মিঠামইনে উড়াল সেতু প্রকল্প
অসমাপ্ত রেখেই ‘শেষ’ ঘোষণা গচ্ছা প্রায় ৪ কোটি টাকা
Printed Edition
হামিদুল ইসলাম সরকার
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বহুল আলোচিত মিঠামইন-করিমগঞ্জ উড়াল সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন ছাড়াই ‘সমাপ্ত’ ঘোষণা করতে হচ্ছে। প্রায় পাঁচ হাজার ৬৫১ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পে এখন পর্যন্ত প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা, যা কার্যত রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরিবেশগত আপত্তি ও বাস্তবায়ন জটিলতার কারণে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। ফলে অসমাপ্ত অবস্থায়ই প্রকল্প সমাপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিশাল ব্যয়ের প্রকল্প, বাস্তবায়ন শূন্য
সেতু বিভাগের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা সদর থেকে করিমগঞ্জের মরিচখালি পর্যন্ত উড়াল সড়ক নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল পাঁচ হাজার ৬৫১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ২০২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।
প্রকল্পের আওতায় ১৩.৪০ কিলোমিটার বিদ্যমান সড়ক চার লেনে উন্নীত করা এবং হাওরের মধ্য দিয়ে ১৫.৩১ কিলোমিটার উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এ জন্য প্রায় ১৫১ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন ছিল।
তবে অনুমোদনের তিন বছর পার হলেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি কার্যত শূন্যই রয়ে গেছে। ভূমি অধিগ্রহণ ও ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো কাজ শুরু হয়নি।
পরিবেশবাদীদের আপত্তিতে থেমে যায় প্রকল্প
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্প অনুমোদনের আগে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেয়া হয়েছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়ে হাওর অঞ্চলের পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা তুলে পরিবেশবাদীরা তীব্র আপত্তি জানান।
২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও একই সুপারিশ করা হয়।
সংশোধিত প্রস্তাবও গ্রহণ হয়নি
প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত করতে সেতু কর্তৃপক্ষ ১৫৩ কোটি ৯২ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রথম সংশোধিত প্রস্তাব দেয়। তবে পরিকল্পনা কমিশন সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি।
প্রকল্পের উপ-পরিচালক আফতাব উজ জামান জানান, এখন পর্যন্ত প্রকল্পে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যার বেশির ভাগই বেতনভাতা ও পরিচালন খাতে।
তিনি আরো বলেন, জমি অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দেয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যয় হয়নি; বরং সরকারি কোষাগারে ফেরত গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের সব ক্রয় চুক্তিবিধি মেনে বাতিল করা হয়েছে। কেনা মালামাল ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আগামী ৩ জুন ২০২৬ প্রকল্পটির অডিট হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে পরিকল্পনা ও জবাবদিহি নিয়ে
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি উচ্চ ব্যয়ের মেগা প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন ছাড়াই বাতিল হওয়া পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার বড় উদাহরণ।
যদিও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করছেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কর্তৃক পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটি পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল এবং সব আইনি প্রক্রিয়া মেনেই অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।
তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুমোদিত একটি প্রকল্প কেন মাঝপথে এসে থেমে গেল এবং এর দায় কে নেবে?