বিএনপি-জামায়াতের মাঝে দোদুল্যমান এনসিপি শেষ পর্যন্ত কোথায় ভিড়বে তরুণদের তরী
Printed Edition
হারুন ইসলাম
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর জোট সমীকরণ। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে জনসমর্থনের বিবেচনায় বর্তমানে প্রধান মেরু হিসেবে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি এবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। প্রশ্ন উঠছে বিএনপি ও জামায়াত, এই দুই বড় রাজনৈতিক শক্তির সাথে একযোগে যোগাযোগ রেখে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ভিড়বে এনসিপির নির্বাচনী তরী?
একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াত
দলের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এনসিপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জোট বা আসন সমঝোতা চূড়ান্ত না করলেও বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের সাথেই নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। একাধিক দায়িত্বশীল নেতা স্বীকার করেছেন, নির্বাচনী বাস্তবতায় সব বিকল্প খোলা রেখে এগোচ্ছে দলটি। যদিও শুরুতে এনসিপির বড় একটি অংশ বিএনপির সাথে জোট বা অন্তত আসন সমঝোতায় আগ্রহী ছিল। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনীতিতে সংস্কার, বিচার, রাষ্ট্রপতি অপসারণে মতানৈক্যসহ নানা ইস্যুতে বিএনপির সাথে জোট গঠনের সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ প্রায়। তবে তাদের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা থেমে নেই বলে জানিয়েছেন দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা। এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে দলের অভ্যন্তরে ও বিভিন্ন দলের সাথে আলোচনা চলছে। এনসিপি এখন পর্যন্ত নির্বাচনী জোটের বিষয়টি চূড়ান্ত করেনি। বিএনপি বা জামায়াতের সাথেও জোট বা আসন সমঝোতা হতে পারে। সেই সুযোগ আছে এবং আলোচনা চলছে। খুব দ্রুত আনুষ্ঠানিকভাবে সব সামনে আসবে।
বিএনপির সাথে আলোচনা কেন থমকে গেল
এনসিপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকপর্যায়ে বিএনপি ৩০টি আসন ছাড়ার আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত সে প্রস্তাব থেকে কার্যত সরে যায়। বরং এনসিপির শীর্ষ নেতাদের সম্ভাব্য সব আসনেই নিজস্ব প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। এতে এনসিপির জন্য বিএনপির সাথে সমঝোতার দরজা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির উচ্চপর্যায়ের এক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, আমাদের অনেকেই বিএনপির সাথে সমঝোতায় আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিএনপি আমাদের নেতৃত্বের জন্য কোনো স্পেস রাখেনি। এখন আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনাও নেই। তবে রাজনীতিতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যোগাযোগ বন্ধ রাখা হয় না। প্রয়োজন হলে আবার আলোচনার টেবিলে বসার সুযোগ রেখেই এনসিপি এগোচ্ছে।
জামায়াতের সাথে বাড়ছে ঘনিষ্ঠতা
বিএনপির সাথে সমঝোতা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় এনসিপির নজর এখন অনেকটাই জামায়াতে ইসলামীর দিকে। গত কয়েক সপ্তাহে দুই দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে আনুষ্ঠানিক জোটের ঘোষণা না এলেও আসন সমঝোতার বিষয়ে নীতিগত আলোচনা এগিয়েছে। এতে এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও একমত হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত এটি চূড়ান্ত হলে এনসিপির ঘোষিত প্রার্থী তালিকা থেকে শীর্ষ নেতাদের দু-একজনের আসনেরও রদবদল হতে পারে। কেউ কেউ ঢাকার আসন ছেড়ে নিজ এলাকায়ও নির্বাচন করতে পারেন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, জামায়াত এনসিপিকে ৩০ থেকে ৫০টি আসন দেয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছে। যদিও এনসিপি অন্তত ৫০টি আসনের নিশ্চয়তা চায় তবে আলোচনার দরজা খোলা আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই আগ্রহ কেবল আসন সমঝোতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এনসিপির মাধ্যমে তরুণ ভোটার ও জুলাই আন্দোলনের রাজনৈতিক শক্তিকে পাশে পাওয়ার কৌশল হিসেবেই বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
