অগ্রাধিকার হবে কর সংস্কার ও আয়ের পুনর্বিন্যাস
বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট ১১ জুন
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
আগামী ১১ জুন সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হবে; যা বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বাজেট পেশ করবেন বলে জানা গেছে। বাজেটে কর কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছেÑ এক দিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়, অন্য দিকে বিলাসপণ্যে বাড়তি কর আরোপের প্রস্তাব।
সরকারের ল্য হিসেবে সীমিত আয়ের মানুষকে স্বস্তি দেয়া এবং উচ্চমূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমানোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন মসলার ওপর বিদ্যমান ১ শতাংশ উৎসে কর বাতিলের উদ্যোগ। একই সাথে নিত্যপণ্যের ওপর আরোপিত ১ শতাংশ টার্নওভার কর যৌক্তিক পর্যায়ে কমানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
এনবিআর সূত্র বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের সঙ্কট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতার কারণে বাজারে চাপ অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি তিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণী। করের কিছু বোঝা কমানো হলে আমদানি ও পাইকারি পর্যায়ে পণ্যের মূলধন ব্যয় হ্রাস পেতে পারে; যা খুচরা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু কর কমালেই তাৎণিকভাবে বাজারে বড় পরিবর্তন আসবেÑ এমন নিশ্চয়তা নেই। পরিবহন ব্যয়, মজুদদারি, বাজারে প্রতিযোগিতার ঘাটতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতাও দামের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই করছাড়ের সুফল ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে শক্তিশালী বাজার তদারকি ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
অন্য দিকে রাজস্ব বৃদ্ধি ও আয় বৈষম্য হ্রাসের ল্েয বিলাসবহুল পণ্যে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রাইভেট কার, জিপ, হেলিকপ্টার ও বিমানের ওপর অতিরিক্ত আয়কর আরোপ হতে পারে। পরিবেশবান্ধব হলেও উচ্চমূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির েেত্র অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর চিন্তাও রয়েছে। তবে মধ্যবিত্তের জন্য ব্যবহৃত সিসিভিত্তিক সাধারণ গাড়িগুলোর কর কাঠামো অপরিবর্তিত রাখার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
প্রথমবারের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশাকে করের আওতায় আনার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী সিটি করপোরেশন এলাকায় বছরে পাঁচ হাজার টাকা এবং পৌরসভা এলাকায় দুই হাজার টাকা কর নির্ধারণ হতে পারে। তবে এই খাতে সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ, নিবন্ধন ও কর আদায়Ñ এসবই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, খাতটি দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও আনুষ্ঠানিক ডাটাবেজ ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়।
এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নবায়নে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে এনবিআর। বর্তমানে অস্ত্র লাইসেন্স নবায়নে এ ধরনের অগ্রিম আয়কর নেই। এর আগে লাইসেন্স ফি ও আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়েছিল। প্রস্তাবটি রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ নীতিকে শক্তিশালী করার অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে আসন্ন বাজেটের করনীতি দু’টি মূল দিক নির্দেশ করছেÑ প্রথমত, নিত্যপণ্যে কর হ্রাসের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা কমানো; দ্বিতীয়ত, বিলাসপণ্য ও উচ্চআয়ের খাতে কর বাড়িয়ে রাজস্ব ভিত্তি বিস্তৃত করা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ কর কাঠামো হলে তা সামাজিক ন্যায্যতা ও রাজস্ব শৃঙ্খলা; উভয় েেত্রই ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
তবে বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দতার ওপর। করছাড়ের সুবিধা যেন সত্যিকারের ভোক্তার কাছে পৌঁছায় এবং বিলাসপণ্যে বাড়তি কর যেন কার্যকরভাবে আদায় হয়Ñ এসব বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে বাজার পর্যবেণ, ডিজিটাল কর প্রশাসন এবং স্বচ্ছতা বাড়ানো না গেলে কাক্সিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
আসন্ন বাজেট তাই কেবল একটি আর্থিক দলিল নয়; এটি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, সামাজিক নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করবে।