চলনবিল অধ্যুষিত কৃষি জমিতে চলছে অবাধে পুকুর খনন

Printed Edition
7-bangla-1
ভেকু দিয়ে ফসলি জমির মাটি খনন করা হচ্ছে : নয়া দিগন্ত

লুৎফর রহমান তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)

সিরাজগঞ্জের চলনবিল অধ্যুষিত তিন উপজেলায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কৃষি জমিতে অবৈধভাবে পুকুর খননের কাজ। বালু ব্যবসায়ী ও ইটভাটার মালিকদের যোগসাজশে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অসহায় কৃষকের জমি ইজারা নিয়ে অবাধে খনন করা হচ্ছে পুকুর। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, এসব উপজেলায় বর্তমানে শতাধিক পুকুর খনন এখন চলমান রয়েছে। প্রশাসনসহ প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করেই এসব পুকুর খনন করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়, পুকুর খনন রোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসন এ পর্যন্ত কোনো একটি পুকুর খনন বন্ধ করতে পেরেছে, এমন নজির নেই। ফলে জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়া উপজেলায় উজাড় হচ্ছে তিন ফসলি উর্বর জমি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সূত্রমতে, এই তিন উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ইতোমধ্যে কমে গেছে। পাশাপাশি শত শত বিঘা কৃষিজমিতে সৃষ্টি হয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। মাটিখেকোদের এই অপকর্মে দেশের শস্যভাণ্ডার খ্যাত সিরাজগঞ্জে কমছে ফসল উৎপাদন। যা জাতীয় উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের নেতা মো: আবদুর রাজ্জাক রাজু বলেন, কৃষিজমি রক্ষায় আইন এবং সরকারি বিধিবিধান থাকলেও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তায় বন্ধ হচ্ছে না পুকুর খনন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই মাটিখেকোরা অবাধে এমন অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, অভিযান পরিচালনা করে, ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে এবং জরিমানা আদায় করেও থামানো যাচ্ছে না খননকারী চক্রদেরকে।

তাড়াশ উপজেলা মথুরাপুর গ্রামের কৃষক মনসুর রহমান বলেন, তার ১০ বিঘা ফসলি জমি রয়েছে। কিন্তু আশপাশে অপরিকল্পিত পুকুর খননের কারণে তার জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এখন এ জমিতে তেমন চাষাবাদ করা যায় না। বছরজুড়েই থাকে জলাবদ্ধতা। কাজেই বাধ্য হয়েছে মাটিখেকোদের কাছে জমি লিজ দিয়ে মাটি বিক্রি করে দিতে হবে।

একই অভিযোগ খুঁটিগাছা গ্রামের কৃষক আবুল হোসেনের। তিনি বলেন, তার তিন বিঘা জমি থাকলেও জলাবদ্ধতার কারণে ফসল ফলাতে পারছেন না। তিনি বলেন, ২০১৫ সাল থেকে এ এলাকার কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি মাঠের পর মাঠ ফসলি জমিতে পুকুর খনন করেছে। ওই সময় তার জমিও চেয়েছিল মাটি কেটে পুকুর খনন করার জন্য। কিন্তু তিনি দেননি। এ দিকে আশপাশের জমিতে পুকুর খননের ফলে তার আবাদি জমিসহ পুরো মাঠ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এখন এই জমিতে তিনি কোনো ফসল ফলাতে পারেন না।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, গণহারে পুকুর খনন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চলনবিল তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। প্রাণ বৈচিত্র্য, কৃষি ও জনজীবনে পড়ছে ক্ষতিকর প্রভাব। পুকুর খনন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের ধরনের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে চলন বিলের প্রাকৃতিক জলাধারের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। সেই সাথে পানির গুণগত মানও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

পুকুর খননের ফলে কৃষি জমির শ্রেণীর পরিবর্তন হলেও, পুকুরের মালিকেরা সুকৌশলে কৃষিজমির নির্ধারিত খাজনা (কর) প্রদান করছেন। এতে করে সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব। জানা যায়, বাণিজ্যিক পুকুরে প্রতি শতকে ৪০ টাকা করে কর আদায় করার আইন রয়েছে।

উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সূবর্ণা ইয়াসমিন সুমি বলেন, অপরিকল্পিত পুকুর খননে সাধারণ কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে কৃষক ফসল উৎপাদন করতে পারছে না।

উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম আরিফ বলেন, কৃষকদের ফসলি জমি অনাবাদি হওয়ার খবর আসছে, আমাদের কাছে। আমরা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছি।

রায়গঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদ রানা বলেন, আমরা অবৈধ পুকুর খনন ও ফসলি জমির টপসয়েল কাটা রোধে নিয়মিতভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। জনস্বার্থে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফথরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মোহাম্মদ রেজাউল হক বলেন, কৃষিজমির শ্রেণী বদল করে পুকুর খনন পুরোপুরি বেআইনি। কিন্তু সুযোগ সন্ধানীরা অত্যান্ত কৌশলী। তারা আইন অমান্য করেই পুকুর খনন করছে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।