঘুরেফিরে ওই একটি পোশাকই ভালো লাগে।

মনে মনে ভাবে, এই পিরানডা যদি আমি কিনতে পারতাম! ঈদের দিনে একবার পরতে পারতাম!

প্রথম দিন সে শুধু দেখেছিল। দ্বিতীয় দিন এসে দাম জিজ্ঞেস করেছিল। একজন সেলসম্যান অবহেলার চোখে তাকিয়ে বলেছিল, এইটা? চার হাজার ৫০০ টাকা। সংখ্যাটা শুনে কিশোরীর বুক কেঁপে উঠেছিল।

চার হাজার ৫০০! তার কাছে তখন ছিল মাত্র এক হাজার কুড়ি টাকা। যা সে রোজার প্রথম কয়েক দিন জমিয়েছে।

তবু সে হাল ছাড়েনি। পছন্দের পোশাকটা কিনতেই হবে। সমস্যা এতগুলো টাকা সে কোথায় পাবে। রোজার মাসজুড়ে মানুষের কাছে চেয়ে যা পায়, তা থেকে সামান্য করে সরিয়ে রাখে। ইফতারে যা পায়, তার অর্ধেক খায়, অর্ধেক রেখে দেয় ছোট ভাইয়ের জন্য। আর কয়েনগুলো জমায় ওড়নার আঁচলে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে এসে দাঁড়ায় কাচের দেয়ালের সামনে। কখনো চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। কখনো ওড়নার আঁচল খুলে হিসাব করে- দুই হাজার ৭০০, আর কত লাগব? এক সপ্তাহ ধরে বিষয়টি ম্যানেজারের চোখে পড়ে।

তিনি মাঝেমধ্যে অফিস ঘরের কাচের জানালা দিয়ে দেখেন। মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। কখনো চোখ মুছছে, কখনো টাকাগুলো গুনছে। একদিন তিনি মালিককে বললেন, স্যার, ওই মেয়েটিকে খেয়াল করেছেন? প্রায় প্রতিদিন আসে। মালিক দূর থেকে কয়েক দিন লক্ষ করলেন। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটি মায়া অনুভব করলেন।

ঈদের দুদিন আগে। শপিংমলে ভিড় উপচে পড়ছে। হঠাৎ কিশোরী সাহস সঞ্চয় করে কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সে সরাসরি গিয়ে পছন্দের গোলপি পোশাকটির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে কাপড়টা ছুঁয়ে দেখে। আঙুলে যেন ফুলের নরম স্পর্শ লেগে থাকে। এক সেলসম্যান এগিয়ে এসে কড়া গলায় বলে- এই এই! কী করো? এইটা ধরার জিনিস না। বাইরে যাও। এটা দাম অনেক। তোমার মতো মেয়েরা এটা কিনতে পারবে না।

সে প্রায় জোর করেই মেয়েটিকে সরাতে চায়। কিশোরী হঠাৎ গলা তুলে বলে ওঠে, আমারে দেইখা কী কাস্টমার মনে হয় না? পোশাকটা আমি কিনমু। তার কণ্ঠে কাঁপন আছে; কিন্তু চোখে দৃঢ়তা। পাশের কাস্টমাররা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কারো চোখে কৌতূহল, কারো চোখে বিরক্তি, আবার কারো চোখে মায়া।

সেলসম্যান ঠোঁট বাঁকায়, এটার দাম কত জানো?

কিশোরী বুক সোজা করে দাঁড়ায়, জানি। চার হাজার ৫০০।

তার কণ্ঠে লজ্জা নেই, আছে দৃঢ়তা।

দূর থেকে সব দেখছিলেন মালিক। তিনি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসেন, তার চোখে মায়া। মেয়েটির মাথায় হাত রেখে কোমল স্বরে বললেন, মা, তোমার কি পোশাকটা খুব পছন্দ?

মেয়েটি ফ্যাল ফ্যাল চোখে মালিকের দিকে তাকিয়ে বলল, হ, খুব পছন্দ।

এটার দাম তো অনেক মা।

আমি জানি। আমি রোজার মাস ধইরা পছন্দের এই পিরানডা কিনমু বইলা টাকা জমাইছি।

তার কণ্ঠে গর্ব। যেন সে কোনো যুদ্ধ জিততে চলেছে।

মালিক বিস্ময়ে তাকিয়ে জানতে চান, তা কত টাকা জমিয়েছ মা?

