নদীভাঙনে বছরে ক্ষতি ৬ হাজার কোটি টাকা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

নদীভাঙন দেশের জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। নদী দখল, নাব্যতা হারানো, কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ ও দায়িত্বশীলদের যথাযথ তদারকির অভাবে নদীভাঙন মারাত্মক হয়ে উঠেছে। ফলে নদী পড়ের বসতি মানুষের জীবণে চরম মানবিক বিপর্যায় নেমে এসেছে। তথ্য বলছে, শরীয়তপুরের নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জের উত্তর তারাবুনিয়ায় পদ্মা ও কীর্তিনাশা নদীর তীব্র স্রোতে গত তিন মাসেই পদ্মার করাল গ্রাসে নদীতে বিলীন হয়েছে প্রায় সাত কিলোমিটার এলাকা। এতে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি পরিবার। পরিবেশবাদী সংগঠনের তথ্য মতে শুধু নদী ভাঙনেই বছরে দেশের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দেয়া তথ্যমতে, নদীভাঙনে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার ৫০০ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস’ বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনের কারণে দেশ প্রতি বছর তার জিডিপির (জিডিপি) প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশ হারাচ্ছে। এক দিকে নদী গিলে খাচ্ছে এসব অঞ্চলের প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো দৃশ্যমান সভ্যতা ও নদীপাড়ের অসহায় মানুষের স্মৃতিবিজড়ি গ্রাম। অন্য দিকে সরকারের হাজার কোটি টাকার ডেল্টা প্ল্যান ও আবাসন প্রকল্প ভূমি হারানো মানুষের জীবনে কোনো স্বস্তির বার্তা দিতে পারছে না। ফলে মাঠপর্যায়ের লোক দেখানো চলমান প্রকল্প প্রশাসনিক জটিলতা ও তথ্য প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আরো জটিল করে তুলছে।

নদীভাঙনের ভয়াবহতা কতটা তীব্র, তার প্রমাণ মেলে সরেজমিনে নড়িয়া পয়েন্টে গেলে। নদী ও পরিবেশবাদী সংগঠন নোঙর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সুমন শামস জানান, সম্প্রতি নড়িয়া পয়েন্টে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও লঞ্চঘাট নদীতে বিলীন হওয়ার পাশাপাশি এখন পর্যন্ত অন্তত সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন। ভাঙনের তীব্রতায় স্থানীয় রাস্তাঘাট, বাজার, মসজিদ-মন্দির, স্কুল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ শত শত স্থাপনা বিলীন হচ্ছে নদীতে।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) দেয়া পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৭৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৩৮ বছরে প্রধান নদীগুলোর ভাঙনে প্রায় ভূমি বিলীন হয়েছে এক লাখ ৭০ হাজার হেক্টর। যার গড় হিসেবে প্রতি বছর হারাতে হচ্ছে পাঁচ থেকে ১০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি।

সুমন শামস আরো বলেন, দীর্ঘ ভয়াবহতায় প্রতি বছর নদীভাঙনে দেশে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বিগত ২৫ বছরে মেঘনার ভাঙনে উত্তর তারাবুনিয়ার বাসিন্দারা অন্তত পাঁচবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। এই সর্বহারারা পরবর্তীতে ঢাকা ও বিভিন্ন শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছেন। যা দেশের অথনীতিতে বড় অন্তরায় সৃষ্টি করছে। ৫৫ বছর বয়সী সুরাইয়া নদীতে সব হারিয়ে দৈনিক ২০০ টাকা মজুরিতে ইট ভাঙার কাজ করে বর্তমানে পেট চালাচ্ছেন।

নির্মাতা ও কবি সারোয়ার জাহান জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি উজানের দেশ ভারত ফারাক্কা ব্যারাজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেয়াকে অনেকটা দায়ী করেছেন। এ ছাড়া তিনি প্রতিকার হিসেবে আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার মাধ্যমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০,৩৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয় ২০ হাজার জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ৭৭০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘গুচ্ছগ্রাম তৃতীয় পর্যায়’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে পুনর্বাসন ব্যবস্থাপনার বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলে প্রশাসনিক স্তরে একধরনের তথ্যহীনতা লক্ষ্য করা গেছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, আনুমানিক ২০-২২ কোটি বছর আগে এই অঞ্চলটি সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল। হিমালয় থেকে ভেসে আসা পলি জমে স্তরের পর স্তরের দ্বারা গড়ে উঠেছে এই ভূখণ্ড। সেই থেকে আজও এই ব-দ্বীপকে লালন করে চলছে এই নদীগুলো। পলিমাটি দিয়ে গঠিত এই ব-দ্বীপ অঞ্চল বাংলাদেশে প্রতি বছরই বিস্তীর্ণ এলাকা নদী ভাঙনের শিকার হয়। প্রতি বছর এভাবে প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমি নদীতে বিলীন হয় আর ঘরবাড়ি, ফসলের জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় হাজার হাজার মানুষ। এ বছরও জুন মাস থেকেই অনেকগুলো জেলায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা প্রধান নদ-নদী ছাড়াও কুশিয়ারা, ধরলা, তিস্তা, পায়রা, ডাকাতিয়া, করতোয়া, বড়াল, আড়িয়াল খাঁ, কর্ণফুলী, শঙ্খ নদীতেও বলতে গেলে সারা বছর ধরেই ভাঙন চলতে থাকে।

এ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্টগুলো একে অন্যের উপর দায় চাপিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা শফিকুল হায়দারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু বক্করের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি আবার পরিকল্পনা বিভাগের উপর দায় চাপিয়ে দায় মুক্তি নেন।

নোঙর ট্রাস্ট ও বিশেষজ্ঞরা এই সংকট মোকাবেলায় দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে- ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে দ্রুত অস্থায়ী আবাসন গড়ে তোলা, শাখা নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং এবং নড়িয়া পয়েন্টে নদীর গতিপথ বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। একই সাথে পদ্মা সেতু থেকে সুরেশ্বর পয়েন্ট পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা জরুরি।