মালয়েশিয়াকে ‘নো সিন্ডিকেট’ জানিয়ে দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়

বিদেশে বসে বায়রা নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করছেন সিন্ডিকেটের দুই গডফাদার

Printed Edition

মনির হোসেন

আগামী ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর দ্বিবার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে বায়রার প্রায় দুই সহস্রাধিক ভোটার ইতোমধ্যে দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তারা নির্বাচনে নিজেদের প্যানেল সমর্থিত প্রার্থীদের কিভাবে জয়ী করা যায় সেই লক্ষ্য নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন, দিচ্ছেন নানা আশ্বাসও।

এ দিকে ক্ষুব্ধ সদস্যদের অনেকেই বলছেন, এবারের নির্বাচনে যেসব প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগই ফ্যাসিস্টবিরোধী। তবে দু’টি প্যানেলের অধিকাংশ সদস্যই বিদেশে থাকা তাদের গডফাদারদের দিকনির্দেশনা মোতাবেক প্রচার- প্রচারণা চালাচ্ছেন। মোট কথা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী যে সিন্ডিকেট গঠিত হয়েছিল তাদের মূল হোতা হিসেবে যে দু’জন ছিলেন তারাই নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ তাদের। এদের একজন ইউনিক গ্রুপের কর্ণধার ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নূর আলী এবং অপরজন হচ্ছেন মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত দাতো শ্রী আমিন নুরের ডান হাত হিসেবে পরিচিত ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী রুহুল আমিন স্বপন।

ইস্কাটনের বায়রা অফিসে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, বায়রা সম্মিলিত গণতান্ত্রিক জোট প্যানেলের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বায়রার সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুল গফুর ভূঁইয়া। একই প্যানেল থেকে মহাসচিব হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শ্রমবাজার রক্ষা আন্দোলন, বায়রার আহ্বায়ক আতিকুর রহমান বিশ্বাস। অপর দিকে বায়রা সম্মিলিত সমন্বয় ফ্রন্ট-এর ব্যানারে প্যানেল প্রধান হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক এমপি ও বায়রার সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ এইচ সেলিম। মহাসচিব পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব-১ মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আব্দুল গফুর ভূঁইয়া ও আতিকুর রহমান প্যানেলকে বিদেশে বসে প্রতিনিয়ত লিড দিচ্ছেন ৫ আগস্টের আগে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া মানবপাচার ও মানিলন্ডারিং মামলার পলাতক আসামি রুহুল আমিন স্বপন। অপর দিকে প্রতিপক্ষ প্যানেলের একটি অংশকে নেপথ্যে থেকে লিড দিচ্ছেন সাবেক বায়রা সভাপতি ও মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট তৈরির অন্যতম কারিগর মো: নূর আলী। তিনিও ৫ আগস্টের পরই গ্রেফতার এড়াতে দেশ থেকে চলে যান। মূলত নূর আলী এবং রুহুল আমিন স্বপন বিদেশে বসেই দু’টি প্যানেলের নেতাকর্মীদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে নানা দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। নেতাকর্মীরাও সেভাবেই কাজ করছেন বলে তাদের সহকর্মীরা জানিয়েছেন।

নয়াপল্টনের একটি জনশক্তি ব্যবসায়ীর অফিসে বায়রা নির্বাচনের হাল হকিকত জানতে গেলে ওই প্রতিষ্ঠানের ‘এস’ অদ্যাক্ষরের মালিক এই প্রতিবেদককে বলেন, সিলভার সেলিম ভাইয়ের প্যানেলের মহাসচিব পদপ্রার্থী হচ্ছেন ফখরুল ইসলাম। তিনি খুবই ‘চতুর’ প্রকৃতির। আমরা তো জানি তিনি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সিন্ডিকেটে ঢুকতে চেয়েছিলেন। না পারায় পরে তার ওস্তাদ নূর আলীর দু’টি লাইসেন্সের একটি ত্রিবেনী এবং সেলিব্রেটি ইন্টারন্যাশনালের মালিক আব্দুল হাই ভাইয়ের লাইসেন্সে শেয়ার নিয়ে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর অনেক কাজ করেছেন। যদিও এখন তিনি এসবই অস্বীকার করছেন। তার মেডিক্যাল সেন্টার থেকে হাজার হাজার বিদেশগামী কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে তিনি কোটি কোটি টাকা কামাই করেছেন। এখন আবার তিনিই মালয়েশিয়ার সিন্ডিকেট সদস্যদের বিরুদ্ধে স্টেজে বক্তব্য দিচ্ছেন! তার এই ডুয়েল পলিটিক্স ইতোমধ্যে সাধারণ মেম্বাররা ধরে ফেলেছেন। ভোটের দিন ভোটাররা এর জবাব দিয়ে দেবেন বলে মন্তব্য করেন ওই ব্যবসায়ী।

