বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বরাদ্দ আসলে শুভঙ্করের ফাঁকি

সিআইপিজির সেমিনারে বক্তারা

Printed Edition
back-1
জাতীয় প্রেস ক্লাবে সিআইপিপি আয়োজিত সেমিনারে অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দেয়া বরাদ্দের তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদ, সাবেক আমলা, সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, সামাজিক নিরাপত্তার নামে দেশে একধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এক লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দের মধ্য সরকারি চাকুরেদের পেনশন, বিভিন্ন ভাতা ও সুদ পরিশোধে (সঞ্চয়পত্রের সুদ) ব্যয়ও ধরা রয়েছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে তা ঠিক নয়।

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথা বলেছেন বক্তারা। ‘বাংলাদেশ বাজেট ২০২৬-২৭ : মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (সিআইপিজি)।

সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেখানো হলেও তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনে। আর সাধারণ মানুষকে যে ৫০০ বা এক হাজার টাকা করে ভাতা দেয়া হচ্ছে, তা বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিই খেয়ে ফেলছে।

ফলে শুধু সংখ্যার অঙ্কে নাগরিকদের সাথে একধরনের প্রতারণা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেট জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের (আইসিবি) চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু আহমেদ দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, আমাদের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে রয়েছে। যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো বেশ কষ্টকর। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে কিছুটা সময় দেয়ার পক্ষে মত দেন তিনি। তিনি বলেন, আগামী এক-দেড় বছর সরকারকে সময় দেয়া উচিত। কারণ এই সরকার অর্থনীতি যে অবস্থায় পেয়েছে তা অতীত ফ্যাসিবাদী সরকারেরই কর্মফল।

ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে আবু আহমেদ বলেন, কোন ব্যাংকের এমডি বা চেয়ারম্যান কে হচ্ছেন সেটি বড় কথা নয়; বরং ব্যাংকটি কেমন চলছে তা সরকারের দেখা উচিত। উদাহরণ হিসেবে প্রফেসর আহমেদ বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক এমডি ও পরিচালনা পর্ষদে তাদের পছন্দমতো লোকদেরই নিয়োগ দেয়া উচিত। কারণ দেড় লাখ কোটি টাকার আমানতে এই ব্যাংকটি বসে গেলে সরকারেরই অনেক বড় ক্ষতি হবে।

প্রফেসর আবু আহমেদ আরো বলেছেন, এক দিকে মানুষের কর দেয়ার ক্ষমতা কমছে, অন্য দিকে চাহিদা বাড়ছে। যার ফলে অনেক সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

তিনি সরকারের আকার ছোট করার পরামর্শ দিয়ে জানান, এতে রাষ্ট্রের খরচ কমবে। জনগণের টাকায় করপোরেশনগুলোকে ভর্তুকি দেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি এগুলো বন্ধ অথবা বিক্রি করে দেয়ার তাগিদ দেন।

একই সাথে বিদেশী ঋণ ও সুদের বোঝা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ঘাটতি বাজেট আরো ঋণ বাড়াবে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। তার মতে, সামাজিক নিরাপত্তা দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে সুদের হার কমাতে হবে, যাতে ব্যবসাবাণিজ্য বিকশিত হতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তার নামে শুভঙ্করের ফাঁকি বন্ধ করে অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটাতে বেসরকারি খাতকে উজ্জীবিত করার পরামর্শ দেন বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ।

লোডশেডিং নিয়ে সংসদ সদস্য বুলবুলের ক্ষোভ

আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, দেশের মানুষ লোডশেডিংয়ে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে। নিরঙ্কুশভাবে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির নিশ্চয়তা না থাকায় লাগাতার লোডশেডিংয়ে জীবনমান পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে। মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।

বুলবুল বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকা থেকে আমাকে বারবার সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে মেসেজ দেয়া হচ্ছে, ফোন দেয়া হচ্ছে- ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এখন বিদ্যুৎ কতক্ষণ থাকে না, বিদ্যুৎ কতক্ষণ পর পর যায় তা নয়; বিদ্যুৎ কতক্ষণ পর পর আসে সেই হিসাব। রাতে মানুষের ঘুম নেই। দিনে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার কী করছে এবং বিরোধী দল কী করছে সে বিষয়ে বলেন, আমরা বারবার সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলছি। তারা বলছেন- একটা গ্রিড নষ্ট হয়েছে; আরেকটা গ্রিড নষ্ট হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকায় বড় বড় কলকারখানা রয়েছে। বিশেষ করে অটো রাইস মিল। শত শত অটো রাইস মিল রয়েছে। একবার যদি বিদ্যুৎ বন্ধ হয় তাহলে সেই বিদ্যুৎ বন্ধ হওয়ার কারণে চালটা খুদে পরিণত হয়। প্রত্যেকটা কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষার্থীরা আছে বেকায়দার মধ্যে। মোটামুটি গোটা বাংলাদেশের চিত্র একই।

সেমিনারে আলোচক হিসেবে অংশ নিয়ে এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সামাজিক নিরাপত্তার সামান্য ভাতার আর কোনো কার্যকারিতা বা মূল্য থাকছে না। এটি শুধু কাগজের অঙ্ক ছাড়া কিছু নয় এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সাথে একধরনের জালিয়াতি করছে।

সরকারের বিভিন্ন কার্ড বিতরণকে একটি ‘ব্যবসা’ আরেকটি ‘প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই আড়াই হাজার টাকায় মানুষের কী হবে?

সিআইপিজির ভাইস চেয়ারম্যান মো: শফিউল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ড. এ কে এম ওয়ারেসুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে সাবেক সচিব ও এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ, সাবেক সচিব ড. আবুল হোসেন, সাবেক সচিব খ ম কবিরুল ইসলামও আলোচনায় অংশ নেন।

মূল প্রবন্ধে ওয়ারেসুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের কেন্দ্রবিন্দু মূলত অর্থের অভাব নয়; বরং সুশাসনের অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমিত সক্ষমতা। এনবিআরের আধুনিকায়ন, আর্থিক খাতের কঠোর তদারকি, প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং টেকসই তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণের মতো আমূল সংস্কার ছাড়া এই বাজেট সাধারণ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে কতটুকু কাজে লাগবে তা নিয়ে সংশয় প্রকার করা যায়।

আবদুল মজিদ বলেন, আমাদের সমাজে ব্যাপক বৈষম্য বিরাজমান। কিছু মানুষের কাছে অনেক টাকা-পয়সা বিদ্যমান, আর কিছু মানুষের কাছে কোনো অর্থই নেই।

কবিরুল ইসলাম বলেন, মানুষ দান-খয়রাত চায় না। তারা কাজের সুযোগ চায়। স্বাধীনতার এত বছর পরও সাড়ে তিন কোটি মানুষ দরিদ্র। এটি আমাদের জন্য লজ্জাকর।