লেবাননের ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি শুরু বাড়ি ফিরছেন বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা
Printed Edition
বিবিসি, রয়টার্স ও আলজাজিরা
ইসরাইল ও লেবাননের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়া শুরু হয়েছে। এ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ প্রাথমিকভাবে ১০ দিন। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এর সময়সীমা বাড়তে পারে। যুদ্ধবিরতি দেশটির সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি আনলেও বাড়িঘরে ফিরে ধ্বংসযজ্ঞের যে ভয়াবহ চিত্র তারা দেখছেন তা ফেরার আনন্দকে মøান করে দিচ্ছে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতির ফলে লেবাননের সাথে একটি ‘ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি’ করার সুযোগ তৈরি হবে। হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে সম্মত হয়েছে। তবে তারা দাবি করেছে, এই যুদ্ধবিরতিতে অবশ্যই ‘লেবাননের ভূখণ্ডজুড়ে হামলা পুরোপুরি থামাতে হবে’ আর ‘ইসরাইলি বাহিনীর জন্য অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা রাখা যাবে না’।
নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের ১০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত তথাকথিত ‘নিরাপত্তা জোনে’ অবস্থান করবে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যারাত গড়িয়ে মধ্যরাতে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর পরই লেবাননের রাজধানী বৈরুতের কিছু অংশজুড়ে উদযাপন শুরু হয়ে যায়, এ সময় গুলির শব্দ শোনা যেতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রায় আধা ঘণ্টা পর উদযাপনের অংশ হিসেবে রকেট ছোড়া হয়।
কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সহিংসতা থামলেও পরিস্থিতি ভঙ্গুর অবস্থায়ই আছে। শুক্রবার ভোরে লেবাননি সেনাবাহিনী জানায়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরই তা লঙ্ঘন করেছে ইসরাইল, তারা বিরতি দিয়ে দিয়ে দক্ষিণ লেবাননের বেশ কয়েকটি গ্রামে গোলাবর্ষণ করেছে। এ অভিযোগের বিষয়ে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। এর আগে তারা জানিয়েছিল, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও তাদের বাহিনীগুলো দক্ষিণ লেবাননে মোতায়েন থাকবে। সামাজিম মাধ্যম এক্স এ ইসরাইলি বাহিনীর আরবিভাষী মুখপাত্র আভিচাই আদরাই দাবি করেছেন, ওই অঞ্চলে হিজবুল্লাহর ‘তৎপরতা’ অব্যাহত থাকার প্রতিক্রিয়ায় সেখানে তাদের বাহিনী রেখে দেয়া হয়েছে। হিজবুল্লাহ এক দীর্ঘ বিবৃতিতে বৃহস্পতিবার দিনভর ইসরাইলের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছে। তাতে দেখা যায়, তারা স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৫০ মিনিটে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সর্বশেষ হামলা চালিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঠিক ১০ মিনিট আগে। পরে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে করা এক পোস্টে হিজবুল্লাহকে যুদ্ধবিরতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘আমার আশা এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে হিজবুল্লাহ সুন্দর ও ভালো কাজ করবে। যদি তারা তা করে তবে সেটি তাদের জন্য একটি দারুণ মুহূর্ত হবে। আর কোনো হত্যা নয়। অবশেষে শান্তি চাই!’ মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, হিজবুল্লাহকে ইসরাইলে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে লেবানন সরকারকে অবশ্যই ‘অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ’ নিতে হবে। লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় প্রতিরক্ষার ‘একচেটিয়া দায়িত্ব’ লেবাননের নিরাপত্তা বাহিনীর। হিজবুল্লাহ বলেছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে, প্রতিরোধ যোদ্ধারা ট্রিগারে আঙুল রেখেই প্রস্তুত থাকবে। হিজবুল্লাহর মালিকানাধীন টেলিভিশন আল-মানার টিভিতে প্রচারিত এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে, ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি জানায়, যোদ্ধারা ট্রিগারে তাদের আঙুল লাগিয়ে থাকবে। শত্রুর প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তারা সর্বদা প্রস্তুত।
যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানায়, পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় তারা দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ৩৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এগুলোর মধ্যে ছিল রকেট লঞ্চার, সদর দফতর ও হিজবুল্লাহর সদস্যরা। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইসরাইল ও লেবাননের নেতাদের হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
তবে যুদ্ধবিরতি দেশটির সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি আনলেও বাড়িঘরে ফিরে ধ্বংসযজ্ঞের যে ভয়াবহ চিত্র তারা দেখছেন তা ফেরার আনন্দকে ম্লান করে দিচ্ছে। লেবাননি সংবাদ মাধ্যম নাহারনেট জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ অঞ্চলের জিবশিত গ্রামে ফিরে আসা বাসিন্দারা দেখছেন মাটির সাথে মিশে গেছে একের পর এক বহুতল ভবন, রাস্তায় রাস্তায় পড়ে আছে কংক্রিটের খণ্ড আর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া টিন। যত্রতত্র ছিঁড়ে পড়ে আছে বিদ্যুতের তার।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণায় হতাশ ইসরাইল
এ দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবাননের সাথে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করায় তেল আবিবে তীব্র ক্ষোভ ও অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে। ইসরাইলি সংবাদ মাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে সরকারের জন্য অত্যন্ত ‘বিব্রতকর পরিস্থিতি’ হিসেবে বর্ণনা করছে। খবর আলজাজিরার।
ইসরাইলি সংবাদ মাধ্যম চ্যানেল ১২-এর খবরে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এ ধরনের আগাম ঘোষণা ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের হতবাক করেছে। সাধারণত এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশের মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হওয়ার পর ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ট্রাম্পের এই একতরফা ঘোষণা ইসরাইলি সার্বভৌমত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে অবমাননা করার শামিল বলে মনে করছেন দেশটির অনেক রাজনীতিবিদ।
হারেৎজ জানিয়েছে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী আজ রাত থেকে যুদ্ধবিরতির জন্য কারিগরিভাবে প্রস্তুত থাকলেও, তারা নিজেরা ঘোষণা করার আগেই ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া এই বার্তা সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে বিস্ময় ও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
অন্য দিকে, ইসরাইলি সরকার এবং সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ এখনই যুদ্ধ থামানোর পক্ষে ছিল না। তাদের দাবি ছিল, লেবাননের মাটিতে ইসরাইলি বাহিনী যে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে লক্ষ্য হাসিল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত রাখা। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা করছে কট্টরপন্থী অংশগুলো।
ট্রাম্প যখন এই ঘোষণা দিলেন, তখন পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের মাটিতে ইসরাইলি বাহিনী অবস্থান করছে এবং নিয়মিত বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিমান ও স্থল হামলা চালাচ্ছে। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ এই ঘোষণা মাঠ পর্যায়ের সেনাদের কাছেও ছিল অপ্রত্যাশিত।