হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের পরিকল্পনা শর্তসাপেক্ষে গাজার পুনর্গঠন ও সেনা প্রত্যাহার

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজা উপত্যকায় হামাসসহ ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলোর নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য নতুন একটি পরিকল্পনা সামনে এসেছে। আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গাজা বোর্ড অব পিসের প্রধান নিকোলাই ম্লাদেনভ এই পরিকল্পনাটি উপস্থাপন করেছেন, যেখানে আট মাসব্যাপী পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি কেবল নিরস্ত্রীকরণ নয়, বরং একটি বৃহত্তর যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ। এর আওতায় হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠীর অস্ত্র ত্যাগের বিনিময়ে ইসরাইলকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে গাজায় মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি, পুনর্গঠনের জন্য নির্মাণসামগ্রী প্রবেশের অনুমতি এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনার প্রথম ধাপে, যা দুই সপ্তাহব্যাপী, সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হবে। একই সাথে জাতীয় কমিটির প্রতিনিধিরা গাজায় প্রবেশ করে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তুতি নেবেন। দ্বিতীয় ধাপে, যা ১৬ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে, নিরস্ত্রীকরণ কার্যক্রম শুরু হবে। এ সময় হামাস ভারী অস্ত্র প্রত্যাহার এবং সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংসে সহযোগিতা করবে। পরবর্তী পর্যায়ে একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি পুরো প্রক্রিয়া তদারক করবে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে ইসরাইল ধীরে ধীরে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে। ২৫১ দিনের মধ্যে নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন হলে পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠন শুরু হবে এবং কংক্রিট, ইস্পাত ও জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। হামাস এটিকে অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছে এবং বাইরের চাপের বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে গাজায় দীর্ঘদিনের সংঘাত ও হামাসের শাসনের অবসান ঘটতে পারে, তবে বাস্তবায়নের পথ এখনো জটিল ও অনিশ্চিত।

গাজায় অবকাঠামো মেরামতে ইসরাইলের বাধা, বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট এখন জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে। ইসরাইলি হামলায় পানি সরবরাহ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি মেরামত কার্যক্রমে নানা বাধা সৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরো জটিল হয়ে উঠছে। আলজাজিরার এক খবরে বলা হয়েছে, গাজা শহরের বহু এলাকায় এখন পানির একমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে পানি বহনকারী ট্রাক। খালি পাত্র হাতে এসব ট্রাকের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি।

২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসনে গাজার পানি সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। পাইপলাইন, পাম্পিং স্টেশন এবং পানি সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে ইসরাইলি বাহিনীর ধারাবাহিক হামলায় পুরো নেটওয়ার্ক কার্যত ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গাজা সিটির প্রায় ৭০ শতাংশ পানি সরবরাহ অবকাঠামো অচল হয়ে পড়েছে। অন্তত ৭২টি পানির কূপ ধ্বংস হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে দেড় লাখ মিটারের বেশি পাইপলাইন এবং চারটি প্রধান পানি রিজার্ভার। উত্তর গাজার ইয়াসিন পানি স্টেশন, যা একসময় হাজারো মানুষের জীবনরেখা ছিল, এখন প্রায় অকার্যকর। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের চেষ্টাও নানা কারণে থমকে আছে। সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে ইসরাইলের আরোপিত কঠোর অবরোধ। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী এমনকি পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার মৌলিক উপকরণকেও ‘ডুয়াল-ইউজ’ বা দ্বৈত ব্যবহারের অজুহাতে গাজায় প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে স্থানীয় প্রকৌশলীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া পুরনো পাইপ ও যন্ত্রাংশ পুনর্ব্যবহার করে কোনোভাবে মেরামতের কাজ চালানোর চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত এলাকার কারণে গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহ লাইনের মেরামতও বন্ধ হয়ে আছে। বিশুদ্ধ পানির অভাব এখন সরাসরি স্বাস্থ্য সঙ্কটে রূপ নিয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, গাজাজুড়ে তীব্র পানিশূন্যতা, কিডনি জটিলতা এবং পানিবাহিত রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ডা: গাজি আল-ইয়াজজি জানান, দূষিত পানিতে উচ্চমাত্রার লবণ, নাইট্রেট, ফসফরাস ও সালফার থাকায় রোগীদের অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে।

