কেন ২০২৬-এর অস্কার হতে পারে সিনেমার সোনালি যুগের শেষ
Printed Edition
সাকিবুল হাসান
২০২৬ সালের অস্কার আয়োজনের ঠিক আগ মুহূর্তে চলচ্চিত্র জগতের পরিস্থিতি অনেকটা পিক্সারের সাম্প্রতিক সিনেমা ‘হপারস’-এর সেই শান্ত বনের মতো, যেখানে বিভার, ব্যাঙ আর ভাল্লুুকেরা প্রকৃতির নিয়মে মিলেমিশে থাকে। এবারের অস্কারের মনোনয়নগুলোর বৈচিত্র্য ও গভীরতায় আমরা সেই জীবন্ত বাস্তুসংস্থানেরই প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে রয়েছে দু’টি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী চলচ্চিত্র; রায়ান কুগলারের ভ্যাম্পায়ার রূপকথা ‘সিনার্স’ এবং পল থমাস অ্যান্ডারসনের রাজনৈতিক থ্রিলার ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। এই দু’টি বড় বাজেটের সিনেমা ওয়ার্নার ব্রাদার্সের অর্থায়নে নির্মিত হলেও, এবারের প্রতিযোগিতায় একই সাথে জায়গা করে নিয়েছে এ-টুয়েন্টিফোরের জেন-জি ধাঁচের পিরিয়ড ড্রামা, নরওয়ে ও ব্রাজিলের মতো দেশের মননশীল সিনেমা এবং নেটফ্লিক্সের মতো নতুন ধারার প্ল্যাটফর্মের কাজ। এটি এমন একটি অস্কার যেখানে সব ধরনের দর্শকের রুচির প্রতিফলন ঘটেছে এবং ১১ বছর আগে অস্কারের গায়ে লেগে থাকা ‘অস্কারস সো হোয়াইট’ বা বর্ণবৈষম্যের কলঙ্ক এখন অনেকটাই ম্লান।
তবে এই নিস্তরঙ্গ অস্কার মৌসুমের আড়ালে হলিউডের প্রেক্ষাপটে চলছে এক অস্থির করপোরেট লড়াই। সাংবাদিক হিসেবে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি হলো যেকোনো ভালো খবরের গভীরে গিয়ে তার নেপথ্যের বিপদ খুঁজে বের করা। এই মুহূর্তে সেই বড় বিপদের নাম হলো ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ওপর প্যারামাউন্টের অধিগ্রহণ। এই বিশাল করপোরেট পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজন ও প্যারামাউন্ট সিইও ডেভিড এলিসনের প্রভাব। আর এই পরিবর্তনের ফলে অস্কারের মঞ্চ এখন আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, ‘ওয়ার্নার-মাউন্ট’-এর মতো এই নতুন মেরুকরণ সিনেমার সৃজনশীল ভবিষ্যতকে কোন দিকে নিয়ে যাবে। সতর্কবার্তা হলো, সেই মহাসড়কটি ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে যা চলচ্চিত্রের এই বাস্তুসংস্থানকে ভেঙে ফেলতে পারে। ২০০৮ সালের পর থেকে প্যারামাউন্ট আর কোনো ‘বেস্ট পিকচার’ পুরস্কার জিততে পারেনি এবং এবারের প্রতিযোগিতায়ও বড় কোনো স্টুডিওর তালিকায় তাদের কোনো সিনেমা নেই। সৃজনশীল ঝুঁকির বদলে তারা ঝুঁকছে তাদের দীর্ঘ ২৫ বছরের পুরনো সিক্যুয়েল সিনেমা ‘ফকার ইন-ল’-এর মতো ছবির দিকে। ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ওয়ার্নারের প্রপৌত্র গ্রেগরি অর তো এই পরিস্থিতিকে একটি ‘অনিচ্ছাকৃত বিয়ের’ সাথে তুলনা করেছেন। ওয়ার্নার ব্রাদার্স এক সময় তাদের টেকনিক্যাল দক্ষতার জন্য পরিচিত থাকলেও, অস্কারের দৌড়ে তারা তখন নোলানের মতো পরিচালকদের ওপর ভরসা করত। কিন্তু ক্রিস্টোফার নোলান যখন ইউনিভার্সালে গিয়ে ‘ওপেনহাইমার’ দিয়ে বাজিমাত করলেন, ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সিইও ডেভিড জাস্লাভ যেন নিজেদের হারানো সম্মান ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। এর ফল হিসেবেই আমরা পেয়েছি ‘সিনার্স’ এবং ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’-এর মতো সিনেমা। কিন্তু ওয়ার্নারের এই অস্কারে প্রত্যাবর্তন হয়তো সিনেমার ইতিহাসের এক শেষ বিজয় উৎসব ছাড়া কিছু নয়। এলিসনের নতুন প্যারামাউন্ট হয়তো এমন উচ্চাভিলাষী বা চ্যালেঞ্জিং সিনেমাগুলোতে বিনিয়োগ করার মানসিকতা রাখবে না। এবারের অস্কার প্রমাণ করে দিয়েছে, বড় স্টুডিওগুলোর অর্থায়নে যখন সৃজনশীল ও সাহসী চলচ্চিত্রগুলো নির্মিত হয়, তখনই সেগুলো সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এবং পুরো শিল্পকে প্রাণবন্ত রাখে। বড় স্টুডিওগুলো যখন সৃজনশীলতার বদলে মুনাফাকেই একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে নেয়, তখন পুরো শিল্পের মানই সঙ্কুুচিত হয়ে আসে। রোববারের অস্কারের মঞ্চে হয়তো ওয়ার্নার ব্রাদার্সের কোনো ছবিই সেরা ছবির পুরস্কার জিতবে, যা হয়তো জাস্লাভের জন্য এক বিশাল অর্থব্যয়ী সাফল্যের প্রতীক হয়ে থাকবে।
কিন্তু অস্কারের এই চূড়ান্ত বিজয়ের রাতটি আমাদের জন্য একই সাথে একটি সতর্কবার্তাও বটে। সিনেমার বাস্তুসংস্থান এখন ভাঙনের মুখে। তাই রোববারের রাতটি উপভোগ করুন, কারণ সামনের সোমবার থেকেই হয়তো আমরা নতুন কোনো প্রতিকূল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি।