‘দক্ষ জনশক্তি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়তে উন্নয়ন পরিকল্পনা - ১
স্থাপিত হচ্ছে কারিগরি শিক্ষার ৪৬০টি নতুন প্রতিষ্ঠান
পুরনো প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাও বাড়বে
Printed Edition
সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশে নতুন করে কারিগরি শিক্ষার আরো ৪৬০টি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থাকবে টেকনিক্যাল স্কুল, টেকনিক্যাল কলেজ, মহিলা পলিটেকনিক, আধুনিক ইনস্টিটিউট ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে এবং জনগণের চাহিদাও বেশি এমন জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে এই নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠা করা হবে। সূত্রমতে উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের আওতায় আরো ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ২৩টি জেলায় নতুন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, চার বিভাগে ৪টি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং নতুন আরো চারটি বিভাগে ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনেরও উদ্যোগ দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের বিষয়েও সম্মতি পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় যেখানে পড়ালেখা শেষ করার পরও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বেকার বা কর্মহীন থেকে যায় সেখানে বর্তমান অন্তর্বর্র্তীকালীন সরকারের কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলা যাতে দ্রুত বেকারত্ব উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। আর সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেশে এখন নতুন নতুন পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর ও কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম অবস্থায় উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের জন্য ২০ হাজার ৫২৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের আওতায় ৬৪টি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এক হাজার ৩৯৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। অপর দিকে নতুন এক শ উপজেলায় ১০০ প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য দুই হাজার ৫২০ কোটি ৪০ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। ২৩ জেলায় আধুনিক মানের নতুন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য তিন হাজার ৬৫১ কোটি টাকা ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশের নারী শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষম হিসেবে গড়ে তুলতে এবং দেশের উন্নয়নেও নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন ৪টি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনে ৪০১ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব ধরা হয়েছে। অপর দিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এবার চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী এবং রংপুর বিভাগে একটি করে মোট ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন করে ১২শ’ ২২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সাথে দেশে এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ভূমি জরিপ শিক্ষার উন্নয়ন প্রকল্প নামে নতুন একটি প্রকল্প বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি শিক্ষা বিভাগ। এই প্রকল্পের জন্য সরকার ৩৪০ কোটি ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়ার বিষয়ে সম্মতিও দিয়েছে।
শুধু নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেই দেশের বৃহৎ এই জনবলকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। তাই পুরনো প্রতিষ্ঠানের যেগুলোর যন্ত্রপাতিও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে সেগুলোর সংস্কার করে সক্ষমতা বৃদ্ধিরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে কিংবা ব্যবহারের উপযোগী নেই সেগুলোর জন্য আলাদাভাবে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। সূত্র আরো জানায়, কারিগরি শিক্ষা অধিদফরের আওতায় ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের সক্ষমতা যাচাই করে সেখানকার পুরনো ও নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতি পুনঃস্থাপন করা হবে। এ ছাড়া দেশের ১৫টি বিদ্যমান সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বৃদ্ধি শীর্ষক একটি প্রকল্প ১৫১৩ কোটি ৯৫ লাখ ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য গত মাসে (২৪ মে ২০২৫) একনেকে অনুমোদন হয়েছে। একই সাথে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের আওতাধীন ৮টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একাডেমিক ভবন নির্মাণ শীর্ষক একটি প্রকল্প ৪৫১ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য একই দিন একনেকে অনুমোদন হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষায় বর্তমান সরকারের এই নতুন পরিকল্পনা প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম নয়া দিগন্তের এ প্রতিবেদককে বলেন, দেশের কারিগরি শিক্ষা বিভাগে ৩০ বছর আগেই আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল। আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে তারপরও আমরা শুরুটা করতে পেরেছি। শিক্ষা উপদেষ্টা থেকে শুরু করে প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় নিজেও দেশের কারিগরি শিক্ষার জন্য বেশ আগ্রহ নিয়েই গুরুত্ব দিচ্ছেন। আগামীতে আমরা দেশের কারিগরি শিক্ষাকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নিতে চাই। এ জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়ে কাজও শুরু হয়েছে। আমরা চাই অংশীজনদের পরামর্শ ও সহযোগিতা নিয়ে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে।
সচিব বলেন, দেশে ৫০ বা ষাটের দশকে কারিগরি শিক্ষার শুরু হলেও আমরা এটি বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারি নাই। বিশেষ করে চলমান বিশ্ব এবং এর আধুনিক টেকনোলজি বা মেশিনারিজও আমাদের এই শিক্ষার সাথে সংযুক্ত করতে পারি নাই। ফলে দক্ষ কর্মক্ষম জনশক্তি গড়ে তুলতে যে ধরনের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বা জ্ঞান দরকার ছিল তা আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের দিতে পারি নাই। অতীতের কোনো সরকারও অবশ্য এ বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এতে আমরা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যে ফাঁকা বুলি দিয়েছি প্রকৃত অর্থে কাজের কাজ আসলে কিছুই হয়নি।
সচিব এই প্রতিবেদককে আরো জানান, আমাদের নতুন নতুন বেশ কিছু পরিকল্পনা তো আছে সেই সাথে বর্তমানেও আমরা অনেকগুলো প্রকল্প চলমান রেখেছি। বিশেষ করে কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের আওতায় বর্তমানে চলমান ১৯টি প্রকল্পের মধ্যে কারিগরি সেক্টরের জন্যই ১২টি প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের ১১টি প্রকল্প এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় রয়েছে আরো একটি প্রকল্প।