একজন ভোটার ‘এস’ অদ্যাক্ষরের ওই ব্যবসায়ীকে ফোন করে কোন প্যানেলের কাকে ভোট দেবেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, গফুর ও আতিক প্যানেলকে এবার ভোট দেবেন। তখন তার কাছে ওই মেম্বার প্রশ্ন রেখে উল্টো জানতে চান, এই প্যানেল তো বিদেশে পলাতক ফ্যাসিস্ট রুহুল আমিন স্বপন গ্রুপের। বিদেশে বসেই স্বপন এই প্যানেলকে লিড দিচ্ছেন। আপনি জানেন না? এরা পাস করলে তো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আবারো সিন্ডিকেট হবে। তখন তাকে (ফোনকারী) বলা হয়, আমাদের গফুর ভাইয়ের প্যানেলে কোনো ফ্যাসিস্ট নেই, কোনো সিন্ডিকেটের লোকও নেই। এরপর ফোনকারীকে পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন, সেলিমের ভাইয়ের প্যানেলেই তো সিন্ডিকেটের একজন সক্রিয় সদস্য আছেন। কে জানতে চাইলে তখন তিনি বলেন ফখরুল ইসলাম। তিনি তো সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। তা ছাড়া তিনিই তো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট করে কর্মী পাঠানোর জনক নূর আলীর খাস লোক ছিলেন, দৌড়ঝাঁপ করেছিলেন বলে মন্তব্য করেন।

অভিযোগ রয়েছে দুই প্যানেলের বেশ কিছু সদস্যই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে অতীতে সিন্ডিকেটের ছায়াতলে থেকে ব্যবসা করে লাভবান হয়েছেন। এবার বায়রা নির্বাচনে যে প্যানেল উত্তীর্ণ হবে তারাই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ করবে এমনটাই বাজারে গুঞ্জন চলছে।

যদিও গতকাল সোমবার বিকেলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন উপ-সচিব নয়া দিগন্তকে বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নষ্টের জন্য যাকে বেশি দায়ী করা হচ্ছে তিনি হচ্ছেন দাতো শ্রী আমিন নূর। কিন্তু আমি যতটুকু জানি তার বেস্টিনেট কোম্পানিতে শেয়ার আছে সম্ভবত মাত্র ২ ভাগ। কিন্তু বাংলাদেশী এজেন্সি মালিকরা তাকেই পীর সাহেব মনে করছেন। আমিন নূর শুধু কর্মীর বিপরীতে নির্ধারিত কমিশন পাচ্ছেন মালয়েশিয়া সরকার থেকে। তবে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বেস্টিনেট কোম্পানির বিরুদ্ধে এন্টি করাপশন দিয়ে তদন্ত করালে তখন কোম্পানির বিষয়ে কোনো দুর্নীতি না পেলেও এর পেছনে থাকা লোকদের অনিয়ম-দুর্নীতি পেয়েছিল বলে প্রতিবেদন দিয়েছিল দেশটির দুর্নীতি দমন কমিশন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সরকারের চাহিদা মোতাবেক আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে একটি তালিকা পাঠানো হয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত দেশটি থেকে কোনো উত্তর আসেনি। আমাদের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়া হয়েছে শ্রমবাজারে নো সিন্ডিকেট।