শীতে কাঁপছে সারা দেশ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
সারা দেশে জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা, ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত জনজীবন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সূর্যের দেখা মিলছে না। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টির মতো ঝরছে কুয়াশা, দিনভর পথঘাট ঢেকে থাকছে সাদা চাদরে। যে কারণে সড়ক-মহাসড়ক, হাটবাজার ও জনসমাগম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষ। কাজে বের হতে না পেরে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, শীতে কাহিল হয়ে পড়েছে নীলফামারীর জনজীবন। সে সাথে ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাস বইছে এ অঞ্চলে। গত ৪ দিন ধরে সূর্যের দেখা মিলেনি জেলার কোথাও।
নীলফামারী সদর উপজেলার টুপামারী ইউনিয়নের বাজার মৌজা গ্রামের কৃষক সাইদুল ইসলাম জানান, কাজে গেলে ঠাণ্ডায় হাত-পা কোঁকড়া (মুড়িয়ে) হচ্ছে। তাই কাজে যেতে পারছি না। এ দিকে শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় জেলায় শীতজনিত রোগের প্রার্দুভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা।
সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, শীতে জবুথবু হয়ে পড়েছেন নীলফামারীর সৈয়দপুরের ছিন্নমূল ও শীতার্ত মানুষ। নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষজন শীতের দাপটে কাহিল। খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন তারা। গতকাল মঙ্গলবার সৈয়দপুর বিমানবন্দর আবহাওয়া কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সকালে জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাতাসের আর্দ্রতা ৯৬ শতাংশ এবং বাতাসের গতিবেগ নেই বললেই চলে।
কৃষিনির্ভর সেচনির্ভর বোরো মৌসুমে কৃষকরা বীজতলা প্রস্তুত, বীজ বপন ও জমি তৈরি করতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।
ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে গত কয়েকদিন যাবৎ সূর্যের দেখা মিলছে না। প্রায় সারা দিন চারদিক ঘন কুয়াশার সাদা চাদরে ঢাকা থাকে। বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়ে। হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশার কারণে শীতের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। চর ও নদী তীরবর্তী মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বিপণী বিতানসহ ফুটপাতের শীতের পোশাকের দোকানে মানুষের ভীড় বেড়েছে। সকাল ও সন্ধ্যায় মানুষজনকে আগুন পোহাতে দেখা গেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: আবু সাজ্জাদ মোহাম্মদ সায়েম বলেন, জ্বর, সর্দি, কাশি ও নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। বিশেষকরে শিশুরা শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।
ধামরাই (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, ধামরাই উপজেলায় গত পাঁচ দিন ধরে সূর্যের দেখা মিলেনি। সে সাথে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির কারণে শীতের তীব্রতা আরো বেড়েছে। বিশেষ করে খেটে খাওয়ার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
তাপমাত্রা মেনে এসেছে ১৩-১৪ পর্যন্ত। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বেরোচ্ছে না। ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যানবাহন হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে।
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি জানান, ঢাকার কেরানীগঞ্জে শীতার্ত অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে উপজেলা প্রশাসন। হাড়কাঁপানো শীতে কেউ যেন কষ্ট না পান, সে কারণে মানবিক লক্ষ্য নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শীতার্ত মানুষের মাঝে সরকারি কম্বল বিতরণ করা হয়।
জানা যায়, কেরানীগঞ্জ ইউএনও উমর ফারুকের নির্দেশনায় রাত ৮টা থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়। রাতভর উপজেলার আব্দুল্লাহপুর, হাসনাবাদ, ইকুরিয়া, আগানগর ঘাট, খোলামোরা ঘাট ও আঁটি বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই শতাধিক অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের হাতে সরকারি কম্বল তুলে দেয়া হয়।
কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলাজুড়ে শীতের দাপট তীব্র আকার ধারণ করেছ। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ। গত কয়েক দিন ধরে নেই সূর্যের দেখা। সকাল থেকে ঘন কুয়াশা আচ্ছন্ন থাকে প্রকৃতি। শীতবস্ত্রের অভাবে মানুষের কষ্ট বেড়েছে। বিকেল থেকে শীতের মাত্রা তীব্র হয়। সন্ধ্যার পর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বের হচ্ছে না। কটিয়াদী সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বেড়েছে ঠাণ্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা। চিকিৎসকরা রোগীদের উষ্ণ কাপড়, গরম খাবার ও বেশি পানি পানের পরামর্শ দিচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামে জেঁকে বসেছে শীত। তাপমাত্রা কমতে থাকায় বেড়েছে শীতের তীব্রতা। সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশায় ঢাকা থাকছে চারদিক। শীতের তীব্রতায় ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষজন। গতকাল সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র।
কুয়াশা ও শীতের তীব্রতায় কৃষি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষগুলো বিপাকে পড়েছে। শীত নিবারণে অসহায়-দুস্থ মানুষ খড়কুটো জ্বালিয়ে উষ্ণতা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, আবহাওয়া অফিস বলছে, গত সোমবার সকাল ৯টায় কিশোরগঞ্জের নিকলীতে দেশের সর্বনিম্ন ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন কিশোরগঞ্জে তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এই মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।
অতিরিক্ত ঠাণ্ডা সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে। দৈনন্দিন কাজে যেতে না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। প্রভাব পড়েছে বোরো ধানের আবাদে। মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় ধানের চাড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা। হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে ঠাণ্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা।
নোয়াখালী অফিস জানান, তীব্র শীতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে নোয়াখালীবাসী। গরীব অসহায় মানুষের কষ্টের অন্ত নেই। জেলা সদর বেগমগঞ্জ, সোনাইমুড়ী, চাটখিল, সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সুবর্ণচর ও হাতিয়া উপজেলায় গত তিন দিনে ও সূর্য দেখা যায়নি। রাত দিন বৃষ্টির মতো কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকছে। পাশাপাশি কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। এতে গরিব অসহায় খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঠাণ্ডাজনিত রোগে শিশু ও বৃদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছে।
শরণখোলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, শীতে কাঁপছে বাগেরহাটের শরণখোলা। স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছেন না শ্রমজীবীরা। নিম্নœ আয়ের পরিবারে দেখা দিয়েছে চরম ভোগান্তি ও আর্থিক সঙ্কট। উপজেলার সর্বত্র দেখা দিয়েছে শীতজনিত রোগব্যাধি। এ ছাড়া বর্তমানে উপজেলাজুড়ে চলছে বোরো ও আলুর চাষাবাদ, কিন্তু শীতের কারণে কাজে নামতে পারছেন না চাষিরা।
সোমবার দুপুরে বলেশ^র নদের পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, নদীতে কোনো জেলে নৌকা নেই। মাঝেমধ্যে দু-একটি নৌকা নিয়ে নদীতে নামলেও ঠাণ্ডায় বেশিক্ষণ টিকতে পারছেন না জেলেরা। এ কারণে বাজারেও স্থানীয় মাছের সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, পটুয়াখালীর কুয়াকাটাসহ উপকূলীয় এলাকায় টানা তিন দিন ধরে ঘন মেঘ ও কুয়াশার আবরণে সূর্যের দেখা মেলেনি। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চারপাশ ঢেকে থাকছে ঘন কুয়াশায়। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো ঝরছে কুয়াশা, যে কারণে রাস্তাঘাট ও পরিবেশ শিশিরে ভিজে থাকছে সারাক্ষণ।
জানা গেছে, সোমবার সকাল ৯টায় পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৪ দশমিক ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, দোয়ারাবাজার উপজেলাজুড়ে জেঁকে বসেছে শীত। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো আকাশে কখনো কখনো ক্ষণিকের জন্য নিভু নিভু করে জ্বলে সূর্য। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আর ঘন কুয়াশা স্বাভাবিক জনজীবনেও প্রভাব ফেলেছে। জানুয়ারি মাসে শীতের এ প্রকোপ আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। যতই সময় বাড়ছে শীতের তীব্রতাও বাড়ছে।
ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, ঘনকুয়াশার কারণে নৌ-দুর্ঘটনা এড়াতে রাজধানী সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলের সব রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। গত রোববার বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে এ নির্দেশনা কার্যকর করা হয়। কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়া হঠাৎ লঞ্চ চলাচল বন্ধ হওয়ায় যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঘনকুয়াশার কারণে নৌপথের দৃশ্যমানতা কমে আসায় যাত্রীনিরাপত্তার স্বার্থে চাঁদপুর ও দক্ষিণাঞ্চলে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকবে।