নতুন নামে আবির্ভূত হচ্ছে ৫ ইসলামী ব্যাংক

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

নতুন নামে আবির্ভূত হচ্ছে সমস্যাকবলিত পাঁচ ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকগুলো থেকে ঋণের নামে লুটপাট হওয়া অর্থ আদায়ে তৃতীয় কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। যেটুকু এখনো ব্যাংকে আছে তা দিয়েই নতুন ব্যাংক গঠন করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর বিভিন্ন সময়ে আশ্বস্ত করেছেন কোনো কর্মকর্তা কর্মচারী চাকরি হারাবে না। তবে, এ নিয়ে খোদ ব্যাংকগুলোর মধ্যেই শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। কোনো ব্যাংক বলছে, তাদের ভিত্তি ভালো। কিছুদিন সময় পেলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আবার কেউ বলছেন, ব্যাংকগুলোতে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা কোনোভাবেই মেরামত করা যাবে না। যেখানে মোট ঋণের গড়ে ৭৭ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে, সেখানে ঘুড়ে দাঁড়ানো অসম্ভব। এ কারণে একীভূত হওয়ার পক্ষেই বেশির ভাগ। তবে, আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে আগামী অক্টোবরের মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূত করার কাজটি সেরে ফেলতে চায়। আর এ কারণেই বিভিন্ন প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে।

ব্যাংক পাঁচটি হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। প্রথম চারটি ব্যাংকের পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দখল করেছিল চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম। প্রথম তিনটি থেকে বেশির ভাগ অর্থই ঋণের নামে বের করে নেয়া হয়েছে। আর এক্সিম ব্যাংকের দীর্ঘ ১৭ বছর চেয়ারম্যানের চেয়ার দখল করে রেখেছিলেন পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে খ্যাত নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদার। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ভেঙে দেয়া হয়েছে। নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। তাদের মাধ্যমেই গত প্রায় ১০ মাস ধরে ব্যাংক পাঁচটি পরিচালিত হয়ে আসছে।

পাঁচ ব্যাংকের দায়দেনা নিয়ে সর্বশেষ তথ্য দিয়ে তৈরি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, একীভূত হতে যাওয়া এই পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। আর এসব ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৯০ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। এসব ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে এক লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৭ শতাংশ। শুধু তাই নয়, এসব ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। আর বিপ্লবের পর ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ৩৩ হাজার ৯ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা নিয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেও ব্যাংকগুলোর রয়েছে ৯২ লাখ গ্রাহক এবং ১৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। ব্যাংকগুলোর মোট অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। আর পরিশোধিত মূলধন মূলধন মাত্র পাঁচ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। অথচ মূলধন ঘাটতির পরিমাণ অনেক বেশি, যা ব্যাংকের স্বাস্থ্য ও টিকে থাকার জন্য হুমকিস্বরূপ। এসব ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ এক লাখ ৯৯ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। আর শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটি সাত হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। আর ব্যাংকগুলোর শেয়ার দর ৮ টাকার নিচে। গড় শেয়ার দর সাড়ে ৪ টাকার নিচে।

একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে নিজেদের ভালো ব্যাংক হিসেবে দাবি করে বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংক। এ বিষয়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বপন জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের তদন্তে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দেখানো হয় ২৬ শতাংশ, অথচ কোয়ালিটি জাজমেন্টে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে ৪৮ শতাংশ। ৫ আগস্টের পর তারা সবধরনের গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে পারছেন। কেউ টাকা পাননি এমন কথা বলতে পারবে না। তাহলে কেন তাদেরকে একীভূত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তারা এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আপিল করবেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এবিউআর (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক পর্যন্ত এক্সিম ব্যাংক তাদের মোট খেলাপির পরিমাণ দেখায় তিন হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। অথচ একই সময়ের একিউআর প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকটির খেলাপির পরিমাণ ২৫ হাজার ১০১ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপির ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ। এমনকি এই খেলাপি ডিসেম্বর নাগাদ ৫১ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলেও মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, এক্সিম ব্যাংক বর্তমানে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ৯১০ কোটি টাকা। অভ্যুত্থানের পর ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা নিয়েছে। ১৫৫ শাখার ব্যাংকটি বিগত বছরে একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪০৯ কোটি টাকা লোকসানে পড়েছে। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে ব্যাংকটির শেয়ারদর কমে ৫ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইএমফের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশ অতিক্রম করলে সেটিকে মৃত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থ ব্যাংকটিকে বিলুপ্ত করতে হবে, নয়তো পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। পাঁচটি ব্যাংকই এই সীমা অতিক্রম করেছে। তাই আইএমএফের পরামর্শেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। একিউআর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ১৮২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি এখন ১৩ হজার ৯৯১ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নিয়েছে ৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। ২০৬ শাখার এই ব্যাংক বিগত বছরে ৪০৫ কোটি টাকার লোকসানে পড়েছে। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের আমানত ৩০৯৭৭ কোটি টাকা, বিতরণকৃত ঋণ ৩৫২২০ কোটি, খেলাপি ঋণ ২৩৫৭৫ কোটি, যা মোট ঋণের ৬২ দশমিক ৩০ শতাংশ। পরিশোধিত মূলধন ১১৪০ কোটি, শাখা ১৮১টি এবং লোকসান ৫৩ কোটি টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের আমানত ১২৩১৩ কোটি টাকা, বিতরণকৃত ঋণ ১৪৪২৭ কোটি, খেলাপি ঋণ ১৩৫৬৯ কোটি, যা মোট ঋণের ৯৫ শতাংশ। পরিশোধিত মূলধন ৯৮৭ কোটি, শাখা ১০৪টি এবং লোকসান ২১৪ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকের আমানত ১৭৯৪২ কোটি টাকা, বিতরণকৃত ঋণ ২৮২৭৯ কোটি, খেলাপি ঋণ ২৬৪৯১ কোটি, যা মোট ঋণের ৮৮ শতাংশ। পরিশোধিত মূলধন ১০৩৬ কোটি, শাখা ১১৪টি এবং লোকসান ৮০ কোটি টাকা।