দেদার হাওরাঞ্চলের টপ সয়েল ও বালুমাটি উত্তোলন
Printed Edition
আলি জামশেদ বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় দিন-রাত অব্যাহতভাবে চলছে হাওরাঞ্চলের টপ সয়েল ও বালুমাটি উত্তোলন। বিশেষ করে রাতের আঁধারে এই কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। হাওরের বিস্তীর্ণ ফসলিজমি ও জলাশয় ঘিরে যেন গড়ে উঠেছে এক অঘোষিত ‘মাটিব্যবসা’- যেখানে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন হাওর এলাকায় দিনের তুলনায় রাতেই বেশি সক্রিয় থাকে মাটি কাটার যন্ত্র। দূর থেকে জোনাকির মতো ঝলমলে আলোয় জানান দেয় ভেকু ও এস্কেভেটরের উপস্থিতি। রাতভর ট্রাক চলাচলের শব্দে ঘুম ভাঙে আশপাশের বসতবাড়ির লোকজনের। দিনেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় সেসব ভেকু ও ট্রাক। গত ২৪ মার্চ দুপুরে উপজেলার পূর্ব কুর্শা ও গুরই এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, হাওরে একাধিক ভেকু দিয়ে মাটি কাটার দৃশ্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে এই কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। তারা জানান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরাসরি না থাকলেও তাদের অধীনস্থদের মাধ্যমে এসব কাজ পরিচালিত হয়। জমির মালিকদের নামমাত্র টাকা দিয়ে প্রলুব্ধ করে ইটভাটা মালিক ও মাটি ব্যবসায়ীরা রাতের আঁধারে ফসলিজমি থেকে টপ সয়েল তুলে নিয়ে যায়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনের সাথে আঁতাত ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক বছরে নিকলীতে ব্যাপকহারে জমির শ্রেণী পরিবর্তন ও জলাশয় ভরাট হয়েছে। উপজেলার ষাটধারসহ বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য পুরনো পুকুর ভরাটের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, যারা প্রশাসনকে অর্থ দিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। অন্য দিকে যারা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করতে পারে না, তাদেরকেই জরিমানার মুখে পড়তে হয়েছে।
ঘোড়াউত্রা নদী ও তার আশপাশের এলাকা থেকেও কোটি টাকার বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট খাতে জড়িত কিছু কর্মচারীর হঠাৎ আর্থিক সচ্ছলতা নিয়েও এলাকায় আলোচনা চলছে।
এ ধরনের অভিযোগের উপর নয়া দিগন্তে সিরিজ প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। জানা যায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্তের পর তারা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। জারইতলা এলাকার বাসিন্দা আলী হোসেন ও মহিউদ্দিন নয়নসহ অনেকেই অভিযোগ করেন, নিকলী উপজেলার এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ উঠলেও বালুমাটি উত্তোলন এবং স্থানীয় ভূমি সেক্টরে অনিয়ম থেমে নেই। তাদের ভাষ্য, প্রভাবশালী মহলের সমর্থন থাকায় এসব অভিযোগ কোনো গুরুত্ব পাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভেকু ও ট্রাক মালিক বলেন, প্রশাসনের সাথে সমন্বয় না করলে মাটি কাটার কাজ চালানো সম্ভব না। সমন্বয় করে না চললে জরিমানা ও যন্ত্রপাতি জব্দের ঝুঁকি থাকে। তাই অনেকেই মাসোয়ারা দিয়ে নিয়মিত কাজ চালিয়ে যান।
সম্প্রতি সরেজমিন কুর্শা হাওরে গিয়ে দিনে দু’টি ভেকু দেখা গেলেও রাতে সেখানে টপ সয়েল কাটার কার্যক্রম আরো জোরদার হয় বলে স্থানীয়রা জানান। ঈদের সময় এই কার্যক্রম আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি ঈদের দিনেও ছেত্রা হাওর থেকে ট্রাকে করে মাটি পরিবহনের দৃশ্য দেখেছেন অনেকে।
গুরই ইউনিয়নের বাসিন্দা নিলয় বলেন, অনিয়ম এখানে নিয়মে পরিণত হয়েছে, সেখানে প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ নেই। উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।