গাজায় ‘ইয়েলো লাইন’ স্থায়ী করছে ইসরাইল

গাজা উপত্যকায় তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা সামরিক বিভাজনরেখাকে স্থায়ী রূপ দিচ্ছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী-এমনটাই জানিয়েছে ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজ। খবর আনাদোলু এজেন্সির। খবরে বলা হয়, এই লাইনের বরাবর ৩২টি সামরিক অবস্থান গড়ে তোলা হয়েছে এবং প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থল প্রতিবন্ধক নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথমদিকে যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে এই লাইনকে অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এটি কার্যত স্থায়ী নিয়ন্ত্রণরেখায় পরিণত হয়েছে। গাজার ভেতরে ইসরাইলি বাহিনীর মোতায়েনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এই এলাকা।

খবরে আরো বলা হয়, এই লাইনের আশপাশে সাম্প্রতিক সময়ে ২০০-র বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ আগেই জানিয়েছিলেন, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত এই লাইন থেকে ‘এক ইঞ্চিও’ সরে আসবে না ইসরাইল। ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় সহিংসতা থামেনি। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনে শত শত মানুষ হতাহত হয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ‘ইয়েলো লাইন’ স্থায়ী হলে গাজার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

ফিলিস্তিনি শিশুর শরীর সিগারেটে পোড়ানোর ঘটনা ইসরাইলের অস্বীকার

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনী প্রায় ১০ ঘণ্টা আটক রাখার পর এক ফিলিস্তিনি শিশুকে ফিরিয়ে দিয়েছে। শিশুটির শরীরে ‘সিগারেটের দাগের মতো পোড়া চিহ্ন’ পাওয়া গেছে। তবে ঘটনাটিকে হামাসের প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। খবর মিডলইস্ট আইয়ের। ২১ মাস বয়সী শিশু জাওয়াদ আবু নাসারকে তার বাবা ২৫ বছর বয়সী ওসামা আবু নাসারের সাথে ১৯ মার্চ কেন্দ্রীয় গাজা থেকে আটক করা হয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মিষ্টি কিনতে সকাল ১০টার দিকে ওসামা তার সন্তানকে নিয়ে বের হয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় নিজের বাড়ি, অনাগত সন্তান এবং জীবিকা হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন ওসামা। ঈদের দিন মিষ্টি কিনতে গিয়ে তিনি আর ফিরে আসেননি। ওসামার বাবা মুহাম্মদ হুসনি আবু নাসার জানান, ‘ওসামা যখন বের হয়, তখন মনে হচ্ছিল সে পশ্চিমে না গিয়ে পূর্ব দিকে যাচ্ছে। প্রতিবেশীরা আমাকে ফোন করে বলল, তাড়াতাড়ি আসুন, আপনার ছেলে তার শিশুকে কাঁধে নিয়ে পূর্ব দিকে যাচ্ছে।’ মাঘাজি শরণার্থী শিবিরে তাদের বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে ইসরাইলি বাহিনী ‘ইয়েলো লাইন’ নামে একটি সামরিক সীমারেখা বানিয়ে রেখেছে। গাজায় এটি একটি নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে গেলে সাধারণ মানুষ ঝুঁকিতে পড়ে। প্রতিবেশীরা জানান, ওসামা সেখানে পৌঁছানোর পর ইসরাইলি বাহিনী তাকে লক্ষ্য করে গুলি না চালিয়ে তার আশেপাশে গুলি ছোড়ে। ওসামার বাবা বলেন, ‘বেচারা বুঝতেই পারছিল না যে, সে কী করছে, তাই হাঁটতেই থাকে।’ প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন ওসামার কাছে আসে। এরপর তাকে তার সন্তানকে নামিয়ে রেখে সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যেতে এবং কাপড় খুলে ফেলতে দেখা যায়। ওসামার বাবার ভাষ্য, ‘সে শুধু অন্তর্বাস পরে ছিল এবং একেবারে শান্ত ছিল, কোনো আক্রমণাত্মক আচরণ করেনি।’

বাড়িতে আনার পর শিশুটির শরীরে বিভিন্ন স্থানে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। হাঁটুর চারপাশে পোড়া দাগ এবং একটি ধারালো বস্তু দিয়ে করা সৃষ্ট গভীর ক্ষত ছিল। শিশুটি সারা রাত ব্যথায় এবং ভয়ে কেঁদেছে, ঘুমাতেও পারেনি। পরদিন তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, এসব আঘাত গোলাবারুদের কারণে নয়, বরং নির্যাতনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চিকিৎসা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তার হাঁটু ফুলে গেছে এবং উভয় হাঁটুর চারপাশে সিগারেটের দাগের মতো ক্ষত রয়েছে।

তবে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং হামাসের প্রচারণার অংশ। তিনি উল্টো দাবি করেন, শিশুটিকে একজন হামাসকর্মী মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য বিপজ্জনক এলাকায় নিয়ে গিয়েছিল। বরং ইসরাইলি সেনারা তাকে নিরাপদে রাখে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়, এরপর দ্রুত রেডক্রসের কাছে হস্তান্তর করে।