সিলেটে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে হামলা মামলা
সাবেক ৩ মন্ত্রী, এমপি মেয়রসহ ২৮৫ জন আসামি
Printed Edition
জুলাই-আগস্টে সিলেটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে হামলার দায়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ আওয়ামী লীগের সাবেক তিন মন্ত্রী, মেয়র, এমপিসহ ২৮৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে আরেকটি মামলা হয়েছে। অভিযুক্তরা সবাই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। আদালতের নির্দেশে কোতোয়ালি মডেল থানায় শুক্রবার (২ মে) মামলাটি রেকর্ড করা হয়। নং-০১।
মামলার বাদি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আহত সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার রণকেলী উত্তর গ্রামের শেখ আবদুর রহমান জানির ছেলে শেখ শফিউর রহমান কয়েছ (১৮)। বর্তমানে তিনি সিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকায় বসবাস করছেন।
১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনের ৩/৪সহ দণ্ডবিধির ৩২৩/৩২৪/৩২৬/৩০৭/৩৪ ধারায় দায়ের হওয়া এই মামলায় ১৩৫ জনের নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরো ১০০-১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলা রুজু হওয়ার বিষয়টি গত শনিবার রাত ১টায় নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: জিয়াউল হক। মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়েছে থানার এসআই মোহাম্মদ খবির উদ্দিনকে। মামলায় এজহারনামীয় আসামিরা হলেন- সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সিলেট-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ আহমদ মজুমদার, সিলেট-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ, সিলেট-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হুসাম উদ্দিন চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, আওয়ামী লীগ ও বিএমএ নেতা ডা: এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আহমদ আল কবির, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্ত্রী সেলিনা মোমেন, সিলেট জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হেলেন- আহমদ, সিলেট-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. সেলিম উদ্দিন, মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জগদিশ চন্দ্র দাশ, মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আরমান আহমদ শিপলু, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ প্রমুখ।
অভিযোগে বাদি উল্লেখ করেন যে, তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। আসামিরা ফ্যাস্টিস্ট আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নির্দেশে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন কোটাবিরোধী আন্দোলনকে দমানোর জন্য গত বছরের ১৭ জুলাই রাতের বেলায় সিলেট শহরের জিন্দাবাজারে একটি গোপন বৈঠকের মাধ্যমে পরদিন পূর্বঘোষিত কর্মসূচি বানচাল করতে আন্দোলনকারীদের উপর সশস্ত্র হামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের পক্ষে কোটাবিরোধী আন্দোলনকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে আন্দোলন দমন করতে পূর্ব থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দমনের জন্য আসামিরা আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের মারণাস্ত্র নিয়ে ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করতে থাকে। সিলেটে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনের জন্য মামলার আসামিরা অস্ত্র, বন্দুক, গোলাবারুদ কিনে ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘটনার তারিখের আগেরদিন গোপন স্থানে জড়ো করে। পরদিন ১৮ জুলাই কোটা বাতিলের দাবির সমর্থনে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে পূর্ব থেকে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের সাথে বাদি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নেন। সেখান থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা মিছিল সহকারে সিলেট শহীদ মিনারের উদ্দেশে আসতে থাকে। নগরীর মদিনা মার্কেট পয়েন্টে আসা মাত্র আসামিরা ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে বাধা দেয়। আসামিদের সশস্ত্র বাধায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মিছিল ছাত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। বাদিসহ আন্দোলনকারীরা মদিনা মার্কেট পয়েন্ট থেকে বর্ণমালা পয়েন্টের রাস্তা দিয়ে শহীদ মিনারের উদ্দেশে আগানোর চেষ্টা করলে ঘটনাস্থলে পৌঁছামাত্র আসামিরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডারদের হামলায় বাদিসহ উপস্থিত ছাত্র-জনতাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তাদের হাতে থাকা বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা গুলি ও বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র যথাক্রমে হকিস্টিক, চাপাতি, দা, রামদা দিয়ে অবস্থানরত ছাত্র-জনতার ওপর অতর্কিতভাবে আক্রমণ করতে থাকে। পরবর্তীতে আসামিরা তাদের হাতে থাকা ককটেল, বিস্ফোরক দিয়ে আশপাশের দোকানে, গাড়িতে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করে লুটপাট করতে থাকে। এই সময় আসামিদের ছোড়া গুলি ককটেল ও বিস্ফোরক দ্রব্যের আঘাতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মারাত্মকভাবে আহত হন। আসামিদের ছোড়া গুলিতে উপস্থিত ছাত্র-জনতার অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় আসামিরা তাদের হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে উপস্থিত ছাত্র-জনতার ওপর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করতে থাকে। আসামির গুলিতে বাদির শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক রক্তাক্ত জখম হয়। আসামিরা বাদিকে প্রাণে হত্যার উদ্দেশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়া বাদির মাথা বরাবর গুলি করলে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বাদির বাম হাতে লেগে মারাত্মক রক্তাক্ত জখমগ্রাপ্ত হন। আরেক আসামি বাদিকে প্রাণে হত্যার উদ্দেশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে বাদির বুক বরাবর গুলি করলে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বাদির পেটের বাম পাশে লেগে মারাত্মক রক্তাক্ত জখম হন। অন্য আসামিরা তাদের হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র, হকিস্টিকসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বেধড়ক পেটাতে থাকে। তাদের পিটুনিতে বহুসংখ্যক ছাত্র-জনতা মারাত্মক জখমপ্রাপ্ত হয়ে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।