এটি বাংলাদেশ বদলে দেয়ার নির্বাচন : ডা: শফিকুর রহমান
Printed Edition
সিলেট ব্যুরো
- ধর্মের ভিত্তিতে দেশকে বিভক্ত করতে দেয়া হবে না
- ৫ আগস্টের পর প্রতিশোধ ও মামলাবাণিজ্যে জড়ায়নি জামায়াত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, বিগত ৫৪ বছর দেশবাসী অনেককেই দেখেছে। এবার জামায়াতকে দেশসেবার সুযোগ দিলে এবং আল্লাহ তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কবুল করলে ৫৪ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে কোথাও কোনো বৈষম্য বা বেইনসাফ করা হবে না। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দেন, ‘আমি জামায়াতের বিজয় চাই না, আমি এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে রাজার ছেলে রাজা নয়, বরং চা-শ্রমিকের সন্তানও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে।’
তিনি বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ে কাউকে হেয় করা হবে না, কারো সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হবে না, কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে না, দেশকে বিভক্ত করতে দেযা হবে না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ‘বাংলাদেশ বদলে দেয়ার ভোট’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে একটি পরিবর্তিত নতুন বাংলাদেশ পাবে জাতি। ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হওয়া মানেই বাংলাদেশ বিজয়ী হওয়া। তিনি কেন্দ্র পাহারা দেয়ার জন্য প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। গতকাল শনিবার সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া এবং গত শুক্রবার রাতে ফরিদপুরে আয়োজিত পৃথক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল হেলিকপ্টারে তিনি সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ঝটিকা সফর করেন এবং বিশাল জনসমুদ্রে ভাষণ দেন।
সিলেটের উন্নয়নে বিশেষ অঙ্গীকার : গতকাল বিকেলে সিলেট নগরীর ঐতিহাসিক সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় ডা: শফিকুর রহমান নিজেকে ‘সিলেটের সন্তান’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর বর্তমানে কেবল নামেই আন্তর্জাতিক। আমরা ক্ষমতায় গেলে একে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর করা হবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফ্লাইট সরাসরি এখানে নামবে। তিনি বন্ধ হয়ে যাওয়া ম্যানচেস্টার রুট সচল করার পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর প্রতিশ্রুতি দেন।
সিলেটের খনিজসম্পদ ও নদী নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সিলেট থেকে গ্যাস সারা দেশে যায়, অথচ সিলেটবাসীই গ্যাস পায় না। সুরমা-কুশিয়ারা নদী মরে যাচ্ছে। জামায়াতকে সুযোগ দিলে নদীগুলোর নব্যতা ফিরিয়ে আনা হবে এবং সিলেটের ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে দেয়া হবে। এ ছাড়া সিলেটের রুগ্ণ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে সচল করার অঙ্গীকার করেন তিনি।
সিলেট ও কুলাউড়ার জনসভায় প্রবাসীদের উদ্দেশে আমিরে জামায়াত বলেন, প্রবাসীরা এ দেশের অর্থনীতির প্রাণ। যারা বিদেশে মৃত্যুবরণ করেন, তাদের লাশ রাষ্ট্রীয় সম্মানের সাথে দেশে আনা হবে। যারা উপার্জনের আগেই প্রবাসে মারা যান, তাদের পরিবারের দায়িত্ব নেবে সরকার। তিনি আরো জানান, এবার প্রবাসীরা সীমিত পরিসরে ভোটের সুযোগ পেলেও জামায়াত ক্ষমতায় গেলে সব প্রবাসীর পূর্ণ ভোটাধিকার নিশ্চিত করবে।
বেকার ভাতা নয়, মর্যাদার কর্মসংস্থান : হবিগঞ্জ ও কুলাউড়া প্রতিনিধি জানান, ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমরা বেকার ভাতার কার্ড দিয়ে কাউকে বেইজ্জতি করতে চাই না। যুবকদের হাতে আমরা মর্যাদার কাজ তুলে দেবো। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল কাগজের সার্টিফিকেট তৈরির কারখানা না বানিয়ে দক্ষ জনবল তৈরির কেন্দ্রে রূপান্তরের কথা বলেন। প্রতিটি এলাকাকে কৃষি-শিল্পের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা এবং গ্রামেই শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করার পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন তিনি।
বৈষম্যহীন সমাজ ও চা-শ্রমিকদের অধিকার : হবিগঞ্জের নিউ ফিল্ড মাঠের জনসভায় তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি ফুলের বাগানের মতো। এখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান যুগ যুগ ধরে বসবাস করছে। ধর্মের ভিত্তিতে কারো ওপর বাড়াবাড়ি করা ইসলামে হারাম। তিনি চা-শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চা-বাগানে আধুনিকতা ও প্রযুক্তি যুক্ত করে তাদের সন্তানদের জন্য সুশিক্ষা ও উন্নত স্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
প্রতিশোধহীন ৫ আগস্ট ও সুশাসন : ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘জামায়াত একজন জালিমের বিরুদ্ধেও প্রতিশোধ নেয়নি। আমরা মজলুম ছিলাম, কিন্তু জালিম হইনি। আমাদের নেতাকর্মীরা কোনো লুটতরাজ বা মামলা বাণিজ্যে জড়ায়নি।’ তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা এ দেশের মানুষের হক ও টাকা পাচার করেছে, তারা স্বেচ্ছায় তা ফেরত না দিলে রাষ্ট্র ‘পেটের ভেতর থেকে’ সেই সম্পদ বের করে আনবে। দুর্নীতির মূল উপড়ে ফেললে মাত্র পাঁচ বছরেই বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে যাবে।
ফরিদপুর বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের প্রতিশ্রুতি : এর আগে গত শুক্রবার রাতে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে আয়োজিত সমাবেশে তিনি বলেন, নদী দখলমুক্ত করে নদীর জীবন ফিরিয়ে দেয়া হবে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, আল্লাহ সুযোগ দিলে ফরিদপুর নামেই বিভাগের বাস্তবায়ন হবে এবং ফরিদপুরকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করা হবে।
সিলেটের জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এ ছাড়া বক্তব্য দেন জাগপা সভাপতি রাশেদ প্রধান, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ সিবগা, সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনসহ অন্যান্য নেতা।
হবিগঞ্জের জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মুখলিছুর রহমান এবং ফরিদপুরে সভাপতিত্ব করেন জেলা আমির মাওলানা মো: বদরউদ্দিন। এ ছাড়া কুলাউড়ায় ইঞ্জিনিয়ার এম সায়েদ আলীর সভাপতিত্বে জেলা ও স্থানীয় জামায়াত নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশ শেষে ডা: শফিকুর রহমান সিলেট ও সুনামগঞ্জের ১১টি আসনের জোট প্রার্থীদের হাতে প্রতীক (দাঁড়িপাল্লা, রিকশা ও দেওয়াল ঘড়ি) তুলে দিয়ে তাদের বিজয়ী করার আহ্বান জানান। সিলেট-১ আসনে মাওলানা হাবিবুর রহমান, সিলেট-৬ মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, সুনামগঞ্জ-৩ শাহীনূর পাশা চৌধুরীসহ অন্যান্য প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। একইভাবে হবিগঞ্জের চারটি আসন এবং মৌলভীবাজারের দু’টি আসনের প্রার্থীরাও নিজ নিজ জনসভায় উপস্থিত ছিলেন।
বিশাল এসব জনসভায় হাজার হাজার নারী-পুরুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ করা গেছে। সমাবেশস্থলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী নিয়োজিত ছিলেন।