চরম অস্থিরতায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন
Printed Edition
- ভারত নিয়ন্ত্রিত সফটওয়ারে না ঢোকায় ২৫০০ জনের বেতন বন্ধ
- দেশের বিশেষজ্ঞদের বাদ দিয়ে রূপপুরে ভারতীয়দের নিয়োগ
দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ ও স্পর্শকাতর সেক্টর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে চলছে চরম অস্থিরতা। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে স্বাধীন এই কমিশনের সংবেদনশীল তথ্য ও বিজ্ঞানীদের ব্যক্তিগত প্রোফাইল ভারতী নিয়ন্ত্রণাধীন সফটওয়ারে আওতায় আনার পাঁয়তারা চলছে। কিন্তু কমিশনের বিজ্ঞানী, কর্মকর্তারা স্পর্শকাতর এই সেক্টরকে আলাদা রাখার দাবি করায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে তাদের বেতনসহ অন্যান্য ভাতাদি। যা নিয়ে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে কমিশনের প্রতিটি সেক্টরে।
বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের চুক্তি হলেও সেখানে দেশের বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের কাজে না লাগিয়ে ভারতীয়দের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। আর তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য রাখা হয়েছে বাংলাদেশেরই একজন ভারতীয় দোসরকে। তারা বলছেন, কমিশন নিয়ে বর্তমানে যা হচ্ছে এমন অমানবিক, মর্যাদাহানিকর এবং অগ্রহণযোগ্য ঘটনা কমিশনের ৫২ বছরের ইতিহাসে ঘটেনি।
এ ব্যাপারে গত মঙ্গলবার কমিশনে আয়োজিত এক মিটিংয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার উপদেষ্টার সাথে বৈঠক করেছেন। উপদেষ্টা বিষয়ে পজেটিভ নির্দেশনা দিলেও আটকে যাচ্ছে মন্ত্রণালয় থেকে। বিজ্ঞানীরা বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশাল দায়িত্ব সামলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দিকে হয়তো খুব বেশি সময় দিতে পারছেন না উপদেষ্টা সালেহ উদ্দীন আহমেদ। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগের দোসররা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। যার শিকার হচ্ছে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় এই প্রতিষ্ঠান।
পরমাণু বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রচলিত প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে রেখে কোনো বিশেষায়িত কাজের জন্য প্রশাসনিক, আর্থিক ও বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সরকার বিভিন্ন সময়ে ও প্রয়োজনে কমিশন গঠন করে থাকে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বাপশক) সেই ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান যা ১৯৭৩ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার নং: ১৫ তথা ২০১৭ সালের ২৩ নং আইন বলে প্রতিষ্ঠিত। কমিশনের আওতাধীন ৪০টি ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে পরমাণু বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত গবেষণা, শিক্ষা ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে পরিচালিত হচ্ছে।
তারা বলেন, ২০১৫ সালে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার ঔঝঈ অঃড়সংঃৎড়ুবীঢ়ড়ৎঃ সাথে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চুক্তি হয়। নির্মাণ কাজ তদারকির জন্য বিগত সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশের পরমাণু বিজ্ঞানীদের বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় তথাকথিত কিছু ভারতীয় বিশেষজ্ঞ নিযুক্ত করে। তাদের সহযোগী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় কমিশনের প্রশাসন বিভাগের অলক চক্রবর্তীকে। তিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান এবং ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। মানবিক বিভাগ থেকে তৃতীয় শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী অলক চক্রবর্তীকে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো একটি উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন প্রকল্পের উপপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ভারতীয় হাই কমিশনের সুপারিশে। অথচ ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলেও অলক চক্রবর্তী ওই পদে এখনো বহাল রয়েছে। কথিত আছে তথাকথিত ভারতীয় বিশেষজ্ঞ এবং অলক চক্রবর্তীর মাধ্যমে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ সংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল অনেক তথ্য দেশটিতে পাচার হয়েছে। তারা বলেন, পরমাণু প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ কমিশনের সাবেক এবং বর্তমান বিশেষজ্ঞদের কাজে না লাগিয়ে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ আনা এবং অলক চক্রবর্তীদের মতো লোকদের প্রকল্পের কাজে সংশ্লিষ্ট করার উদ্দেশ্যই হলো বাংলাদেশকে স্থায়ীভাবে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরনির্ভরশীল করে রাখা।
বিজ্ঞানীরা জানান, বিগত সরকার নগদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ ও সুদের দায় কমানোর জন্য রইঅঝ++ ঝুংঃবস-এ চবৎংড়হধষ খবফমবৎ (চখ) অপপড়ঁহঃ নামক সফটওয়ারের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়। এতে যে শুধু সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের নামের তালিকাই দিতে হয় তা না নয়। প্রতিটি কর্মকর্তা কর্মচারীর পুরো পরিবারের জীবন বৃত্তান্ত, সংশ্লিষ্ট দফতরের আয়-ব্যয়, আমদানি-রফতানি, বিভিন্ন দেশের সাথে চুক্তি সব কিছু এই সফটওয়ারে দিতে হয়। যে সফটওয়ারটি নিয়ন্ত্রণ হয় ভারতের চেন্নাই থেকে। বিজ্ঞানীদের অভিযোগ, এই সফটওয়ারের মাধমে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার রীতিনীতি মেনে পরমাণু প্রযুক্তিসংক্রান্ত বিশেষায়িত গবেষণা ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করলে কোনো গোপনীয়তাই থাকবে না। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ভারতপ্রেমী কিছু কর্মকর্তা দেশের চিন্তা না করে পুরো দেশটাকেই এই সফটওয়ারের মধ্যে ঢুকানোর চেষ্টা করছে। এতে কমিশনের কর্মকর্তারা দ্বিমত পোষণ করায় গত দুই মাস তাদের বেতন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
কমিশনের অনুকূলে অর্থ ছাড় না হওয়ায় বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশনপ্রাপ্তিসহ গবেষণা ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কমিশনে কর্মরত প্রায় ৬০০ বিজ্ঞানীসহ ২৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী মার্চ’২৫-এর বেতন-ভাতাদি এখনো পাননি, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী/ কর্মকর্তা/ কর্মচারীর তাদের পেনশনভাতা, আনুতোষিকসহ অন্যান্য ভাতাদি পাচ্ছেন না।
তা ছাড়া কমিশনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর, কোবাল্ট ৬০ গামা ইরেডিয়েটর, সাইক্লোট্রন, ট্যান্ডেম অ্যাক্সিলারেটর এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ফ্যাসিলিটির মতো তেজস্ক্রিয় ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। স্পর্শকাতর এসব স্থাপনায় যেকোনো সময় নিউক্লিয়ার ও রেডিওলজিক্যাল ইমার্জেন্সির উদ্ভব হতে পারে যা মোকাবেলায় কমিশনকে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। উপযোগিতা যাচাই ছাড়া কমিশনে রইঅঝ++ সিস্টেমে চখ অপপড়ঁহঃ সৃজনের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করলে তাৎক্ষণিক রেডিওলজিক্যাল ইমারজেন্সি মোকাবেলায় বিভিন্ন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
কমিশন সৃষ্টির পর থেকে ২০১১ পর্যন্ত কর্মরত বিজ্ঞানীদের উচ্চ শিক্ষা/ প্রশিক্ষণে বিদেশ গমনের সরকারি আদেশ (জিও) কমিশন থেকেই দেয়া হতো। কিন্তু ২০১১ সালে তৎকালীন সরকার কমিশনের জিও দেয়ার ক্ষমতা রহিত করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত করে। তখন থেকে কমিশনের বিজ্ঞানীদের উচ্চ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হয়ে আসছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের বাদ দিয়ে আমলারা নিজেরাই শুধু ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বিদেশের বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় কমিশনের নবীন বিজ্ঞানীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
এ ব্যাপারে জানতে মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।