এ দিকে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে গঠিত গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটের একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, তারাও জোটের বিষয়ে আগ্রহী। বিএনপির পথ বন্ধ হলেও জামায়াতের সাথে জোট হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তারা। জামায়াতের সাথে সমঝোতা হলে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী চ্যালেঞ্জ নিয়েও ভাবতে হবে না। আসনের নিশ্চয়তাও বেশি পাওয়া যাবে। জোট সূত্র জানায়, গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটে আরো একাধিক দল যুক্ত হতে আলোচনা করছে, তা-ও চলতি সপ্তাহে চূড়ান্ত হতে পারে। এরপর বিভিন্ন আসনে সমন্বিত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হবে।
এনসিপির ভোটের মাঠের সীমাবদ্ধতা
এনসিপির সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো মাঠপর্যায়ের দুর্বল সংগঠন। সদ্য গঠিত তরুণদের এই রাজনৈতিক দলটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শহরকেন্দ্রিক আন্দোলন ও তরুণদের মধ্যে দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকলেও এখনো গ্রামবাংলায় শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে পারেনি। একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, এনসিপির সম্ভাব্য ভোট ৫-৬ শতাংশের বেশি নয়। এই ভোট সমর্থন নির্বাচনে এককভাবে বড় সাফল্য আনতে যথেষ্ট নয়। ফলে এনসিপির জন্য জোট বা আসন সমঝোতায় যাওয়াই শ্রেয়। এই বাস্তবতা থেকেই দলটি বিএনপি ও জামায়াত দুই পক্ষের সাথেই যোগাযোগ রেখে নিজেদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক পথ খুঁজছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
যে কারণে এনসিপিকে চায় জামায়াত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপিকে চাওয়ার পেছনে জামায়াতের কেবল আসন বণ্টনের হিসাব নেই, বরং রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। প্রথমত, এনসিপি ‘জুলাই আন্দোলনে’র প্রতীক। তরুণদের নেতৃত্ব, রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার ও আধিপত্যবিরোধী বয়ান-এসব বিষয় এনসিপিকে একটি আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় দিয়েছে। জামায়াত মনে করছে, এনসিপির জোট হলে ফ্যাসিবাদ হটানো চব্বিশের আন্দোলনের ত্যাগী মুখগুলোর জায়গা দেয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক উদারতার পরিচয় দেয়া যাবে। তাদের সাথে নতুন রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠায় কাজ করা সহজ হবে।
জামায়াতের উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, এনসিপির ভোট হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু তারা সময়ের প্রতিনিধি। তাদের সাথে থাকলে ঐক্যবদ্ধভাবে ২৪’র স্পিরিট ধারণ করে মাঠে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করতে সুবিধা হবে।
দুই নৌকায় পা : কৌশলগত ঝুঁকি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই বড় দলের সাথে একযোগে যোগাযোগ রাখার কৌশল এনসিপির জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। এক দিকে বিএনপির কাছে তারা ‘চাপ সৃষ্টির শক্তি’ হিসেবে নিজেদের দেখাতে চায়, অন্য দিকে জামায়াতের কাছ থেকে বেশি আসন আদায়ের চেষ্টা করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান জানান, এনসিপি এখন সিদ্ধান্তের সন্ধিক্ষণে। বিএনপি বড় শক্তি, কিন্তু জায়গা দিতে অনিচ্ছুক। জামায়াত জায়গা দিতে আগ্রহী, কিন্তু আদর্শিক প্রশ্ন আছে। সব কিছু বিবেচনা করে তাদের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত হবে বলে আমি মনে করি।
শেষ পর্যন্ত কী করবে এনসিপি?
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বিএনপি যদি শেষ মুহূর্তে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনের প্রস্তাব না দেয়, তাহলে এনসিপি জামায়াতের সাথেই নির্বাচনী সমঝোতায় যাবে। কারণ জামায়াতই একমাত্র দল, যারা এনসিপিকে দৃশ্যমান সংখ্যক আসনের নিশ্চয়তা দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। অন্য দিকে যদি বিএনপি কৌশলগত কারণে শেষ সময়ে কিছু আসনের প্রস্তাব দেয়, তাহলে এনসিপির ভেতরে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো-জামায়াতের সাথে আসন সমঝোতায় যাবে এনসিপি, তবে আনুষ্ঠানিক জোটের ভাষা ব্যবহার এড়িয়ে চলবে। এতে তারা নিজেদের ‘স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয়’ বজায় রাখার সুযোগ পাবে, আবার নির্বাচনী মাঠেও টিকে থাকতে পারবে।
এনসিপির রাজনৈতিক তরী এখনো মাঝনদীতে। আদর্শ, বাস্তবতা, নিরাপত্তা ও টিকে থাকার প্রশ্ন- সবকিছু মিলিয়েই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। বিএনপি ও জামায়াতের মাঝে দোদুল্যমান এই যাত্রা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে, তা নির্ধারণ করবে আগামী কয়েকটা সপ্তাহ।