যুবদলের কিবরিয়া হত্যায় আরো ২ জন গ্রেফতার
চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বাধা হওয়ায় হত্যাকাণ্ড
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর রহমান মশির চাঁদাবাজি, ঝুটব্যবসার নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পল্লবীর যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া। এ ছাড়া জনপ্রিয় হওয়ায় তিনি বিএনপির বড় কোনো পদে চলে গেলে এসব অপকর্মে আরো বাধা দিতে পারেন বলেই পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়। পুরো হত্যাকাণ্ডে ছয় থেকে সাতজনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে শুটার হিসেবে কাজ করেছে তিনজন। যার মধ্যে জনি নামে একজন আগেই গ্রেফতার হয়েছে। বাকি দু’জন মো: রাশেদ ওরফে লোপন (৩৫) এবং মো: জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে কাল্লুকে (৪০) গ্রেফতার করেছেন র্যাব-৪ এর সদস্যরা।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মিরপুর র্যাব-৪ এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব-৪ এর কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: শাহাবুদ্দিন কবির। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে বিদেশী রিভলবার ও কয়েক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
মো: শাহাবুদ্দিন কবির বলেন, কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী এই দুই শুটার ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর তারা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ওসমান হাদি হত্যার পর সীমান্তে কড়াকড়ি শুরু হলে তারা অবৈধ পথে দেশ অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়। নির্বাচন -পরবর্তী সময় কিছুটা স্থিরতা এলে তারা ঢাকায় ফিরে এসে বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পাসপোর্ট, ভিসা- এগুলো তৈরির কাজ শুরু করে। এমন কিছু গোয়েন্দা তথ্যের বিভিন্ন কাজ শুরু করে র্যাব-৪ এর একাধিক টিম।
অবশেষে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মিরপুরের রূপনগর ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো: রাশেদ ওরফে লোপনকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে মো: জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে কাল্লুকে গ্রেফতার করে। লোপনের দেয়া তথ্যমতে, তার বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রিভলবার ও তিন রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়।
গ্রেফতার আসামিরা এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়ার কথা স্বীকার করেছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, গ্রেফতার লোপনের কাছ থেকে পাওয়া রিভলভারের চেম্বারে ছয়টি গুলি থাকার কথা। কিন্তু পাওয়া গেছে তিনটি কেন জানতে চাইলে লোপন জানিয়েছে, ঘটনার সময় গোলাম কিবরিয়াকে সে দুই রাউন্ড গুলি করেছিল, বাকি এক রাউন্ড আতঙ্ক সৃষ্টি করতে ফাঁকা গুলি করেছিল।
শাহাবউদ্দিন কবির বলেন, কিলিং মিশনে সরাসরি শুট করার জন্য ছিল তিনজন শুটার। একজন শুটার জনি, সে আগেই ধরা পড়েছে। তাদের অস্ত্র দেয়া এবং নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার জন্য রেসকিউ টিমে ছিল ভাগিনা মাসুম। অস্ত্রগুলো সরবরাহ করা এবং সার্বিক নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বে ছিল পাতা সোহেল। আর নিহত গোলাম কিবরিয়ার গতিবিধি নজরদারি করার কাজে নিযুক্ত ছিল সুজন। তো সার্বিকভাবে দেখা যায়, এই কিলিং মিশনে ছয় থেকে সাতজন জড়িত ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে বলেন, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে স্বীকারোক্তি, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের কাছ থেকে পাওয়া ডিভাইসগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আমরা দেখতে পাই যে আসামিদের মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর রহমান মশির সাথে যোগাযোগ ছিল।
গোলাম কিবরিয়া পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব হিসেবে বেশ জনপ্রিয় একজন নেতা ছিলেন এবং তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও খুবই উজ্জ্বল ছিল। তিনি হয়তোবা পরবর্তীতে পল্লবী থানা বিএনপির বড় কোনো পদে যেতে পারতেন। এতে মশি যে অন্যান্য ঝুটব্যবসা, চাঁদাবাজি, হাউজিং ব্যবসা, ডেভেলপার ব্যবসা ফুটপাথের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতো সেগুলোতে কিবরিয়া আরো বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে এই ঘটনা ঘটানো হতে পারে। তিনি বলেন, ঘটনার সাথে জড়িত অন্যদের গ্রেফতারেও অভিযান চালানো হচ্ছে।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় মুখোশধারী তিন সন্ত্রাসী মিরপুর ১২ নম্বরের বি ব্লকে ‘বিক্রমপুর হার্ডওয়্যার অ্যান্ড স্যানিটারি’ নামের একটি দোকানে ঢুকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে। ঘটনার পর দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যাওয়ার সময় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ওঠে। কিন্তু অটোরিকশা চালক দ্রুত না চালানোয় তার কোমরে গুলি করে আহত করে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার দীনা বাদি হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি হিসেবে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরো সাত-আটজন এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।