কিশোরী ওড়নার আঁচল খুলে সব কয়েন আর কুঁচকানো নোট মালিকের হাতে তুলে দেয়। হাত কাঁপছে, তবু চোখে আশার আলো।

মালিক টাকাগুলো না গুনেই সেলসম্যানকে বলেন, পোশাকটা প্যাকেট করে দাও।

কিশোরী তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, প্যাকেট করন লাগব না। আমি এখনি পরমু।

চারপাশে চাপা হাসি।

কিন্তু সেই হাসির ভেতর এবার আর তাচ্ছিল্য নেই, আছে মুগ্ধতা। ট্রায়াল রুমে গিয়ে যখন সে পোশাকটা পরে বের হয়, তখন যেন পুরো শপিংমল থমকে যায়। মলিন মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক আলোকিত কিশোরী।

আয়নার সামনে ঘুরে ঘুরে নিজেকে দেখে। চোখে-মুখে এক অনাবিল সুখের রশ্মি। মনে হয়, ঈদ যেন এখনই এসে গেছে।

মালিক মৃদু হেসে বলেন, মা, পোশাকটা তোমাকে খুব সুন্দর মানিয়েছে।

কিশোরী লজ্জা পেয়ে বলে, স্যার, টাকাটা গুইনা দেখেন, ঠিক আছে কি না।

মালিক টাকাগুলো তার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলেন, মা, জামাটা আমি তোমাকে গিফট দিলাম।

শব্দটা যেন কিশোরীর কানে ঠিকমতো পৌঁছায় না।

সে প্রথমে বোঝে না। তারপর যখন বোঝে, তার চোখ বড় হয়ে যায়। ঠোঁট কাঁপতে থাকে। চোখের কোণে জল জমে। সে টাকাগুলো শক্ত করে চেপে ধরে বলে, গিফট-মানে? আমার কোনু টাকা দেওন লাগব না?

মালিক মায়া ভরা কণ্ঠে বলেন, না। একদম না। এইটা তোমার ঈদের উপহার। তোমার স্বপ্নের দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না মা। কিশোরীর চোখ বেয়ে টুপটাপ পানি গড়িয়ে পড়ে।

সে হঠাৎ ঝুঁকে মালিকের পা ছুঁতে যায়। মালিক তাড়াতাড়ি তাকে তুলে ধরেন, না মা, মাথা উঁচু করে দাঁড়াও। ঈদ মানে আনন্দ ভাগাভাগি করা।

চারপাশের কাস্টমারদের ভেতর অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। একজন মধ্যবয়সী মহিলা নিজের কেনা শাড়ির প্যাকেট থেকে একটা চুড়ির সেট বের করে কিশোরীর হাতে দিয়ে বলেন, এইটা তোমার জন্য।

একজন তরুণ বলে ওঠে, স্যার, এমন মানুষের জন্যই তো ব্যবসায় করা সার্থক।

সেই সেলসম্যান, যে একটু আগে তাকে বের করে দিতে চেয়েছিল, লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকে।

সে ধীরে ধীরে বলে, মাফ করবেন, ছোট আপা-

কিশোরী মৃদু হেসে বলে, ঈদের মইধ্যে কোনো ভুল নাই। কিশোরী আয়নার সামনে শেষবারের মতো নিজেকে দেখে। তার চোখে এখন শুধু নিজের প্রতিবিম্ব নয়, দেখা যায় সম্মান, স্বীকৃতি আর ভালোবাসা।

কাচের দেয়ালের ওপারে যে মেয়েটি প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকত, আজ সে কাচের ভেতরে দাঁড়িয়ে।

আর তার হাসি কাচ ভেদ করে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে।

ঈদের দিন সকালে বস্তির সরু গলিতে যখন সে শখের গোলাপি জামাটা পরে বের হয়, ছোট ভাই বিস্ময়ে বলে, বুবু, তুমারে পরীর লাহান পুতুল পুতুল লাগতাছে।

কিশোরী মৃদু হেসে আকাশের দিকে তাকায়। মনে মনে ভাবে, ঈদ শুধু নতুন জামা নয়, ঈদ হলো মানুষের মনের দরজা খুলে দেয়া। স্বপ্ন কখনো ছোট হয় না। ছোট হয় শুধু মানুষের দৃষ্টি। আর সেই দিন থেকে শপিংমলের মালিক প্রতি ঈদে কাচের দেয়ালের বাইরে বারবার তাকিয়ে দেখেন, কোথাও কোনো কিশোরী দাঁড়িয়ে আছে কি না।