ট্রাম্পের চোখে ধুলা দিয়ে ‘বিনা শুল্কে’ যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাচ্ছে চীন

দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ

Printed Edition

গত বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে প্রায় ২৫০ জন চীনা উৎপাদক ও ই-কমার্স বিক্রেতার একটি উইচ্যাট গ্রুপে সবার মনোবল ছিল দুর্বল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্যের ওপর আরোপিত যৌথ শুল্কহার দাঁড়িয়েছিল ১৪৫ শতাংশে। গ্রুপের এক সদস্য লেখেন, এই তো শেষ। যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল। আরেকজন মন্তব্য করেন, কিসিঞ্জার যদি বেঁচে থাকতেন!

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানির ক্ষেত্রে গত ১০০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আইনগত শুল্কহারের প্রভাব টের পেতে শুরু করেন গ্রুপের রফতানিকারকরা। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানিতে চীনের অংশ ছিল ২২ শতাংশ; কিন্তু ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা নেমে আসে মাত্র ৯ শতাংশে, যা ২৫ বছর আগে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) চীনের যোগদানের সময়ের পর সর্বনিম্ন।

শেনঝেন টপোলজির প্রধান নির্বাহী স্টিভেন লু ওই গ্রুপটি পরিচালনা করেন। প্রতিষ্ঠানটি চীনা ই-কমার্স বিক্রেতাদের বিদেশী বাজারে প্রবেশে সহায়তা করে। ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলকে ‘লিবারেশন ডে’ অভিহিত করে ট্রাম্প চীনের ওপর ‘পারস্পরিক শুল্ক’ আরোপ করেন। তবে লু’র ভাষ্য অনুযায়ী, তার ক্লায়েন্টরা, যারা শেইন ও টেমুর মতো শপিং প্ল্যাটফর্মে পণ্য সরবরাহ করেন- এর আগেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খল সরিয়ে নিতে শুরু করেছিলেন।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে লু বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চীনা রফতানি বন্ধ করে না, এগুলোকে শুধু অন্য পথে ঘুরিয়ে দেয়। গত সপ্তাহে প্রকাশিত নতুন তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে চীনের আট বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি ভিয়েতনাম হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে। হার্ভার্ড, ডিউক ও তাইওয়ানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাকাডেমিয়া সিনিকার একদল গবেষকের বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। দুই বছর ধরে ঘুরপথে রফতানি কমার পর এই পরিসংখ্যান আবার উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে। এতে বোঝা যায়, কিভাবে চীনা রফতানিকারকরা শুল্ক পার্থক্য থাকা বাণিজ্য অংশীদার দেশ ব্যবহার করে পণ্য পাঠাচ্ছেন। এই কৌশল ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কিছু দুর্বলতাও প্রকাশ করছে, যা দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ভাবিয়ে তুলেছে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবেহি ইয়োহা বলেন, দেশভিত্তিক শুল্কহারে যখনই পার্থক্য থাকে, তখনই ঘুরপথে পণ্য পাঠানোর প্রবণতা তৈরি হয়। ২০২৫ সালের একটি ওয়ার্কিং পেপারের হালনাগাদ সংস্করণের আগে জানুয়ারিতে দেয়া এক স্মারকে ইয়োহা এই তথ্য শেয়ার করেন। সহলেখক ছিলেন ডিউকের এডমন্ড মালেস্কি, জয়া ওয়েন এবং তাইওয়ানের সুং-জু উ।

গবেষকরা ‘রিরাউটিং’ বা ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ বলতে বোঝাচ্ছেন- চীনে উৎপাদিত পণ্য ভিয়েতনাম হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো, যেখানে উল্লেখযোগ্য রূপান্তর বা মূল্য সংযোজন হয়নি। গত বছর কিছু সময় চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে তা কমে অধিকাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়। ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর শুল্ক ২০ শতাংশ।

ইয়োহা বলেন, ‘আমাদের তথ্য বলছে, শুল্ক পার্থক্য থাকার সময় গত বছর উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ট্রান্সশিপমেন্ট হয়েছে। বিশেষ করে ভিয়েতনামে থাকা কিছু চীনা মালিকানাধীন কারখানা এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।’ রিরাউটিং শনাক্ত করতে গবেষকরা একই প্রান্তিকে চীন থেকে ভিয়েতনামের একটি প্রদেশে আমদানি হওয়া পণ্য এবং সেই প্রদেশ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া পণ্য ট্র্যাক করেছেন। তবে এই হিসাব দিয়ে ট্রান্সশিপমেন্ট আইনসম্মত ছিল কি না, তা নির্ধারণ করা যায় না বলে জানান ইয়োহা। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও সাবেক মার্কিন বাণিজ্য কর্মকর্তা উইলিয়াম রেইনশ বলেন, ট্রান্সশিপমেন্ট একটি ‘স্থিতিস্থাপক ধারণা’। তার ভাষায়, এটি বিভিন্ন মার্কিন চুক্তিতে উল্লেখ থাকলেও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। কিছু ক্ষেত্রে ট্রান্সশিপমেন্ট- যেমন পণ্যের উৎস দেশ ভুলভাবে উল্লেখ করা, স্পষ্ট প্রতারণা। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিষয়টি সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে। উদাহরণ দিয়ে রেইনশ বলেন, চীনে উৎপাদিত স্টিল স্ল্যাব দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠিয়ে সেখানে শিট বা তারে রূপান্তর করা হলে, আন্তর্জাতিক কাস্টমস নিয়মে সেটি দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্য হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু কেউ কেউ বলবেন, যেহেতু কাঁচামাল চীনের, তাই সেটি আসলে চীনা পণ্যই।